পুলিনদা, কী হবে?
পুলিন একটা ময়লা রুমালে নাক মুছল। চশমাটা ফের নাকে বসিয়ে বলল, অত ভাবছিস কেন? খবরের কাগজটা ভাঁজ করে একটু হাওয়া খাওয়ার চেষ্টা করল পুলিন। পুলিনবিহারীর পিছুটান তেমন নেই। গাঁয়ের মাতব্বর হলে কী হয়, বাড়িতে বিরাট সংসারে তেমন পোঁছে না কেউ। ছেলেরা লায়েক হয়েছে, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে, পুলিনবিহারীও নানা কাজে বারমুখো। যেখানে সেখানে দেহখানা রাখলেই হয়। দু-চার দিন তার খোঁজও হবে না।
পুলিন বলল, কাজটা আসল, না ফেরাটা আসল?
ভারি তো কাজ! বলে বদরী মুখ ফিরিয়ে নিল।
কে একজন বিড়ি ধরিয়েছে, তার ঝাঁঝালো গন্ধ আসছে এদিকে। এই দমবন্ধ অবস্থায় বিড়ির গন্ধ যেন, আরও গরম করে দিল কামরাখানা। চারদিকে অনড় ভিড়। তবে গোলমালটা কম। গরমে হাঁফিয়ে গিয়ে লোকের আর কথা বলার মতো দম নেই। শুধু শালা, সুমুন্ধির পুত, রেল কোম্পানির ইয়ে করেছে, গোছের কয়েকটা কথা কানে এল।
গাড়ি একটা স্তিমিত ভোঁ দিয়ে অবশেষে ছাড়ল। পুলিন ঘড়ি দেখে বলল, হয়ে যাবে।
কী হয়ে যাবে?
সময় থাকবে হাতে। ভাবিসনি।
আরও চারটে স্টেশন, তার মধ্যে কত কী হয়ে যেতে পারে!
পুলিন মুখটা কুঁচকে বাইরের দিকে চেয়ে রইল। আজ রোদটাও উঠেছে।
চারদিকটা যেন স্টিলের বাসনের দোকান হয়ে আছে।
পরের স্টেশনটা কাছেই ছিল। থামতেই কিছু লোক নামায় কামরাটা কিছু হালকা হল। জানলার দিকের দুটো লোক উঠল বটে, কিন্তু বদরী ওদিকে এগোল না। তেরছা হয়ে রোদ পড়ছে জানলা দিয়ে।
ঝালমুড়ি, শসা আর দাঁতের মাজনে ফিরিওয়ালারা হেদিয়ে পড়ে নেমে গেছে। একটা বাচ্চা চা-ওয়ালা উঠে হাঁক মারছিল।
পুলিন বলল, চা খাবি?
ও বাবা, এ গরমে চা!
বিষে বিষক্ষয়।
আমার দরকার নেই। তুমি খাও।
পুলিন চা নিল। চুমুক মেরে বলল, আগে অটোরিকশা সব যেত। রাস্তাটা দু-বছর আগে এমন ভাঙল যে, আর কিছুই যায় না।
দেশের অবস্থা যে ক্ৰমে খারাপ হচ্ছে এটা জানে বদরী। তবে তাতে তার বিশেষ আসেও না, যায়ও না। সে উদয়াস্ত খেতে পড়ে থাকে। শরীরখানা পাত করে, তবে অন্ন জোটে বরাবর। এ ব্যবস্থার ভালোও নেই, মন্দও নেই। চলে যায়। খরা, বন্যা হলেই যা বিপদ।
পরের স্টেশনে দুড়দাড় লোক নামতে লাগল দেখে, বদরী একটু অবাক হল। পুলিন বলল, আজ হরিপুরের হাট। চৈত্র-সংক্রান্তির মেলাও বসেছে ক-দিন হল। হরিপুরের জন্যই ভিড়, নইলে এ ট্রেন ফাঁকা যায়।
বড্ডই ফাঁকা হয়ে গেল। গরমটাও যেন খানিক উড়ে গেল খোলা বাতাসে। পুলিন চায়ের ভাঁড়টা এতক্ষণ ফেলেনি, হাতে ধরেছিল। এবার সেটা জানলার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, তোর কপালটা ভালো, বুঝলি! বিয়েটা যদি লেগে যায়, দেখবি কপাল খুলে যাবে।
ভালোর তো লক্ষণ দেখছি না। যাত্রাটাই খারাপ হল। ট্রেন যা লেট মারছে স্টেশন থেকেই না ফিরতে হয়। কথাটা গ্রাহ্য করল না পুলিন। বলল, স্বয়ং কাত্যায়নীর সংসার, বুঝলি তো? এক ছটাক বাড়িয়ে বলা নয়। এ-তল্লাটের সবাই জানে। অজাপুর থেকে বউ এল, তেরো বছর সবে বয়স। একেবারে লক্ষ্মীপ্রতিমা। গাঁয়ে ঢুকতেই দু-বছরের খরা কেটে বৃষ্টি নামল। গাছে গাছে ফলন। বউ যেখান দিয়ে যায় যেন লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ পড়ে। ভাসুরকে ভাত দিতে গিয়ে বিপত্তি, ঘোমটা পড়ে গেল। দু-হাত জোড়া। কী করে? সবাই দেখতে পেল, বউ আর এক জোড়া হাত বের করে ঘোমটাটা তুলে দিল মাথায়।
ও গপ্পো আগে শুনেছি।
বলেছি নাকি তোকে?
তুমি বলোনি। অন্য এক বউ সম্পর্কে এরকম আর একজন কেউ বলেছিল।
ও যে এই বউয়ের-ই গল্প। পাঁচমুখে ছড়িয়েছে। এ তল্লাটে সবাই জানে।
তা নয় হল, কিন্তু সে তো পুরোনো কাসুন্দি। তোমার খুড়োর মেয়ে তো আর সে নয়।
ওরে ওনারা যে-পরিবারে আসেন, সেই পরিবারটাই জাতে উঠে যায় কিনা। ওর একটা ধারা থাকে।
কতকাল আগেকার কথা সব। ওর ধারা আর নেই গো পুলিনদা।
তা এক-দেড়শো বছর হবে। এমন কিছু বেশিদিনের কথা নয়। ধরো আমার বাবার বয়েস।
ধরলাম। কিন্তু তাতেও সুবিধে হচ্ছে না। যদি সেই ধারাই হবে, তাহলে আমাকে পাত্তর ঠাওরাচ্ছ কেন?
পুলিন গোঁফের ফাঁকে একটু হাসল, কেন তুই কি খারাপ পাত্তর? পনেরো বিঘে জমি, দু-বিঘে মাছের পুকুর, বাড়িতে অতগুলো ফলন্ত গাছের বাগান।
পাত্তরের আর কিছু লাগে-না বুঝি?
আর কী লাগে?
কেন, চরিত্তির, পেটে বিদ্যে, বংশগৌরব।
তোর কী চরিত্তির খারাপ? বিদ্যেও ধরা, বাংলাটা জানিস, ইংরিজিতে নাম-সই কম নাকি? হারাধন বিশ্বাসের নাতি–বংশই কি ফেলনা?
স্টেশনগুলো পটাপট পেরিয়ে এল তারা।
পুলিন একটু হুটোপাটা করে উঠল, ওরে নাম নাম। সামনের স্টেশনটাই। গাড়ি বিইয়ে এল।
নেমে পড়ল তারা। পুলিন ঘড়ি দেখে একগাল হেসে বলল, দেরি করেনি রে। চারটে বেজে পাঁচ মিনিট। হেসেখেলে সাড়ে-নটার গাড়ি পাব।
তোমার তিন মাইল যদি চার বা পাঁচে দাঁড়ায় তাহলে অন্য কথা।
ওরে না না। অত নয়।
উদোম মাঠের ভেতর দিয়ে পথ। পাকা না হলেও রাস্তাটা পাথরকুচির ছিল বটে। তবে বহুকাল সারানো হয়নি। ভেঙে-টেঙে একশা।
পুলিন বলল, এইবার রাস্তাটা স্যাংশন হয়েছে। সারানো হবে। সামনের বছর যখন জামাইষষ্ঠীতে আসবি, তখন পাকা রাস্তা দিয়ে অটোয় চেপে হাসতে হাসতে গোঁফে তা দিতে দিতে আসবি। বুঝলি?
গাছে এখন কাঁঠালের ফুলটিও আসেনি গো, গোঁফে তা দিয়ে হবে কী? দ্বিতীয়বার ছাদনাতলায় বসার ইচ্ছে নেই গো মোটে। তুমি ধরে নিয়ে এলে বলে আসা। নদুকে আমি সৎমায়ের হাতে দেব ভেবেছ নাকি?
