–ফের! কষাব আর একটা?
পোগো থিতিয়ে যায়। শার্টের ভিতরে লুকোনো হাত ছুরি বের করবার প্রাক্কালের ভঙ্গিতে রেখে বলে–একডিন ফুটে ডাবি ঠালা
নীলু আর একবার ডান পা তুলতেই পোগো পিছিয়ে যায়। বিড়বিড় করতে করতে কারখানার পাশের গলিতে ঢুকে পড়ে।
সেই কবে থেকে মার্ডারের স্বপ্ন দেখে পোগো সাত-আটখানা ছুরি বিছানায় নিয়ে ঘুমোতে যায়। পাছে নিজের ছুরি ফুটে ও নিজে মরে–সেই ভয়ে ও ঘুমোলে ওর মা এসে হাতড়ে হাতড়ে ছুরিগুলো সরিয়ে নেয়। মার্ডারের বড় শখ পোগোরা সারাদিন সে লোককে কত মার্ডারের গল্প করে! কলকাতায় হাঙ্গামা লাগলে ছাদে উঠে দুহাত তুলে লাফায়। মার্ডারের গল্প যখন শোনে। তখন নিথর হয়ে যায়।
নীলু গতবার গ্রীষ্মে দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে একটা ভোজালি কিনেছিল। তাই সেই শখের ভোজালিটা দিনসাতেক আগে একদিনের জন্য ধার নিয়েছিল পোগো। ফেরত দেওয়ার সময়ে চাপা গলায় বলেছিল–ভয় নেই, ভাল করে ঢুয়ে ডিয়েছি।
–কী ধুয়েছিস? জিজ্ঞেস করেছিল নীলু।
অর্থপূর্ণ হেসেছিল পোগো, উত্তর দেয়নি। তোমরা বুঝে নাও কী ধুয়েছি। সেদিনও একটা লাথি কষিয়েছিল নীলু–শালার শয়তানী বুদ্ধি দেখা ধুয়ে দিয়েছি–কী ধুয়েছিস আব্বে পোগোর বাচ্চা?
সেই থেকেই বোধহয় নীলুকে মার্ডার করার জন্য ঘুরছে পোগো। তার লিস্টে নীলু ছাড়া আরও অনেকের নাম আছে যাদের সে মার্ডার করতে চায়।
আজ সকালে বৃটিশকে খুঁজছে নীলু কাল বৃটিশ জিতেছে। দুশো সত্তর কি আশি টাকা। সেই নিয়ে খিচাং হয়ে গেল কাল!
গলির মুখ আটকে খুদে প্যান্ডেল বেঁধে বাচ্চচাদের ক্লাবের রজত জয়ন্তী হচ্ছিল কাল সন্ধেবেলায়। পাড়ার মেয়ে-বৌ, বাচ্চারা ভিড় করেছিল খুব সেই ফাংশন যখন জমজমাট, তখন বড় রাস্তায় ট্যাক্সি থামিয়ে বৃটিশ নামল টলতে টলতে ঢুকল গলিতে, দু বগলে বাংলার বোতল সঙ্গে ছটকু। পাড়ায় পা দিয়ে ফাংশনের ভিড় দেখে নিজেকে জাহির করার জন্য দুহাত ওপরে তুলে হাঁকাড় ছেড়েছিল বৃটিশ–ঈ-ঈ-ঈদ কা চাঁ-আ-আ-দ! বগল থেকে দুটো বোতল পড়ে গিয়ে ফট-ফটাস করে ভাঙলা হুড়দৌড় লেগে গিয়েছিল বাচ্চচাদের ফাংশনে পাঁচ বছরের টুমিরানি তখন ডায়াসে দাঁড়িয়ে কাঠবেড়ালী, কাঠবেড়ালী, পেয়ারা তুমি খাও…’ বলে দুলতে দুলতে থেমে ভ্যাঁ করার জন্য হাঁ করেছিল মাত্র। সেই সময়ে নীলু, জগু, জাপান এসে দুটোকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল হরতুনের চায়ের দোকানো নীলু বৃটিশের মাথায় জল ঢালে আর জাপান। পিছন থেকে হাঁটুর গুঁতো দিয়ে জিজ্ঞেস করে–কত জিতেছিস? প্রথমে বৃটিশ চেঁচিয়ে বলেছিল–আব্বে, পঞ্চা-আ-শ হা-জা-আর। জাপান আরও দুবার হাঁটু চালাতেই সেটা নেমে দাঁড়াল দু হাজারো সেটাও বিশ্বাস হল না কারও। পাড়ার বুকি বিশুর কাছ থেকে সবাই জেনেছে, ঈদ কা চাঁদ হট ফেবারিট ছিল। আরও কয়েকবার ঝাঁকাড় খেয়ে সত্যি কথা বলল বৃটিশ–তিনশো, মাইরি বলছি বিশ্বাস করা পকেট সার্চ করে শদুয়ের মতো পাওয়া গিয়েছিল।
আজ সকালে তাই বৃটিশকে খুঁজছে নীলু। মাসের একুশ তারিখ বৃটিশের কাছে ত্রিশ টাকা পাওনা। গত শীতে দর্জির দোকান থেকে বৃটিশের টেরিকটনের প্যান্টটা ছাড়িয়ে দিয়েছিল নীলু এতদিন চায়নি। গতকাল নিয়ে যেতে পারত, কিন্তু মাতালের কাছ থেকে নেওয়া উচিত নয় বলে নেয়নি। আজ দেখা হলে চেয়ে নেবে।
চায়ের দোকানে বৃটিশকে পাওয়া গেল না। ভি. আই. পি. রোডের মাঝখানে যে সবুজ ঘাসের চত্বরে বসে তারা আড্ডা মারে, সেখানেও না। ফুলবাগানের মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দেখল নীলু। কোথাও নেই। কাল রাতে নীলু বেশিক্ষণ ছিল না হরতুনের দোকানো জাপান, জগু ওরা বৃটিশকে ঘিরে বসেছিল। বহুকাল তারা এমন মানুষ দেখেনি যার পকেটে ফালতু দুশো টাকা। জাপান মুখ চোখাচ্ছিল। কে জানে রাতে আবার ওরা ট্যাক্সি ধরে ধর্মতলার দিকে গিয়েছিল কিনা! গিয়ে থাকলে ওরা এখনও বিছানা নিয়ে আছে। দুপুর গড়িয়ে উঠবে বৃটিশের বাড়িতে আজকাল আর যায় না নীলু বৃটিশের মা আর দাদার সন্দেহ ওকে নষ্ট করেছে নীলুই। নইলে নীলু গিয়ে বৃটিশকে টেনে তুলত বিছানা থেকে, বলত,–না-হকের পয়সা পেয়েছিস, হিস্যা চাই না, আমার হকেরটা দিয়ে দেয়।
নাঃ আবার ভেবে দেখল নীলু। দুশো টাকা–মাত্র দুশো টাকার আয়ু এ বাজারে কতক্ষণ? কাল যদি ওরা সেকেন্ড টাইম গিয়ে থাকে ধর্মতলায় তবে বৃটিশের পকেটে এখন হপ্তার খরচও নেই।
মোড়ে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরায় নীলু ভাবে, বিশ চাক্কি যদি ঝাঁক হয়েই গেল তবে কীভাবে বাড়ির লোকজনের ওপর একটা মৃদু প্রতিশোধ নেওয়া যায়!
অমনি শোভন আর তার বৌ বল্লরীর কথা মনে পড়ে গেল তারা শোভন কাজ করে কাস্টমসে। তিনবারে তিনটি বিলিতি টেরিলিনের শার্ট তাকে দিয়েছে শোভন, আর দিয়েছে সস্তার একটা ঘড়ি। তার ভদ্রলোক বন্ধুদের মধ্যে শোভন একজন–যাকে বাড়িতে ডাকা যায়। কতবার ভেবেছে নীলু শোভন, বল্লরী আর ওদের দুটো কচি মেয়েকে এক দুপুরের জন্য বাড়িতে নিয়ে আসবে, খাইয়ে দেবে ভাল করে খেয়ালই থাকে না এসব কথা।
মাত্র তিন স্টপ দূরে থাকে শোভনা মাত্র সকাল ন’টা বাজে। আজ ছুটির দিন, বল্লরী নিশ্চয়ই রান্না চাপিয়ে ফেলেনি! উনুনে আঁচ দিয়ে চা-ফা, লুচি-ফুচি হচ্ছে এখনো। দুপুরে খাওয়ার কথা। বলার পক্ষে খুব বেশি দেরি বোধহয় হয়নি এখনো।
