কিম্বা হয়ত কুকুরই তাঁর ঘাড়ে পড়েছিল, কেননা কুকরের হয়ে কুকুরের মালিক মার্জনা চান—I am sorry Babul
ভারতচন্দ্র জবাব দেন–But I am glad-very glad। আমার হাত টিপে ফিস ফিস্ করেন–দেখছিস, সাহেবের কুকুর এসে ঘাড়ে পড়েছে। সাদা চামড়ার লোক কামড়ে না দিয়ে আপ্যায়িত করেছে–এ কি কম কথা রে? নোবেলপ্রাইজ তো মেরেই দিয়েছি। কি বলিস?
আমি আর কি বলব! হয়ত কিছু বলতে যাই এমন সময় অকুস্থলে শ্রীশ্রীহরগোবিন্দর অভ্যুদয় হয়।
আশীর্বাদের প্রত্যাশায় ভরতচন্দ্র ঘাড় হেঁট করেন। কিন্তু দাদার মুখ থেকে যা বেরোয়, তা ঠিক আর্শীবাণীর মত শোনায় না–
বৎস, ফিরে চল, ফিরে চল আপন ঘরে। নোবেল প্রাইজ তোমার জন্য নয়।
শরতের আকাশে (কিম্বা ভারতের?) যেন বিনামেঘে বজ্রাঘাত! আমরা স্তম্ভিত, হতভম্ব, মুহ্যমান হয়ে পড়ি। এত আয়োজন, প্রয়োজন–সব পণ্ড তা হলে?
বস প্রথমে যোগবলে যা বলেছিলাম, তা ঠিক নয়। তাছাড়া সেদিন আমার ভাগবৎ মাথার অবস্থা ভালো ছিল না–ভাগবৎ যোগের সঙ্গে কড়িকাঠ যোগ ঘটেছিল কিনা! আজ সকালে আবার নতুন করে যোগ করলাম, সেই যোগফলই তোমাকে জানাচ্ছি।
ফুঁ দিয়ে বাতি নিবিয়ে দিলে ঘরের চেহারা যেমন হয়, ভরতচন্দ্রের মুখখানি ঠিক তেমনি হয়ে গেল (উপমাটা বাজারে–চলতি চতুর্থ শ্রেণীর উপন্যাস থেকে চুরি করা সেই মুখভাবেরা হুবহুব বর্ণনা দেবার জন্যই, অবশ্য!)
হরগোবিন্দ বাণীবর্ষণ চলতে থাকে;–বৎস, সব যোগের চেয়ে বড় যোগ কি, জানো? রাজযোগ, জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ, ভক্তিযোগ, ধ্যানযোগ, মনোযোগ, অধোদয়যোগ সব যোগের সেরা হচ্ছে। যোগাযোগ। এই যোগাযোগ ঘটলেই, তার চেয়েও বড়ো, বলতে গেলে শ্রেষ্ঠতম যে যোগের প্রকাশ আমরা দেখতে পাই, তা হচ্ছে অর্থযোগ। এবং তা না ঘটলেই বুঝতে পারছ যাকে বলে অনর্থযোগ। রবীন্দ্রনাথের বেলা এই যোগাযোগ ছিল, তাই তার নোবেল প্রাইজ জুটেছে; তোমার বেলা তা নেই। কি করে আমি এই যোগফলে এলাম, তোমরাও তা কষে দেখতে পারো। রবীন্দ্রনাথ + পাকা দাড়ি + টাকার থলি + নোবেল প্রাইজ। কিন্তু তোমার পাকা দাড়িও নেই, টাকাকড়িও নেই–বস বরতচন্দ্র, সে যোগাযোগ তোমার কই?
ভরতচন্দ্রের করুণ কণ্ঠ শোনা যায়–কিছু টাকা আমিও যোগাড় করেছি। আর দাড়ির কথা যদি বলেণ, না হয় আমি পরচুলার মত একটা পরদাড়ি লাগিয়ে নেব।
শ্রীহরগোবিন্দ প্রস্তাবটা পর্যালোচনা করেন, কিন্তু পরক্ষণেই দারুণ সংশয়ে তার মুখ-চোখ ছেয়ে যায়–কিন্তু তারা যদি প্রাইজ দেবার আগে টেনে দ্যাখে, তখন?
সেই ভয়ঙ্কর সম্ভাবনা আমার মনেও সাড়া তোলে। সত্যিই তো, তখন? ভরতচন্দ্রও বারবার শিউরে ওঠেন।
নাঃ, সে কথাই নয়! ভরতচন্দ্র, তুমি মর্মাহত হয়ো না। যেমন half a loaf is better than no loaf, তেমনি half a বেল is detter than নোবেল। তোমার জন্য আমি প্রাইজ এনেছি, তা নোবেলের চেয়ে বিশেষ কম যায় না। বিবেচনা করে দেখলে অনেকাংশে ভালোই বরং। বৎস, এই নাও।
বলে কাগজে-মোড়া একটা প্যাকেট ভরতচন্দ্রের হাতে দিয়ে, মুহূর্তে বিলম্ব না করে ভিড়ের মধ্যে তিনি অন্তর্হিত হন। আমরা প্যাকেট খুলতে থাকি, মোড়কের পর মোড়ক খুলেই চলি, কিন্তু মোড়া আর ফুরোয় না। অবশেষে আভ্যন্তরীণ বস্তুটি আত্মপ্রকাশ করে।
আর কিছু না, একটা কদবেল।
হর্ষবর্ধনের কাব্যচর্চা
বাড়ির দরজায় কে যে এক-পাল ছাগল বেঁধে গেছল, তাদের চাঁ-ভা পাড়াটা মাত। হর্ষবর্ধন তখন থেকে উঠে-পড়ে লেগেছেন, কিন্তু মনই মেলাতে পারছেন না, তা কবিতা মেলাবেন কী!
দূর ছাই! বিরক্ত হয়ে বলেছেন হর্ষবর্ধন, পাঁঠার সঙ্গে খালি পেটের মিল হতে পারে কবিতার মিল হয় না। পাঠারা অপাঠ্য। •
আজই একটু আগে গোবরার হাতে তিনি মোটা খাতাটা দেখেছিলেন। চামড়ায় বাঁধানো চকচকে-অবিকল বইয়ের মতো। কৌতূহল প্রকাশ করায় গোবরা জানিয়েছিলো–এটা আমাদের কবিতার খাতা, আমরা কবিতা লিখবো। পরে ছাপা হয়ে বই আকারে বেরুবে! আমাদের কবিতার বই।
আমরা মানে? আমরা কারা? ভাইয়ের কথায় দাদা একটু ঘাবড়েই গেছেন।
আমরা অর্থাৎ তুমি আর আমি। আবার কে? গোবরা ব্যক্ত করেছে।
আমি! আমি লিখবো কবিতা! কেন, কি দুঃখে? হর্ষবর্ধন আকাশ থেকে পড়েছেন : আমাদের কাঠের কারবার বেঁচে থাকতে। কবিতা লিখতে যাবো কিসের দুঃখে?
চিরটা কাল তো আকাট হয়েই কাটালে। কেন, কবি হওয়াটা কি খারাপ?
ধুত্তোর কবি! কী পাপ করেছি যে আমায় কবিতা লিখতে হবে! হর্ষবর্ধনের কভি নেহি মেজাজ।
কেন, পাপ কিসের! গোবরা জবাব দিয়েছে, কবিতা লেখা কি পাপ? ব্যাস-বাল্মীকি, কালিদাস-কৃত্তিবাস, ওমর-ওমর বলতে বলতে গোবরার কোথায় যেন আটকে যায়।
দূর বোকা! ওমর নয়, অমর। জানি কবিতা লিখে এঁরা সবাই অমর। জানা আছে। হর্ষবর্ধন ভাইকে জানাতে দ্বিধা করেন না।
অমর নয়, ওমর। আরেকজন নামজাদা কবিতার নামের সঙ্গে আরো দু-দুটো খাবার জিনিস জড়ানো কিনা। খাবাগুলো আমার মনে আসছে না ছাই!
ওমরত্ব ছাড়াও দুরকমের খাবার? ভাল খাবার? ঠিক কাব্যরস না হলেও হর্ষবর্ধনের জিভে এক রকমের রস জমে।
মনে পড়েছে। খই আর আম। ওমর খৈআম। হ্যাঁ, তুমি কি বলতে চাও ব্যাস, বাল্মীকি, কালিদাস, কৃত্তিবাস আর আমাদের ওই ওমর খৈআম–এঁরা সবাই কবিতা লিখে পাপ করে গেছেন?
