–তুমি বাপু বড্ড নির্দয় মানুষ। বলে বড়-বউ সরে যায়।
মেয়েটা ওই রকম ডিম ভালোবাসে। ডাক্তার একটা মুরগির পেট থেকে সাবধানে দুর্লভ ডিমসুদ্ধ থলি বের করে। মেয়েটা আনন্দে চেঁচায়।
জটা পাড়ায় খবরটা ছড়িয়েই এসেছিল। মুরগি কষা হতে না হতে পাড়ার মস্তান–মুরিব্বি দু চারজন এসে গেল। মৌরির মাল ততক্ষণে ফরসা। অগত্যা ডাক্তার তার নিজের স্টক বের করে। দুর্লভ জিনিস। বিলেত থেকে দেড়খানার বেশি চিঠি পাঠায়নি লেবু, কিন্তু চার-পাঁচ কিস্তিতে কয়েকজন ঘরে ফেরা বাঙালির সঙ্গে পাঠিয়েছে, স্কচ হুইস্কি, রাম, এক বোতল শ্যাম্পেন। লোকে কলম, রেডিও, ঘড়ি পাঠায়, লেবু সে-সবের ধার দিয়েও যায়নি। ল্যাবাটার দূরদৃষ্টি খুব। সমঝদার ছেলে। মাইফেলটা জমে গেল খুব। জটা আর তার সাকরেদরা বিদায় নিল ইংরিজি তারিখ পেরিয়ে। সামনের মহল থেকে ভিতর মহল পর্যন্ত দোতলায় একটা ঝুলবারান্দা আছে, অনেকটা পোলের মতো। সেটা ধরে ভিতরে মহলে ফিরবার সময়ে ডাক্তার দেখে, ভারী ভালো জ্যোৎস্নায় মাখামাখি হয়ে আছে বারান্দাটা। রেলিঙের ছায়ায় নানা নক্সা। তারই মধ্যে ডাক্তারের ছায়াটা টলতে-টলতে যাচ্ছে। ভারী লজ্জা পায় ডাক্তার। জিভ কাটে। ধমক মারে–’অ্যাও!’ ছায়াটা ভয় পেয়ে স্টেডি। হয়ে যায়। রেলিঙে ভর রেখে সাবধানে হাঁটে ডাক্তার! ছায়াটা নাটলে আবার।
ঝড়
একটা মেয়ে হাসি-হাসি মুখ করে একটা বিস্কুট খাচ্ছে–এই হল বিজ্ঞাপন। তা বদরী অনেকক্ষণ খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনটা দেখল। খবরের কাগজ তার নয়, পাশে বসা পুলিনবিহারীর। পুলিন খুব খবরের কাগজ পড়ে। কেন পড়ে কে জানে! বদরী বিজ্ঞাপনটা দেখে ভাবল, তাকেও ওই বিস্কুট খেতে বলা হচ্ছে। বিজ্ঞাপন তো তাই বলে।
এই মেয়েটা যখন বিস্কুটটা খাচ্ছে, তখন তোমারও বাপু খাওয়া উচিত। কিন্তু কেন খাবে, বদরী এটাই বুঝতে পারে না। কোলে রাখা গামছাটা তুলে সে কপালের ঘাম মুছল। গরমটাও পড়েছে বাপ। একবারে কাঁঠাল পাকানো গরম। যেমন ভ্যাপসা, তেমনি চনচনে। রোদ্দুরের মুখে আবডাল দেওয়ার মতো ছেঁড়া কাঁথাকানির মতো একটু মেঘও নেই। আকাশ একেবারে নিকোনো উঠোন। মাটিতে কোদাল মারলে এখন ঠন করে শব্দ হয়।
বিস্কুট খাওয়ার বিজ্ঞাপনটা চাপা পড়েছে। পুলিনবিহারী পাতা ওলটাল। এবার একটা টিভির বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে। সেখানেও একটা মেয়েছেলে, টিভির ওপর হাতের ভর দিয়ে হেলে দাঁড়ানো, হাসি-হাসি মুখ। মেয়েছেলে ছাড়া দুনিয়ায় যেন কিছু হওয়ার জো নেই! বদরী একটা শ্বাস ফেলল।
পুলিনবিহারীর বয়স তেষট্টি, মাথায় কাঁচাপাকা চুল, শক্ত গড়ন। গায়ে ঘেমো ময়লা একখানা পলিয়েস্টারের পাঞ্জাবি, আধময়লা ধুতি, চোখে চশমা। মাতব্বর লোক। একটা খবর একটু ঝুঁকেই পড়ছিল। জম্পেশ খবরই হবে। দুনিয়ায় খবরের অভাব কী? খবরের কাগজ হল কুচুটে মেয়েছেলের মতো, যত রাজ্যের গালগল্প ফেঁদে বসে মানুষের কাছে।
ট্রেন চলছে বটে, কিন্তু জানলা দিয়ে তেমন হাওয়া আসছে না। যা আসছে তা যেন কামারশালায় হাপরের ফু। জানলার ধারটা পাওয়া যায়নি। ওদিকে দুটো লোক। বাকি দুজন সে আর পুলিনবিহারী। তিনজনের সিটে চারজন। এটাই নিয়ম। ঠাসন্ত ভিড়। ওপরে পাখা-টাখা ছিল এককালে। কে খুলে নিয়ে গেছে।
বদরী আলালের ঘরের দুলাল নয়। গরমও সয়, শীতও সয়। তবে মাঠে-ঘাটে খোলামেলা থাকার একটা রকম আছে। এই যে খাঁচায় পোরা অবস্থা, এটা তার অভ্যেস নেই।
ট্রেনটা একটা আঘাটায় দাঁড়াল। তা এরকম দাঁড়ায়। পুলিনবিহারীর বাঁ-হাতে ঘড়ি। দেখে নিয়ে বলল, চারটেয় পৌঁছোতে পারলে ফেরার শেষ ট্রেনটা পেয়ে যাব।
ফিরতেই হবে। কচি মেয়েটাকে রেখে এসেছি।
আহা, অত উতলা হলে চলে? জলে তো আর ফেলে আসিসনি। পিসির কাছেই তো আছে। বিলাসী বুক দিয়ে আগলে রাখে।
না ফিরলে চিন্তা করবে। রাতে পিসির কাছে থাকতে চায় না। তার ওপর বিলাসীর যা গন্ধমাদন ঘুম। রাতে ভয় খেয়ে পিসিকে ডাকলেও উঠবে না।
ঘড়িটা আবার দেখে পুলিন বলল, আর চারটে স্টেশন। তারপরই নেমে পড়ব। মেরেকেটে তিন মাইল রাস্তা। মনে হচ্ছে হয়ে যাবে। ফেরার শেষ ট্রেন সাড়ে নটায়।
যারা দাঁড়িয়েছিল তাদের মধ্যে একজন বলল, নটা-কুড়ি, যাবেন কোথা?
মৌলবির বাজার।
অ। দূর আছে।
পুলিন পাঞ্জাবিটা তুলে ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে পেট চুলকোল। চশমাটা ঘামে পিছলে নাকের ডগায় নেমে এসেছে। সামনের দুটো দাঁত নেই। বলল, আর দেরি না করলেই হল।
এদিককার ট্রেন এরকমই চলে। দাঁড়ায়, জিরোয়, ঘুমিয়েও পড়ে। ট্রেন নড়ছে না।
বদরীর একটা আঁকুপাঁকু লাগে। গরম, ঘাম, ভিড় সব সহ্য হয়, কিন্তু দেরিটা ভোগাবে। তেমনি দেরি হলে–বদরী ঠিক করেই রেখেছে–দাঁইহাট স্টেশন থেকেই ফিরতি ট্রেন ধরবে। বিলাসী শ্বশুরবাড়ি থেকে মোটে আসতে চায় না। সেখানে বিরাট সংসার। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আনিয়েছে। কাল-ই তার রওনা হওয়ার কথা। তার মেয়ে নন্দরানির বয়স মোটে তিন। বিলাসীর তিনটে মেয়ে একটা ছেলে। দিনের বেলাটা নদু ওদের সঙ্গে বেশ থাকবে। তবে রাত হলে তার বাপকে চাই। মা-মরা মেয়ে, বাপের বড্ড নেই-আঁকড়া। বাপের দিক থেকে একটা একরকমের ভাবনা থাকে। আবার মেয়ের দিক থেকেও আর একরকমের ভাবনা আছে। এমন হতে পারে, মেয়ে বাপের কথা তেমন ভাবছে না। যেমনটা মেয়ে ভাবছে বলে মনে করছে, তেমনটা নয়।
