বিকেল ফুরিয়ে এলে আমরা নিঃশব্দে উঠে আসতাম।
একদিন ওইভাবে দাদু ধ্যানস্থ। নদীর ওপর শীতের শেষবেলার একটা অদ্ভুত আবছা আলো পড়েছে। ফসলের খেত নিস্তব্ধ নিঃসাড়। একটা কুয়াশার গোলা নদীজল থেকে উঠে আসছে। ঘাটে জনহীন নৌকো বাঁধা। জলে স্রোত নেই, শব্দ নেই।
সেই বয়সের যা স্বভাব। আমি উঠে কিছুদূর একা-একা হাঁটলাম। কাঁকড়ার গর্ত, মানুষ ও পশুর মল পড়ে আছে, বিজবিজে কাঁটাঝোঁপ সর্বত্র। জলের একটা পচাটে গন্ধ শীতের বাতাসকে ভারী করে তুলছিল। একটা লাল বল গড়িয়ে–গড়িয়ে পায়ে-পায়ে নিয়ে আমি আস্তে-আস্তে ছুটছি। কখনও দাঁড়াচ্ছি। দাদুর দিকে ফিরে দেখি, দাদু তেমনি বসে আছেন। সাদা লাঠিটা দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে।
কোথায় একটা ইশারা ছিল। একটা ইংগিতময় ষড়যন্ত্র! নদীর ভাঙা পাড় বেয়ে নেমে গিয়ে জল ছুঁয়ে শীতভাব টের পাই। বলটায় নোংরা লেগেছিল। সেটা জলে ধুয়ে উঠে আসছি, ঠিক সে সময়ে মুখ তুলে দেখি ঠিক মাথার ওপরে হেলা বাড়িটা ঝুলছে। ভিতের থেকে মাটি ক্ষয়ে গিয়ে একটা ঝুল বারান্দার মতো ঝুঁকে আমাকে দেখছে।
এত কাছ থেকে ওভাবে বাড়িটাকে দেখিনি কখনও। দাদুকে তখনও দেখা যাচ্ছিল, বিকেলের হালকা অন্ধকার তাঁকে ঢেকে ফেলেনি তখনও। সাদা লাঠিটা তখনও ঝলকাচ্ছে। মুখ তুলে বাড়িটা আবার দেখি। বাড়িটার মাথার ওপরে একটা ফ্যাকাসে চাঁদ।
ভূতটাকে তখনই দেখতে পেলাম।
কথাটা কিছু ভুল হল। ভূতটাকে আসলে আমি দেখেছি কি? বোধহয় না। দেখা নয়, ভূতটাকে তখনই টের পেলাম।
নদীর দিক থেকে কখনও-কখনও হাওয়া দেয়। দমকা হাওয়া! একবার শ্বাস ফেলেই চুপ করে যায়। চাঁদের আলোটা তক্ষুনি একটু ঢেকে দিল কুয়াশা এসে। ঘোমটা খুলে বাড়িটা তখন চারধারে চেয়ে দেখে নিল একটু।
পায়ে-পায়ে আমি খাড়া পাড় বেয়ে উঠতে লাগলাম। কোনও কারণ ছিল না, কেবল মনে হল, একটু বাড়িটা দেখে আসি তো।
কিন্তু দেখার কিছু ছিল না, চারধারে ভাট আর শ্যাওড়ার জঙ্গল, বিছুটির পাতা ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে আছে। দু-একটা বড় নিম গাছ, এসব পার হয়ে অন্ধকার দরজার কাছে গেলে দেখা যায়, ভিতরে গভীর অন্ধকার, ধুলোর ধূসরতা, চামচিকে ডেকে ওঠে। একটা বাদুড় ডানা ভাসিয়ে শূন্যে ঝুলে পড়ে আচম্বিতে। দাঁড়িয়ে থাকি। অন্ধকার সয়ে আসে চোখে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ দেখতে পাই, বড় ঘরটার মেঝেয় একটা চিঠি পড়ে আছে। একটা চিঠি। আর কিছু নয়।
একটার-পর-একটা বাদুড় অন্ধকারের আভাস পেয়ে জানলা দরজা দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, জ্যোৎস্নায় ঝুলে পড়ছে নদীর ওপরকার শূন্যতায়। ব্যস্ত চামচিকেরা ডাকছে পরস্পরকে। পুরীষ গন্ধ নাকে এসে লাগে। দাঁড়িয়ে থাকি! একটা চিঠি পড়ে আছে ঘরে।
কার চিঠি? কাকে লিখেছে? কে ফেলে গেল ওইখানে?
একসঙ্গে অনেকগুলি শব্দ ওঠে। নিমগাছে ফিসফিস হাওয়া কথা কয়। তক্ষক ডেকে ওঠে নিজস্ব ভাষায়। বাড়িটার ভিতরে নীচে অদৃশ্য জলের শব্দ হয়। কার চিঠি! কার চিঠি!
দাঁড়িয়ে থাকি। চিঠিটা পড়ে আছে ধুলোয়। সাদা, চৌকো।
সন্ধে হয়ে এল। আলো জল থেকে তুলে নেয় তার শরীর। নদীর পরপারে ঘোর লাগা অন্ধকার। বেলা যায়।
কথা হয়। সে কেমন কথা কে জানে! কিন্তু তবু জানি, চারধারে কথা হয়। গাছের, জলের, বাতাসের, কীট–পতঙ্গের। প্রাণপণে তারা করে বার্তা বিনিময়। সে রকমই একটা কথা চারধারে তৈরি হতে থাকে।
হঠাৎ উত্তর পাই–তোমার, নাও।
প্রকাণ্ড অন্ধকার ঘরের মেঝেয় চিঠিখানা পড়ে আছে। সাদা, চৌকো। তুলে নাও। ও চিঠি তোমার জন্যই পড়ে আছে।
আমার চারধার অপেক্ষা করছে, দেখছে। চিঠিটা আমি তুলে নিই কি না।
আমি নিলাম না।
দাদু দূর থেকে ডেকেছিল–কোথায় গেলে ভাই?
আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। মাথা নেড়ে বললাম–না, নেব না।
উত্তর পেলাম–যেখানেই থাকো, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকো, একদিন-না-একদিন এই চিঠি ঠিক তোমার ঠিকানা খুঁজে যাবে। চিঠি পাবে, চিঠি পাবে।
ভূতটা আমি দেখেছিলাম সেই প্রথম ও শেষবার, পুরোনো পোস্ট–অফিসের বাড়িতে। ঠিক দেখা একে বলে না। অনুভব করা। একটা প্রকাণ্ড ঘর, ধুলোটে মেঝে, একটা সাদা চৌকো চিঠি পড়ে আছে।
ভয় করে না। তবে চোখে জল আসে কখনও কখনও। বয়স হল। কবে সেই শহর ছেড়ে চলে এসেছি। কতদূরে। কিন্তু ঠিক জানি, চিঠি পাব। চিঠি পাব।
চিড়িয়াখানা
–ইঃ বাবা রে। এই শালো মানুষ খায়। গেঁয়ো যুবকটি বলল।
—গতরখানা দেখেছিস? তার প্রৌঢ় কাকার চোখ পটপটাং হয়ে খুলে আছে। নথ-নাড়া বউটা কথা বলছে না। বাক্যহারা হয়ে গেছে। কুঁচো-কাঁচাদের মধ্যে একটা ছেলে ঘুষি পাকিয়ে লাফাচ্ছে—আয় বাঘ, লড়বি? এক ঘুষিতে মুখ ভেঙে দেব।
খাঁচার শিক-এর ওপাশে ভারী চকিত পায়ে অবিশ্রান্ত পায়চারি করছে বিশাল রাজকীয় বাঘ। বিরক্ত, রাগত, ক্ষুধার্ত এবং খানিকটা বুঝি উদাসীনও। রোজ কত মরণশীল মানুষ দেখতে আসে তাকে।
বাঘ। বাঘ। মানুষের সমাজে সবচেয়ে বেশি নামডাকের জানোয়ার। বাঘের নাম করলেই যেন একটা ‘গাঁক’ শব্দ শুনতে পায় মানুষ।
গেঁয়ো মানুষের দঙ্গলটা বাঘের খাঁচার সামনে অনেকক্ষণ কাটায়। খুব ভোরে তারা গাঁ ছেড়ে বেরিয়েছে। পাঁচ মাইল হেঁটে এসে গোসাবার লঞ্চ ধরেছে সকালে। ক্যানিং থেকে ট্রেনে বালিগঞ্জে। সেকেন্ড ক্লাস ট্রামে চেপে কালীঘাট। সেখানে এর-ওর কোমর ধরে মানুষের রেলগাড়ি হয়ে সার দিয়ে মন্দিরে ঢুকে পুজো দিয়েছে। কপালে সিঁদুর, হাতে শালপাতার ঠোঙায় প্রসাদ নিয়ে বেরিয়ে এসে খুব জিলিপি আর কচুরি দিয়ে উপোসভঙ্গ করেছে সবাই। তারপর চলো চিড়িয়াখানা।
