এটা বেশ সাজানো জায়গা। ছোট একটা খালের মতো আছে। তার ওপর খেলাঘরের সাঁকো। একটা ছোট দুর্গ। চারধারে খুদে-খুদে সব প্রাণীর খাঁচা। হরেক খরগোশ, বাচ্চা হরিণ, মেছো কুমির, মাদা ইঁদুর।
সবচেয়ে অবাক লাগে ইঁদুরের মতো দেখতে হরিণ দেখে। কী ছোট, কী সুন্দর!
আর লজ্জাবতী বানর? না, তার কথা জীবনেও ভুলবে না যে একবার দেখেছে। দেড় বিঘৎ এর ছোট্ট একটু বানরটা তার একার খাঁচায় হাঁটু আর হাতের মধ্যে মুখ লুকিয়ে বসে আছে। শরীরটা গোল হয়ে আছে। যত তাকে ডাকো, ভ্যাঙাও, ঢিল মারো, সে মুখ তুলবে না। টিয়ার বুকটা দুঃখে ভরে গেল। জীবজন্তুর কত কষ্ট থাকে। সবুজ কচ্ছপ আর বাচ্চা কুমির বাস করছে এক জায়গায়। একটা কচ্ছপ কুমিরের গা বেয়ে উঠে গেল দিব্যি। আড়াল থেকে কথা-বলা ময়না ডাকছে মুহুর্মুহু। সে ডাকে বুক ঝনঝন করে বেজে ওঠে। কী মিষ্টি ডাক!
শীতের স্পর্শ-লাগা বেলা পড়ন্ত হয়ে আসছে। চলো, চলো। আরও কত দেখার বাকি।
—সাপ দেখবে না?
–না বাবা, বড় গা ঘিনঘিন করে।
—সাপ আর দেখবার কী আছে? গাঁয়ে তো কত দেখছি।
—তবে চলো ওই বাঘ দেখি, তারপর লম্বা সাঁকো পেরিয়ে যাব জলের ওধারে।
–কী আছে ওখানে?
–জলের মধ্যে একটা দ্বীপ। তাতে হাজারো পাখি রাত কাটাতে আসে। কলকাতার পাখিদের গ্র্যান্ড হোটেল হল ওই দ্বীপ।
বাতাস কাঁপিয়ে বাঘ ডেকে ওঠে। ওংঘ-অ! ওংঘ-অ!
পতু প্রথমটায় সাপটে ধরেছিল ফুলঝুরিকে। তারপর ছেড়ে দিয়ে হিহি করে হাসতে থাকে।
—যা ভীতু না তুই! ফুলঝুরি বলে।
–বাঘ! বাঘ! বাঘ বলে রুপোঝুরি লাফাতে থাকে।
কালীপদ বলে সুন্দরবনে কত আছে।
—তুমি দেখেছ কখনও? নথ-নাড়া বউ খোঁটা দেয়।
–সুন্দরবনের বাঘ জীবনে একবারই দেখে মানুষ। যখন দেখে তখন আর ফেরে না। বউ মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলে—দেখে তবে কাজ নেই।
—এবার মাঘ মাসে যাব দেখতে।
—যাওয়াচ্ছি।
অস্থির পায়চারি করছে সিংহ। তার বিশ্রাম নেই, ক্লান্তি নেই। চোখে কিছু হতাশার রাগ। হলদে মুলোর মতো দাঁত বের করে মুখোমুখি বাঘ একবার ডাকল। ত্রিভুবন কেঁপে ওঠে।
এই না হলে বাঘ!
সবুজ জলের ওপর দিয়ে লম্বা সাঁকো পার হয়ে যায় সবাই। জলের ধারে একটা বাঁধানো বসবার জায়গা। বড় সুন্দর। জলের মাঝখানে উঁচু মতো ছোট একটা দ্বীপ। গাছগাছালিতে ভরা। তাতে হাজার-হাজার পাখি এসে পড়ছে। স্থির জলে যমজ ছায়া ফেলে ময়ূরপঙ্খীর মতো ভেসে যায় সাদা আর কালো রাজহাঁস।
সন্ধের মুখে খাওয়ার সময়। ভালুকটা গপাগপ ডালভাত খাচ্ছিল তার খাঁচায় বসে। বড় খিদে।
সিংহ দেখবে না? কিংবা সিংঘ্র? সাদা বাঘ?
দেখব, দেখব।
ওমা! এর বাবা বুঝি বাঘ আর মা সিংহী? আর এর বুঝি বাপ সিংহ, আর মা বাঘিনী? বাবা রে, দুজনের তেজ কেমন এক হয়েছে দ্যাখো। খাঁচায় আঙুল ঢুকিয়ে দেখবে নাকি একটু চাটে না। কামড়ায়?
—ও পতু, সরে আয় দস্যি ছেলে।
সান গ্লাস পরা সেই সুন্দরী আর তার স্বামী আর ছেলে গাছতলায় বেঞ্চে বসে ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে খাচ্ছে। ছেলের হাতে একটা কেক। পতু চেয়ে থেকে একটা ঢোক গেলে।
ফুলঝুরি আর টিয়ার জানোয়ার দেখতে আর ভালো লাগছে না। তারা আশপাশের মেয়ে বউদের শাড়ি আর সাজ দেখে। গা টেপাটেপি করে হাসে।
নথ-নাড়া বউ বলে—আর পারি না। একটু বসলে হয়।
কালীপদ বলে—আজ তো আর গাঁয়ে ফেরা হবে না। সোনারপুরে কমলাদের বাড়িই থাকতে হবে। কিন্তু সে-ও একটু আগে যাওয়া দরকার। এতগুলো লোকের জন্য আয়োজন।
নথ-নাড়া বউ আস্তে-আস্তে বলে—তোমাতে আমাতে একবার আলাদা করে আসব, বুঝলে! কেমন জোড়ায়-জোড়ায় কতজনা ঘুরে বেড়াচ্ছে দ্যাখো তো!
–কাকা, বাদামভাজা কিনবে? পতু বলে।
সবাই সব ভুলে যায় ম্যাকাও পাখির খাঁচার সামনে এসে। পয়সা সার্থক। চোখ সার্থক। কষ্ট সার্থক।
—এত সুন্দর রামধনুর মতো পাখিও ছিল দুনিয়ায়? ও কালীপদ, এ কি রং করা পাখি?
—না, কাকি, এইরকমই হয়।
ম্যাকাও ঝুল খাচ্ছে খাঁচার গায়ে। কর্কশ স্বরে ডাকছে। খাঁচা কেটে বেরিয়ে যাওয়ার কত নিষ্ফল প্রয়াস তাদের।
—আহা, রে, ওদের কেন ছেড়ে দেয় না?
—ছেড়ে দিলে কি দেখতে পেতে?
বেলা গড়িয়ে যায়। রৌদ্রতপ্ত ঘাসে, নিবিড় গাছপালায় বনের গন্ধ ঘনিয়ে ওঠে। তাপ মরে আসে। ঘাসে-ভেজা শরীরে শীত-বাতাস এসে লাগে। ফেরার সময় হল।
মানুষ ফিরে যায়। তারপর কয়েকটা দিন হয়তো কলকাতার বুকে আশ্চর্য বনভূমির কথা মনে পড়ে। কাজের মধ্যে হঠাৎ-হঠাৎ বাঘের ডাক শোনে। রাতের ঘুমে ম্যাকাও পাখির সৌন্দর্য রঙের ফোয়ারা খুলে দেয় চোখে।
চিহ্ন
অন্ধকারে ভেসে যাচ্ছে জ্বলন্ত মোমবাতি।
হলুদ আলোয় যেন জলের মধ্যে জেগে আছে ইভার মুখ। মুখখানা এখন ভৌতিক। একটু নীচুতে আলো, শিখাটা হেলছে, দুলছে, কাঁপছে। ইভার মুখে সেই আলো। গালের গর্তে, চোখের গর্তে, কপালের ভাঁজে ছায়া। মুখখানা যেন বা এখন ইভার নয়। ইভা এ ঘর থেকে ও ঘরে যাচ্ছে। মাঝখানের পরদা উড়ছে হাওয়ায়।
অমিত বলে–সাবধান। পরদায় আগুন না লাগে!
ইভা কিছু বলল না। জলে ক্লান্ত সাঁতারু যেমন শ্লথ গতিতে ভেসে যায়, তেমনি এ ঘর থেকে ও ঘরে চলে গেল।
অন্ধকারে চৌকিতে বসে আছে অমিত। তার কোল ঘেঁষে পাঁচ বছরের ছেলে টুবলু আর তিন বছরের মেয়ে অনিতা। যখনই কারেন্ট চলে যায় তখনই অমিত তার দুই ছেলেমেয়েকে ডেকে নিয়ে বিছানায় বসে থাকে। বড্ড ভীতু অমিত। অন্ধকারে কোথায় কোন পোকামাকড় কামড়ায় কিংবা আসবাবপত্রে হোঁচট লাগে। কিংবা খোলা পড়ে–থাকা ব্লেড বা ইভার পেতে–রাখা অসাবধান বঁটিতে গিয়ে পড়ে। কিংবা এরকম আর কিছু হয় সেই ভয় তার। বুক ঘেঁষে ছেলেমেয়েরা বসে আছে বুকের দুই পাঁজরে দুজনের মাথা। অমিত ঘামছে।
