দীনবন্ধুর পরে আসেন মনোমোহন বসু (১৮৩১-১৯১২)। তিনি লেখেন রামের অধিবাস ও বনবাস (১৮৬৭), প্রণয় পরীক্ষা (১৮৬৯), সতী (১৮৭৩), হরিশচন্দ্র (১৮৭৫), ইত্যাদি নাটক। এ-সময়ে আসেন আরো অনেক নাট্যকার। তাঁদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন লেখেন বসন্তকুমারী (১৮৭৩), জমিদার দর্পণ (১৮৭৩); মণিমোহন সরকার লেখেন মহাশ্বেতা (১২৬৬); হরিশচন্দ্র মিত্র লেখেন মাও ধরবে কে?(১৮৬২)।
উনিশশতকের শেষাংশে মঞ্চ আলোকিত করেছিলেন অনেক নাট্যকার। তারা সবাই নাটককে এগিয়ে দিয়েছেন। সকলের কথা বলবো না, শুধু উল্লেখ করবো কয়েকজন প্রধান নাট্যকারকে। তাঁরা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫), গিরিশচন্দ্র ঘোষ [১৮৪৪-১৯১২], অমৃতলাল বসু (১৮৫৩-১৯২৯), দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩), ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (১৮৬৪-১৯২৭)।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন নানা গুণে গুণী; তীব্র দেশপ্রেমিক। তিনি রবীন্দ্রনাথের বড়ো ভাই। রবীন্দ্রনাথের ওপর জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রভাব অনেক। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ গান গাইতেন, নাটক লিখতেন, দেশোদ্ধারের স্বপ্ন দেখতেন, বাঙালি জাতীয়তার বিকাশ সাধন করতে চাইতেন। তিনি রচনা করেছিলেন অনেকগুলো নাটক ও প্রহসন। তাঁর রচনা ছিলো মঞ্চসফল। তিনি প্রথমে রচনা করেন একটি প্রহসন, নাম কিঞ্চিৎ জলযোগ (১৮৭২)। এটিতে তিনি বিদ্রুপ করেন নব্যব্রাহ্মদের অর্থাৎ তাদের, যারা ছিলো কেশবচন্দ্র সেনের অনুসারী। তাঁর আরেকটি প্রহসন হলো অলীক বাবু (১৮৭৭)। এটির নায়ক বাবু অলীকপ্রকাশ মিথ্যে কথাকে শিল্পকলায় পরিণত করেছিলো। বেশ মজার বই এটি। তাঁর কয়েকটি নাটক হচ্ছে পুরুবিক্রম (১৮৭৪), সরোজিনী (১৮৭৫), অমতি (১৮৭৯), স্বপ্নময়ী (১৮৮২)। এছাড়া তিনি অনুবাদ করেছিলেন অনেকগুলো নাটক; ইংরেজি থেকে, ফরাশি থেকে, সংস্কৃত থেকে। ইংরেজি ও ফরাশি থেকে তিনি অনুবাদ করেন রজতগিরি (১৩১০), হঠাৎ নবাব (১৮৮৪), দায়ে পড়ে দারাহ (১৩০৯)। সংস্কৃত থেকে তিনি অনুবাদ করেছিলেন অনেক নাটক। তার কয়েকটি হচ্ছে অভিজ্ঞানশকুন্তল, উত্তরচরিত, মালতীমাধব, মুদ্রারাক্ষস, মৃচ্ছকটিক।।
গিরিশচন্দ্র ছিলেন নট ও নাট্যকার। তিনি লিখেছিলেন পঁচাত্তরটি নাটক; বাঙলাদেশে এতো নাটক আর কোনো নাট্যকার লেখেন নি। তাঁর নাটক শিল্পমূল্যে খুব উচ্চ নয়, তাঁর অধিকাংশ নাটকই মধুসূদনের ভাষায় কুনাট্য’, তবে দর্শকেরা মজেছিলো এগুলোতে। তাঁর কয়েকটি নাটক আনন্দ রহো (১২৮৮), চৈতন্যলীলা, প্রফুল্ল (১৮৯১), হারানিধি (১৮৯০), জনা (১৮৯৩)। তিনি শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ অনুবাদ করেছিলেন। তিনি দেশপ্রেমমূলক নাটক লিখেছিলেন সিরাজদ্দৌলা, মীরকাশিম, ছত্রপতি শিবাজি। অমৃতলাল বসুও ছিলেন অভিনেতা ও নাট্যকার। তিনি অনেকগুলো প্রহসন রচনা করেছেন। তাঁর নাটক ও প্রহসন হচ্ছে হীরকচূর্ণ (১৮৭৫), তরুবালা (১২৯৭), চোরের উপর বাটপারি (১২৮৩), ডিসমিস, তাজ্জব ব্যাপার। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছেন নাটক ও প্রহসন। তিনি বাঙলার শ্রেষ্ঠ নাট্যকারদের একজন। তাঁর নাটক ও প্রহসন হলো কল্কি অবতার (১৮৯৫), বিরহ (১৮৯৭), তারাবাই (১৯০৩), প্রতাপসিংহ (১৯০৫), দুর্গাদাস (১৯০৬), নূরজাহান (১৯০৮), মেবার পতন (১৯০৮), শাজাহান (১৯০৯), চন্দ্রগুপ্ত (১৯১১)। তাঁর নাটকে রয়েছে অনেক স্মরণীয় সংলাপ, যেগুলো একসময় মুখেমুখে ফিরতো। চন্দ্রগুপ্ত নাটকে আছে কি বিচিত্র এই দেশ। ক্ষীরোদপ্রসাদ লিখেছিলেন চল্লিশটির মতো নাটক। তাঁর দুটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটক প্রতাপ-আদিত্য (১৯০৩), ও আলমগীর (১৯২১)। তিনি বিশেষ জনপ্রিয় আলিবাবা (১৮৯৭) নাটকের জন্যে। উনিশ ও বিশশতকে বাঙলা ভাষায় অসংখ্য নাটক’ লেখা হয়েছে, তার মধ্য থেকে মধূসূদন, রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর নাটকগুলো বাদ দিলে যা থাকে, তার শিল্পমূল্য খুবই কম।
রবীন্দ্রনাথ : প্রতিদিনের সূর্য
আকাশে সূর্য ওঠে প্রতিদিন, আমরা সূর্যের স্নেহ পাই সারাক্ষণ। সূর্য ছাড়া আমাদের চলে না। তেমনি আমাদের আছেন একজন, যিনি আমাদের প্রতিদিনের সূর্য। তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। তিনি আমাদের জীবনে সারাক্ষণ আলো দিচ্ছেন। তিনি বাঙলা ভাষার সবার বড়ো কবি। তাই নয় শুধু, তিনি আমাদের সব। তিনি কবিতা লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, উপন্যাস লিখেছেন, নাটক রচনা করেছেন, গান লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি কী লেখেন নি? তিনি একাই বাঙলা সাহিত্যকে এগিয়ে দিয়ে গেছেন কয়েকশো বছর। আজ যে বাঙলা সাহিত্য বেশ ধনী, তার বড়ো কারণ তিনি। তাই রবীন্দ্রনাথের কথা সহজে অল্প কথায় বলা খুব কঠিন। তাঁর কথা ভালোভাবে লিখতে হলে বিরাট বিরাট বই লিখতে হয়। তিনি জন্ম নিয়েছিলেন ১৮৬১ অব্দের মে মাসের সাত তারিখে। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। বঙ্গাব্দ অনুসারে দিনটি ছিলো পঁচিশে বৈশাখ। তাঁর পিতার নাম দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মায়ের নাম সারদা দেবী। তিনি লোকান্তরিত হন ১৯৪১ অব্দের আগস্ট মাসের সাত তারিখে। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২-এ শ্রাবণ।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান। বাল্যকাল থেকেই তিনি সাহিত্যে উৎসাহী ছিলেন। তাঁদের বাড়ির সবাই ছিলেন সাহিত্যে উৎসাহী। তাঁর পিতা ছিলেন লেখক, বড়ো ভাইয়েরা ছিলেন লেখক, বড়ো বোন ছিলেন লেখিকা। তিনিও তাঁদের দেখাদেখি লেখা শুরু করেছিলেন শিশুবয়সে। তিনি ভালোবাসতেন কবিতা পড়তে, ভালোবাসতেন গাছপালার সৌন্দর্য দেখতে। গাছপালা অর্থাৎ প্রকৃতিই ছিল তাঁর বড়ো শিক্ষক। স্কুল তাঁর ভালো লাগতো না। স্কুলের দেয়ালগুলো মনে হতো পাহারাওলাদের মতো কঠোর। তাঁর জীবনকাহিনী তোমরা তাঁর নিজের লেখা দুটি বই থেকে জেনে নিতে পারো। সে-বই দুটি হচ্ছে জীবনস্মৃতি ও ছেলেবেলা। এ-বই দু’টিতে তিনি নিজের কথা বলেছেন মধুর করে; তবে তার আরো অনেক কথা ছিলো বলার, কিন্তু বলেন নি। তাঁর গোপন কথা তিনি গোপন করে গেছেন, কেননা আমাদের সমাজ হচ্ছে গোপনীয়তার সমাজ। সব সত্য এখানে প্রকাশ করা যায় না।
