আচ্ছা আচ্ছা, আগে দেখ তো। কাকা বলে ভাবিসনি যে বুড়ো। বাবার পিসির ছেলে। বয়েস আমার চেয়েও পাঁচ বছর কম। তারই দ্বিতীয়পক্ষের কনিষ্ঠা। পনেরো-ষোলোর বেশি হবে না।
সবই জানে বদরী। পুলিন একবার নয়, বহুবার বলেছে। বলে বলে কান ঝালাপালা করে দিয়েছে। তাই বাঁচার জন্য আসা। একবার দেখে নাকচ করে দিলেই হবে। বিয়ে করতে বড়ো বয়েই গেছে বদরীর। মেয়েটার জন্য গাঁয়ের শোভাখুড়ির সঙ্গে বন্দোবস্ত হয়ে আছে। বদরী যখন মাঠে যায়, খুড়ি এসে দেখে। বছর পাঁচেক বয়স হলে তখন আর খবরদারির তেমন দরকারও হবে না। পাঁচটা গাঁয়ের মেয়ের সঙ্গে খেলবে-ধুলবে, বড়ো হয়ে যাবে। বদরীর তখন ঝাড়া হাত-পা। বিয়ে আর নয়। ত্রিশ-বত্রিশ বয়স হল তার। আর দরকার কী বিয়ের?
পুলিনবিহারী আগডুম বাগড়ম, বলতে বলতে পথ হাঁটছে আগে আগে। পেছনে বদরী।
ঘরটাও পাওয়া গেছে পালটি। একেবারে যেন তোর জন্য পাঠিয়েছেন ভগবান।
বদরী জবাব দিচ্ছে না। হাঁ করলেই গলা বুক শুকিয়ে যাচ্ছে, এমন গরম।
প্রথম গাঁ গোবিন্দপুর, দ্বিতীয় সোনাডাঙা, তিন নম্বর মৌলবির বাজার। আন্দাজ আছে বদরীর। তিন মাইলই হবে।
মৌলবির বাজার যেন মরুভূমির মধ্যে একখানা দ্বীপ বড় গাছপালা চারদিকে। ধূলিধূসর ভাবটা নেই।
কেন জানিস তো? সাতাশখানা পুকুর আছে, একখানা দিঘি। তার ওপর ইরিগেশনের খাল। এ-গাঁ একেবারে লক্ষ্মীমন্ত। হবে-না? স্বয়ং কাত্যায়নী লীলা করে গেছেন।
বদরীর একটু ভয় ভয় করছে। কেন কে জানে!
ঘাবড়াচ্ছিস নাকি?
না, ঘাবড়াব কেন?
মৌলবির বাজার যে লক্ষ্মীমন্ত গাঁ এটা মনে মনে স্বীকার করতে হল বদরীনাথকে। গাছপালা আছে। পাড়ায় পাড়ায় পুকুর। গাঁও বিশাল। মেলা লোকের বাস। রোজ বাজার বসে। হপ্তায় দু-দিন হাট।
পুলিনবিহারী দূর থেকে দেখাল, ওই যে শিবমন্দির দেখছিস, ওর পিছনেই বাড়ি।
বাড়িখানা পুরোনো হলেও ভালোই। পাকা দেয়াল, মেঝে, ওপরে টিনের চাল। মস্ত উঠোন, তিনটে ধানের গোলা, সবজি বাগান, নারকেল আর সুপুরির গাছ আছে।
পুলিনবিহারী হাঁক মারল, কই রে, কোথায় গেলি সব?
হাঁক-ডাকের দরকার ছিল না। দাওয়াতেই একধারে দুজন লোক বসে গ্যাঁজালি করছিল। রোগা কালোপানা একজন লোক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ও বাবা, ভাইপো যে!
এই কাকা, বুঝলি? এর-ই মেয়ে।
কাকার কপালে রসকলি, গলায় কন্ঠি, গায়ে গেঞ্জি, পরনে ধুতি। মুখখানায় ধূর্তামি আছে। বদরী ভালো করে দেখে নিল।
পুলিন বারান্দায় উঠে বলল, হাতে মোটেই সময় নেই। রাত সাড়ে নটায় ফিরতি ট্রেন। বুঝেছ তো?
সম্পর্কে খুড়ো হলেও বয়েসে কম। ফলে সম্পর্কটা ঘোরালো। খুড়ো কদম দাস বলল, আজই ফেরত যাবে কেন? চোত সংক্রান্তিতে মেলা বসিয়েছি এবার, দুটো দিন থেকে যাও।
ঘন ঘন মাথা নেড়ে পুলিনবিহারী বলল, না না, এই বদরীর জন্যই আসা। তা তার থাকার উপায় নেই কিনা।
বলেই গা থেকে জামা খুলে ফেলল পুলিনবিহারী। তার সারাগায়ে দগদগ করছে ঘামাচি। বলল, হাতপাখা দাও তো একটা। আর ডাব।
কদম দাস তাড়াতাড়ি ভেতর বাগে গেল। যে-লোকটা বসে এতক্ষণ কদমের সঙ্গে কথা বলছিল, সে এবার উঠে কাছে এসে বলল, এদিকটায় রোদ। ওদিকটায় ছায়া আছে।
বদরী এ-লোকটাকেও ভালো করে দেখল। বয়েস অল্পই। ছোঁকরা গোছের। ভারি বিনয়ী, নরমসরম ভাব।
পুলিন বলে উঠল, এক্রাম নাকি রে?
আজ্ঞে।
তোর মোকদ্দমার কী হল?
চলছে।
মোকদ্দমার কথায় পুলিনের আলাদা উৎসাহ আছে। মামলা-মোকদ্দমার ব্যাপারটা সে খুব পছন্দ করে। পাঞ্জাবিটা কাঁধে ফেলে বলল, ফাঁকে চল তো, শুনি ভালো করে।
বদরী দেখল, কথা কইতে কইতে তারা ফটক অবধি গিয়ে দাঁড়াল। কথা আর শেষ হয় না। মামলা মোকদ্দমার কথা শেষ হওয়ারও নয়।
কদম দাস সঙ্গে একটা রাখাল গোছের ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে এল। রাখাল ছেলের দু-হাতে কাটা ডাব।
জলটুকু খেয়ে নাও ভাই। তারপর অন্য ব্যবস্থা হচ্ছে।
ডাবটা হাতে নিয়ে বদরী বলল, এক ঘটি জলও দেবেন। বড্ড তেষ্টা।
হ্যাঁ হ্যাঁ। ওরে পুটু, শিগগির গিয়ে কুয়ো থেকে জল তুলে নিয়ে আয়।
রাখাল ছেলেটা দৌড়োল।
ও ভাইপো, ডাব খাবে না?
পুলিনবিহারী হাতটা তুলে বরাভয় দেখাল। কথা থামল না।
ডাবটা শেষ করে বদরী ঢকঢক করে ঘটির জলটাও মেরে দিল। ভেতরটা একবারে ঝামা হয়েছিল এতক্ষণ।
রাখাল ছেলেটা দুটো লোহার চেয়ার এনে বারান্দায় পেতে দিয়ে বলল, উঠে বসুন। দাওয়ার দড়িতে একটা মোটা চাদর ঝুলিয়ে ছায়ার ব্যবস্থাও হল। হাতপাখা চলে এল।
কিন্তু মুশকিল হল, পুলিনবিহারীকে নিয়ে। তার কথা আর শেষ হচ্ছে না। এক্রামকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আরও তফাত হল। তারপর চোখের আড়াল।
কদম দাস বোধহয় ভেতর-বাড়িতে খবর করতে গিয়েছিল। হঠাৎ বদরী দেখতে পেল, ঘরের দরজায় কিছু মেয়েমানুষের ভিড় আর ঠেলাঠেলি। দু-চারটে কচিকাঁচাও আছে। বদরী আজ দাড়ি কামিয়ে গোঁফ হেঁটে এসেছে। গায়ে একখানা সবুজ পাঞ্জাবি, পরনে তাঁতের ধুতি। ঘামে একটু দুমড়ে দুমড়ে গেলেও, পোশাক খারাপ নয়। বদরী পেছনদিকে আর তাকাল না। হাতপাখায় বাতাস খেতে খেতে বে-আক্কেলে পুলিনবিহারীর চোদ্দো পুরুষ উদ্ধার করছিল মনে মনে। বিপদের মুখে ফেলে কোথায় যে। হাওয়া দিল। কান্ডজ্ঞান বলে যদি কিছু থাকে। বদরীকে একটা লজ্জার অবস্থায় ফেলে এরকম চলে যাওয়াটা কী ভালো হল?
