অগত্যা সাহেব কর্মচারীটি চলে গেল। মামার সত্যিই কিছু সাহেবি শোপাক ছিল না, একটা চাল মারলেন মাত্র। এদিকে গাড়িও ব্যারাকপুর ছাড়ল।
অতঃপর ফিরিঙ্গীরা আর কোনো উপায় না দেখে এদের তাড়াবার ভার নিজেদের হাতে নিল। পরস্পর পরামর্শ করে এমন চেঁচামেচি শুরু করে দিল মামী দস্তুরমতো ঘাবড়ে গেলেন। মামারও যে একটু ভয় না হল এমন নয়। মামী বললেন, হ্যাঁ গা, কামড়ে দেবে না তো?
মামা খানিকক্ষণ নিঃশব্দে মাথা নেড়ে বললেন–কি জানি!
কামড়াবার কথা শুনে কেঁপি একেবারে বাবার বিরাট পরিধির পেছনে এসে আশ্রয় নিল!
মামা বললেন, ভালো ফন্দি মাথায় এসেছ। শ্রীকান্ত তুই কুকুর ডাকতে পারিস?
–না, না, বেড়াল ডাকতে হবে না। মাঝে মাঝে তুই কুকুরের মতো ডাক দিখি! শ্রীকান্ত ডাকল–ঘেউ ঘেউ।
–আরো একটু জোরে।
-–ঘেউ ঘেউ ঘেউউ।
সহসা কুকুরের ডাক শুনে ফিরিঙ্গীরা সব চুপ। শ্রীকান্ত আবার ডাকল–ঘেউ ঘেউ ঘেউ–
একজন জিজ্ঞাসা করল, ওরোকম ডাকছে কোনো সে? তার কি হোয়েছে?
মামা গম্ভীরভাবে বললেন, ও কিছু নয় সাহেব। দশ-বারো দিন হল ওকে একটা পাগলা কুকুরে কামড়িয়েছে। Bitten by a mad dog বুঝলে?
ফিরিঙ্গীরা যেন লাফিয়ে উঠল–অ্যাঁ? হাইড্রোফোবিয়া! একথা আগে বলল নাই কেন? ওটো কামড়াইটে পারে?
মামা বললেন–না না, কামড়াইবে না। সে ভয় নাই।
বলতে বলতে নৈহাটি এসে পড়ল। ফিরিঙ্গীরা আর এক মুহূর্তে বিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ হুড়মুড় করে সেই কামরা থেকে পিটটান দিল।
যাক, বাঁচা গেল বলে যেই মাত্র না স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন অমনি আরেকজন ফিরিঙ্গী যুবক এসে সেই কামরায় উঠল। সে কোনো উচ্চবাচ্য করে এককোণে গিয়ে বসল, মামাদের দিকে তাকালও না। মামা বললেন, দাঁড়াও। তোমাকেও ভাগাচ্ছি পরের স্টেশনে। শ্রীকান্ত, গাড়ি ছাড়লেই–বুঝেছিস?
যুবকটি ডিটেকটিভ নভেল বের করে পড়তে শুরু করে দিয়েছিল, হঠাৎ কুকুরের ডাক শুনে চমকে উঠে মামাক জিজ্ঞাসা করল, ব্যাপার কি? কি হয়েছে ওর?
সাহেবের মুখে পরিষ্কার বাংলা শুনে মামা বাংলাতেই জবাব দিলেও কিছু না, জলাতঙ্ক–যাকে তোমরা হাউড্রেফোলিয়া বল!
ছোকরা আবার বইয়ে মন দিল। তার নিশ্চিন্ত নির্বিকার ভাব দেখে মামার পিত্তি জ্বেলে গেল। তবু তিনি বললেন, তোমাকে সাবধান করা আমার কর্তব্য। কি জান, যদি কামড়ে দেয়, বলা তো যায় না। তখন তোমাকেও ঐ রোগে–
যুবকটি মৃদু হেসে বলল–আহা, না না! যে কুকুর ডাকে সে কি আর কামড়ায়?
অগত্যা মামা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন এবং শ্রীকান্তও ডাক ছেড়ে দিল। তাকে কুকুর বলাতে সে মনে মনে এমনই চটেছিল যে, তার ইচ্ছা করছিল এখুনি গিয়ে ফিরিঙ্গীটাকে কামড়ে দেয়।
কাঁচড়াপাড়ায় গাড়ি থামাতেই যুবকটি মুখ বাড়িরে বাইরে দেখছিল। তার পরিচিত বন্ধুদের দেখতে পেয়ে ডাকাডাকি শুরু করতেই সে পুরাতন দল এসে উপস্থিত। তারা তাকে ঐ কামরায় দেখে ভারী আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুমি নিরাপদে আছ তো? ওখানে যে মারাত্মক হাইড্রোফেবিয়া!
–সে আমি সারিয়ে দিয়েছি।
–সারিয়ে দিয়েছ কি রকম?
তখন মামার চাল যুবকটি বন্ধুদের কাছে ফাঁস করে দিল–সে কামরায় ঢুকেই ছেলেটিকে জল খেতে দেখেছিল, জলাতঙ্ক রোগে যা কখনো সম্ভব নয়। তখন শ্রীকান্তর ভারি রাগ হল তার মামার উপর, জলাতঙ্ক রোগে জল খেতে নেই একথা কেন তাকে তিনি আগে বলেননি। তাইতো তাকে এমন অপদস্থ হতে হল! কুকুর না হবার অপমান সইতে হল এমন!
এইবার ফিরিঙ্গরী আবার সে কামরায় জাঁকিয়ে বসল এবং স্পষ্ট ভাষায় মামাকে জানাল যে একবার তাঁকে নামতেই হবে এবং এর পরের স্টেশনেই।
অসহায়ভাবে মামী বললেন, ওগো, কি হবে তাহলে?
মামা বললেন–কিছু ভেব না গিন্নী ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্য।
ভগবানের নাম শুনে শ্রীকান্তর নিজেকে মনে পড়ল এবং ঘাড়ের ব্যথাটা এতক্ষণে কতটা মরেছে জানবার জন্য সে একবার ঘাড়টাকে খেলিয়ে নিল।
পরের স্টেশন আসতেই মামা বললেন, এখানে তো হয় না, পরের জংশনে না হয় বদলানো যাবে। এখানে তো মিনিট খানেক যাত্রী গাড়ি থামে এত মালপত্তর আমাদের!
-–না, টা হইবে না, এইখানেই টোমাকে নামটে হইবে।
তখন তারা সবাই মিলে মামার বাক্স, তেরঙ্গ, বিছানা, সুটকেস-এ হাত লাগাল।
–ডেখি, টুমি কেমন না নাম। এই বলে একজন বাসনের থলেটা নামিয়ে দিয়ে বলল–Here You are আর এই নাও টোমার জলে পিচার!
কুঁজোর জাত যাওয়ায় মীমাসা হায় হায় করতে লাগলেন। ততক্ষণে দুজন মিলে ধরাধরি করে ভারি ট্রাঙ্কটা নামিয়ে ফেলেছে। মামা তখন বাঙ্কের উপরে আরো ভারি হোন্ডঅলটা ওদের দেখিয়ে দিলেন। একজন গিয়ে সেটা নামাল মামা বললেন, বেঞ্জির তলায় ঐ তোরঙ্গটা–ওই যে!
একজন সেটা নামিয়ে বলল এই নাও, টোমার টুরঙ্গ।
মামা সংশোধন করে দিলেন–তুরঙ্গ নয় তোরঙ্গ। সর্বশেষে বুদ্ধিশেষে বুদ্ধিমান যুবকটি ছোট হাতব্যাগটা মামাকে এগিয়ে বলল, গুডবাই, মিষ্টার!
মামা এতক্ষণ পুলকিত হয়ে ওদের কার্য্যকলাপ পর্যনবেক্ষণ করেছিলেন। এই বাক্স বললেন, ইহাই মদনপুর–এইখানেই আমরা নামতাম। এতএব গুডবাই মিস্টারস এবং থ্যাঙ্কস!
হরগোবিন্দের যোগফল
কঞ্জিভেরম থেকে ঘুরে এসে আমাদের পাড়ার হরগোবিন্দ মজুমদার কেবল তাল ঠুকতে লাগলেন–বলং বলং যোগবলম। বলযোগ কিছু হবে না, যদি কিছু হয় তো যোগবলে।
