যুবকটিই দলের পাণ্ডা। সে আরও বারদুই গেছে চিড়িয়াখানায়। তার পিছু পিছু একত্রিশ নম্বর ট্রাম ধরে দঙ্গলটা এসেছে চিড়িয়াখানার মজা দেখতে। ফের রেলগাড়ি হয়ে সার দিয়ে টিকিট কেটে ঘোরানো গেট-এ ঠেক-ঠোক্কর খেয়ে ঢুকেছে ভিতরে।
গায়ে লম্বা-লম্বা কালো দাগওয়ালা ঘোড়ার মতো জন্তু দেখে মেজবউঠান বলল,—এ বাঘ বুঝি?
—দূর। ও হল জেব্রা।
—সে কীরকম জন্তু গো।
যুবকটি দেখেশুনে বলে—ওই বিলিতি গাধা আর কি।
মেজবউঠান বুঝতে পারে। বিলেতে সব কিছুই আলাদা রকমের তো! বিলিতি আমড়া, বিলিতি বেগুন।
ঈগলের খাঁচার সামনে দলটা দাঁড়ায় বটে সময় নষ্ট করে না।
নথ-নাড়া বউটা বলে—ওঃ, বাজপাখি আবার খাঁচায় রাখবার কী? এ আমরা কত দেখিছি।
যুবকটি একটু দোটানায় পড়ে বলে—এ সেই বাজপাখি নয়।
মেজবউঠান জিগ্যেস করে—বিলিতি নাকি? ওমা, এ যে শেয়ালও রেখেছে দেখছি খাঁচায় পুরে।
কাকি বলে উঠল—মরণ! ও পতু, বেজি দেখছিস কি হাঁ করে দাঁড়িয়ে। পতু নামে বাচ্চা ছেলেটা ছুটে এসে বলল—ও ঠামা, বেজির ইংরেজি কি ম্যাংগোজ? দ্যাখো লেখা আছে। ম্যাংগো। তো আম।
যুবকটি সংশোধন করে বলল—ম্যাংগো নয়, মনগুজ।
শজারু বা বনমোরগ দেখে দঙ্গলটা তেমন অবাক হল না। কাকি বলেই ফেলল—এসব কী দেখাতে আনলি, ও কালীপদ?
নথ-নাড়া বউ বলে ওঠে—এসবই নাকি বিলেতের।
—বলছে?
যুবকটি মিইয়ে যায়। চাপা গলায় বলে—গাঁইয়া বলে লোকে টের পাবে। চুপ করো, লোকে তাকাচ্ছে।
পতুর দিদি দশ বছরের ফুলঝুরি হঠাৎ হাতে তালি দিয়ে বলে ওঠে—হরিণ! হরিণ!
চিড়িয়াখানার ফটকের মুখ থেকে প্রত্যেকে এক ঠোঙা করে ভেজানো ছোলা কিনে এনেছে জীবজন্তুকে খাওয়াবে বলে। ফুলঝুরি তার খানিকটা নিয়ে হরিণের চত্বরে ছুড়ে দিল। হরিণেরা গা করল না।
এমু দেখে সবাই একটু থতমত।
—এ কি পাখি নাকি? মেজবউঠান জিগ্যেস করে।
—পাখিই। যুবকটি বলে।
—উড়তে পারে? পাখনা তো দেখছি না।
যুবকটি বলে—পারে বোধহয়।
—বাবা, অত বড় গতর নিয়ে ওড়া কি চাট্টিখানি কথা? কী পাখি রে?
নথ-নাড়া বউ চিমটি কাটে—বিলিতি। যুবকটি সবাইকে তাড়া দেয়—চলো, চলো, এখনও ঢের দেখার আছে।
চাইনিজ সিলভার ফিসলেট দেখে ফুলঝুরির ছোট বোন বলে ওঠে—ও ঠামা, দ্যাখো, এ পাখিটার পুরুতমশাইয়ের মতো টিকি আছে গো!
লামা, ক্যাসোয়ারি, স্বর্ণমৃগ দেখে-দেখে রিন্টু রং-এর খাঁচার সামনে আসতেই ফুলঝুরির বোন রুপোঝুরি বলে—দিদি, একটা আতপ চাল আতপ চাল গন্ধ পাচ্ছিস?
—ঠিক রে। ফুলঝুরি শ্বাস টেনে বলে।
—আতপ চালের গন্ধ।
সান গ্লাস চোখে এক শহুরে সুন্দরী তার ইংরেজি বলা ছেলে আর পাইপটানা স্বামীর সঙ্গে দাঁড়িয়েছিল। এই কথা শুনে হঠাৎ লিপস্টিক চিরে একটু হাসে।
ফুলঝুরি কাকিমার কানে-কানে বলে—শাড়িটা দেখেছ? সোনারপুরের কমলাদি এরকম একটা কিনেছে না? নথ-নাড়া বউ বলে—যাঃ, সেটা তো চাঁদেরি। এটা জর্জেট।
একটা দেড় হাত লম্বা ঠোঁটওয়ালা পাখি ঘেরা জায়গা থেকে লোভীর মতো মুখ বের করে বারবার হাঁ করছে। সেই হাঁয়ের মধ্যে পতু ছোলা ছুড়ে দিচ্ছিল ভয়ে-ভয়ে। কপাৎ করে পাখিটা ঠোঁট বন্ধ করে। সবক’টা ছোলা ভিতরে যায় না।
একটু বয়সের একটা মেয়ে এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি। কালীঘাটে সে একটা রঙিন মোড়া কিনতে চেয়ে বায়না করায় কাকির হাতে থাপ্পড় খেয়েছে। এতক্ষণ অনেকবার আঁচলে চোখ মুছতে হয়েছে তাকে। সামনে অঘ্রাণে তার বিয়ে, এত বড় মেয়েকে সবার সামনে মারা?
এবার সে হঠাৎ বলে ওঠে—এই পতু আমার ছোলার ঠোঙাটা নিলি যে বড়? তোরটা কই?
ফুলঝুরি বলে ওঠে—ও টিয়াদি, এতক্ষণ লুকিয়ে-লুকিয়ে পতু নিজের ঠোঙার ছোলা খাচ্ছিল। আমি দেখেছি।
—কী রাক্ষস বাবা। কাকি বলে ওঠে, পেট নামবে দেখিস।
মেজবউঠান যুবকটিকে বলে—ও ঠাকুরপো, এ-পাখিও কি বিলিতি?
কালীপদ এবার ঠেকে শিখেছে। বলে—না-না। ডিশি। সজনেখালির জলায় কত আসে।
—ওড়ে?
—তা ওড়ে।
—তবে এখান থেকেই বা উড়ে যাচ্ছে না কেন? ওপরে তো ঢাকা চাপা কিছু নেই।
কালীপদ ডানদিকে ঘুরে হাঁটতে-হাঁটতে বলে—দেরি হয়ে যাচ্ছে।
গয়াল, সারস, নীলগাই। একে-একে দেখে যেতে থাকে তারা। দুপুরের রোদে তেমন তেজ নেই। শীত আসছে। চিড়িয়াখানায় ঘন সবুজে আস্তরণ পড়েছে। জলের গন্ধ। ছুটিয়াল মানুষজনের মন্থর চলাফেরা।
—দ্যাখো, হরিণের জঙ্গল। রুপোঝুরি বলে। সে বরাবরই অদ্ভুত সব কথা বলে।
পতু আইসক্রিমওলার কাছে খানিক দাঁড়িয়ে রইল।
ডানধারের বিশাল ঘেরা জায়গায় অতিকায় কচ্ছপটা হাঁটছে। এত বড় যে কচ্ছপ বলে বিশ্বাস হয় না।
বাঁ-ধারে জলের কল দেখে সবাই আঁজলা ভরে পেটপুরে জল খেল। কুঁচো-কাঁচারা জল ছোড়াছুড়ি করল খানিক।
—হাতির পিঠে চড়বে নাকি? কালীপদ আস্তে করে জিগ্যেস করে।
নথ-নাড়া বউটা বলে—ও বাবা!
মেজবউঠান শুনতে পেয়ে হেসে বলে—চড় না। কালীপদ ধরে থাকবে’খন।
—মরণ!
ফুলঝুরি পাঁচটা পয়সা আর ছোলা ছুড়ল হাতির দিকে। হাতি ছোলা কুড়িয়ে খুঁড় দিয়ে নিখুঁত খেয়ে নিল, পয়সা তুলে পাশে বসা মাহুতের দিকে ছুড়ে দিল।
ছোটদের আলাদা একটা চিড়িয়াখানা দেখে ঢুকবে-কি-ঢুকবে না ভাবতে-ভাবতে অবশেষে ঢুকে পড়ারই সিদ্ধান্ত হল। কলকাতায় ফের কবে আসা হবে ঠিক তো নেই। মাথাপিছু পঁচিশ পয়সার টিকিট কাটতে হয় এখানে। গন্ডারকে এত কাছ থেকে দেখে সবাই অবাক মানে। পতু বাঁদরটা তো শিকের ভেতরে থেকে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়েও দিল একটু। কাকি বলে—এর চামড়াতেই ঢাল হয়?
