আরে সাহিত্য না হোক কথা-শিল্প তো হয়? তা হলেই হোলো। কথা-শিল্প আর কাঁথা-শিল্প এই দুটোই তো আমাদের জাতীয় সম্পদ, বলতে গেলে-আর কি আছে? সহসা আত্ম-প্রসাদের ভারে দাদা কাতর হয়ে পড়েন, ভরত, তোমাকেই আমার বাহন করব, বুঝলে? তুমিই আমার মহিমা প্রচার করবে জগতে। কিন্তু দেখো শ্রীভ কথিত যেন সাত খণ্ডের কম না হয়। (আমার দিকে দৃকপাৎ করে) তোদের কেনা চাই কিন্তু।
আমি দাদাকে উৎসাহ দিই–কিনব বইকি। আমরা না কিনলে কে কিনবে?
দাদা কিন্তু খিঁচিয়ে ওঠেন–কে কিনবে। দুনিয়া শুষ্টু কিনবে। আর কেউ না কিনুক রোমা রোলী কিনবে একখানি। (তারপর একটা সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে) ওই লোকটাই কেবল চিনল আমাদের,–আর কেউ চিনল না রে।
এমনি চলছিল–এমন সময়ে দাদার যোগচর্চার মাঝখানে এক শোচনীয় দুর্ঘটনা ঘটল। দাদা যোগবলে আড়াই হাত ওঠেন, পৌনে তিন হাত ওঠেন তিন হাত ওঠেন এমনি ক্রমশঃ চলে, হঠাৎ একদিন আকস্মিক সিদ্ধিলাভ করে একবোরে সাড়ে সাত হাত ঠেলে উঠেছেন। ফলে চিলকোঠার ছাদে দারুণভাবে মাথা ঠুকে গেছে দাদার। ঘরখানা, দুর্ভাগ্যক্রমে, সাড়ে পাঁচ হাতের বেশি উঁচু ছিল না।
কলিশনের আওয়াজ পেয়ে বাড়িশুদ্ধ লোক ওঘরে গিয়ে দ্যাখে, দাদা কড়িকাঠে লেগে রয়েছেন। মানে, মাথাটা সাঁটা, উনি অবলীলাক্রমে ঝুলছেন চোখ বোজা, গা এলানো। ওটা যোগ-সমাধি কি অজ্ঞান-অবস্থা, ঠিক বোঝা গেল না–দেখলে মনে হয়, যেমন কড়িকাঠকে বালিশ করে আকাশের ওপর আরাম করেছেন।
ভগবৎ মাথা বলেই রক্ষা, ছাতু হয়নি। অন্য কেউ হলে ঐ ধাক্কায় আপাদমস্তক চিড়ে চ্যাপটা হয়ে একাকার হয়ে যেত। যাই হোক দাদাকে তা বলে তো কড়িকাঠেই বরাবর রেখে দেওয়া যায় না,–কিন্তু নামানোই বা যায় কি করে?
বাড়িশুদ্ধ সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠল। কিন্তু কি করবে, ঘরের ছাদ সাধারণতঃ হাতের নাগালের মধ্যে নয়–বেশির ভাগ ছাদ এমনি বে-কায়দায় তৈরি। অবশেষে একজন বুদ্ধি দিল, দাদার পায়ে দড়ির ফাঁস লাগিয়ে, কূপ থেকে যেমন জলের বালতি তোলে, তেমনি করে টেনে নামানো যাক। অগত্যা তাই হলো।
আমি যখন দাদার সান্নিধ্যে গেলাম–যেমন শোনা তেমনি ছোটা, কিন্তু ততক্ষণ দাদার পঙ্কোদ্ধার হয়ে গেছে–তখন দাদার মাথা আর বাড়ির ছাদে নেই, নিতান্তই তুলোর বালিশে। হায় হায়, এমন চমকপ্রদ দৃশ্যটাও আমার চোখ ছাড়া হোলো, চক্ষুর আগোচরে একেবারেই মাঠে (মানে, কড়িকাঠে) মারা গেল–এমনি দুরদৃষ্ট। হায় হায়।
চারিদিকের সহানুভবদের বাঁচিয়ে, বিছানার একপাশে সন্তর্পণে বসলাম। মাথার জলপটিটা ভিজিয়ে দিয়ে দাদা বললেন–ভায়া। এইজন্যই মুনি ঋষিরা বাড়ি ঘর ছেড়ে, বনে-বাদড়ে যোগসাধনা করতেন। কেননা ফাঁকা জায়গায় তো মাথায় মার নেই। যত ইচ্ছে উঠে যাও, গোলোক, ব্রক্ষ্মলোক, চন্দ্রলোক, সূর্যলোক, যদ্দুর খুশি চলে যাও, কোনো বাধা নেই–আকাশে এনতার ফাঁকা। এই কথাই তো এতক্ষণ বোঝাচ্ছিলুম ভরতচন্দ্রকে।
ভরতচন্দ্র বাধিতভাবে ঘাড় নেড়ে নিজের বোধশক্তির পরিচয় দেন।
আর এ কথাও বল বাবা ভরতকে, যে কদাপি লেখার চর্চা ছেড়ো না। ওটাও খুব বড় সাধনা। কালি-কলম-মন লেখে তিন জন–এটা কি একটা কম যোগ হলো? আর যখন চাটুজ্যে হয়ে জন্মেছ তখণ আশা আছে তোমার।
আশান্বিত ভরত জিজ্ঞাসান্বিত হয়–প্রভু, পরিষ্কার করে বলুন। আমরা মুখ-সুখ মানুষ–
প্রভু পরিষ্কার করেন–চাটুজ্যে হলেই লেখক হতে হবে, যেমন বঙ্কিম চাটুজ্যে, শরৎ চাটুজ্যে! আর লেখক হলেই নোবেল প্রাইজ।
কিন্তু আমার লেখা যে নোবেল প্রাইজওলাদের লেখার দুহাজার মাইলের মধ্যে দিয়ে যায় না, গুরুদেব! তেমন লিখতে না পারি, তেমন-তেমন লেখা বুঝতে তো পারি।
পারো সত্যি? গুরুদেব যেন সাহসা ঝাঁঝিয়ে ওঠেন, কিন্তু পরক্ষণেই কণ্ঠ সংযত করে নেন–বাংলাদেশে কারই বা যায়? আর বিবেচনা করে দেখলে, তাদের লেখাও তো তোমাদের লেখার দু হাজার মাইলের মধ্যে আসে না। তবে?
আমি ভয়ে ভয়ে বলি–তফাণ্টা অতখানিই বটে, কিন্তু আগিয়ে কে, আর পিছিয়ে কে, সেই হোলো গে সমস্যা।
দাদা অভয় দেন–বৎস ভরত, ঘাবড়ে যেয়ো না। তুমি, নারাণ ভটজাচ আর মেরী করেলী হলে এক গোত্র। পাবে, আলাবাৎ পাবে, নোবেল প্রাইজ পেতেই হবে তোমাকে। বিলেতে যাবার উদযুগ কর তুমি। আমি শুনেছি, এদশে থেকে এক-আধ ছত্র লিখতে জানা কেউ বিলেতে গেছে কি অমনি তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে নোবেল প্রাইজ গছিয়ে দিয়েছে। প্রায় কালিঘাটে পাঁঠা বলি দেওয়ার মত আর কি!
ভরতচন্দ্র উৎসাহ পায় কিন তার মুখ দেখে ঠাহর হয় না। আমি কানে কানে বলি–আরে নাই বা পেলে নোবেল প্রাইজ! এই সুযোগে বিলেতে দেখতে পাবে, অনেক সাহেব মেম দর্শন হবে, সেইটাই কি কম লাভ? বরং এই ফাঁকে এক কাজ করো, বন্ধু-বান্ধন, ভক্ত-টক্তদের মধ্যে বিলেত যাবার নামে চাঁদার খাতা খুলে ফেল, বোকা ঠকিয়ে যা দুপাঁচ টাকা আসে। তারপর নাই বা গেলে বিলেত! তোমার আঙুল দিয়ে জল গলে না জানি, নইলে এই আইডিয়াটা দেবার জন্য টাকা বখরা চাইতাম।
ভরতের মুখ একটু উজ্জ্বল হয় এবার।
তার বিলেত যাবার দিনে জাহাজঘাটে সে কী ভীড়! নোবেল-তলার যাত্রী দেখতে ছেলে বুড়ো সবাই যেন ভেঙে পড়েছে। চিড়িয়াখানার শ্বেতহস্তী দেখতেও এরকম ভীড় হয়নি কোনোদিন। স্বয়ং শ্রীহরগোবিন্দ যখন বলেছেন, তখন নোবেল প্রাইজ না হয়ে আর যায় না। যোগবাক্য কি মিথ্যে হবার? লেখার জোরে যদি না-ই হয়–যোগবল ত একটা আছে, কি না হয় তাতে? ভরতচন্দ্র জাহাজে উঠতে গিয়ে পুলকের আতিশয্যে এক কুকুরের ঘাড়ে গিয়ে পড়েন।
