কুলী করলে তো নগদ লোকসান, এদিকে জিনিস ফেলে ভাঙলেও ক্ষতি, গাড়িরও সময় নেই কিন্তু ভাববার আর সময় কই? কাজেই বাধ্য হয়ে মামাকে দুটো কুলী রাখতে হল। আধঘণ্টা আগে বেরুলে এই অপব্যয়টা হত না। শ্রীকান্তই পাঁচ-ছবারে কম কম করে গাড়িতে মালগুলো তুলতে পারত। থাকগে, আর উপয় কি?
অতঃপর একটা দেখবার মতো দৃশ্য হল। দুটো কুলী আগে আগে, তাদের মাথায় দুটো বড় বড় তোরঙ্গ। একজনের বগলে বিছানার ল্যাগেজ, আরেক জনের বগলে বাসনের থলে। মামী নিয়েছেন জলের কুঁজো আর চেঁপি নিয়েছে পানের বাট। মামার এক হাতে একটা ছোট হাতব্যাগ, অন্য হাতে তালপাখা– তারই ভারে মামা কাতর; এতই ঘেমে উঠেছেন যে, ওরই ফাঁকে তালপাখার হাওয়া খেতে হচ্ছে তাকে।
সব শেষে বলেছে শ্রীকান্ত–একেবারে কুঁজো হয়ে। বাড়তি ট্রাঙ্কটা তারই ঘাড়ে চাপানো হয়েছে। শোভাযাত্রাটা দেখবার মতো।
গাড়িতে উঠেই মামা লম্বা বিছানা পেতে ফেললেন। এতক্ষণ গুরুতর পরিশ্রম গেছে, সেজন্য যথেষ্ট বিশ্রাম দরকার। চলতি গড়ির ফাঁকা হাওয়া গায়ে লাগতেই তিনি আরামে চক্ষু বুজে বললেন, আঃ, এতক্ষণে দেহটা জুড়োল। গোটা গাড়িটা ভর্তি, কিন্তু এ কামরাটা খুব খালি পাওয়া গেছে; কারু চোখে পড়েনি বোধ হয়।
বিচিত্র লটবহরে ওই ছোট কামরার প্রায় সমস্তটাই ভরে গেছল, তারই একধারে, বসে শ্রীকান্ত তার পীড়িত ঘাড়ে শুশ্রূষা করছিল। তার অবস্থাটা বুঝে মামী বললেন, বড্ড লেগেছে না কি রে?
অপ্রতিভ হয়ে শ্রীকান্ত ঘাড়ে হাত বুলানো বন্ধ করল–না, মামীমা।
মামা বললেন, ওয়েট লিফটিং একটা ভালো একসারসাইজ। এতে ওর ঘাড় শক্ত হবে। সেটা দরকার। এর পরে ওর বৌ-এর বোঝ রয়েছে না?
বৌ-এর না বইয়ের–কিসের বোঝা বললেন মামা, বোঝা গেল না সঠিক।
মামী বললেন, তোমার যেমন। যাচ্ছি তো কদিনের জন্য বিয়ের নেমন্তন্নে। এত মালপত্র নিয়ে বেরুনো কেন? কী কাজে লাগবে এসব?
মামা বললেন, যাকে রাখে সেই রাখে, কথাটা জান তো? সব জিনিসই কাজে লাগে, কাজের সময় তখন পাওয়া না গেলেই মুশকিল।
মামী বললেন, মদনপুরে গাড়ি তো দাঁড়ায় মোটে এক মিনিট। বোধ হয় এক মিনিটও দাঁড়ায় না। তার মধ্যে কি এই লটবহর নিয়ে নামা যাবে? দেখো, তখন কী ফ্যাসাদে পড়। বাক্স পেঁটরা সব গাড়িতেই থেকে যাবে দেখছি।
মামা বললেন, কি জানো গিন্নী, ভাগ্যবানের বোঝা ভগবান বয়। কিছু ভেব না তুমি।
মামার কথায় শ্রীকান্ত হৃৎকম্প হল, কেন না মদনপুর স্টেশন যেখানে এক মিনিট মাত্র গাড়ি থামে কিংবা তাও থামে না, সেখানে ভগবানের জায়গায় নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই সে কল্পনা করতে পারল না। এই বিরাট এবং বিচিত্র লাটবহর তাকেই গাড়ি থেকে নামাতে হবে। তাহলেই তো সে গেছে, ত তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না শ্রীকান্তর সারা শরীর রি রি করে কাঁটা দিয়ে উঠল।
দমদমে গাড়ি দাঁড়াতেই জনকতক কৃষ্ণকায় ফিরিঙ্গী যুবক এসে সেই কামরায় উঠল। মামার এবং মালপত্রের বহর দেখে তারা একে বারে হতভম্ব। অবশেষে, তাদের একজন ভাঙা বাংলায় মামাকে বলল, টোমরা ও গাড়িতে কেন বাবু? এটা সাহেবডের জন্যে–দরজায় নোটিস দেখ নাই For Europeasn only টোমাদের নামিটে হবে।
সবেমাত্র আয়েস করছেন, নামার কথায় মামার কথা গরম হয়ে উঠল। তিনি বললেন, কোনো নামটে হইব? আমরাও তোমাদের মটই খাঁটি ইউরোপীয়ান আছি। চাহিয়া ডেখ টোমাডের ও আমাড়ের গায়ের রঙ একপ্রকার।
–অল রাইট। ডেখি তোমরা নামিবে কি না? বলে তারা নেমে গেল এবং পরবর্তী স্টেশনে একজন রেল-কর্মচারীকে সঙ্গে নিয়ে এল।
কর্মচারীটিও এসে নামতে অনুরোধ করলেন।
মামা বললেন, সমস্ত গাড়ি ভর্তি, কেবল একটা খালি, কোথাও জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে আমরা এই কামরায় উঠেছি। অন্য কোথাও বা উঁচু ক্লাসে আমাদে জায়গা করে দিন, এখুনি আমরা নেমে যাচ্ছি।
আচ্ছা দেখছি জায়গা বলে কর্মচারীটি নেমে গেলেন, ফিরিঙ্গীরা গাড়িতে রইল! শ্রীকান্তর ভয় হল পাছে কর্মচারীটি অন্য কোথাও জায়গা খুঁজে পান তাহলে তো এখুনি তাকে ভগবানের অবতার হয়ে আবার লটবহর বওয়া-বওয়ি করতে হবে।
কিন্তু কর্মচারীটি আর ফিরলেন না, গাড়িও ছেড়ে দিল। কেবল ফিরিঙ্গীরা নিজেদের মধ্যে গজরাতে লাগল। মামা সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করলেন না। কিন্তু মামী বললেন, কাজ নেই বাপু, পরের স্টেশনে চল অন্য আকরায় যাই।
-হ্যাঁ, কোথায় খালি রয়েছে না কি?
–না থাকে, পরের গাড়িতে যাব না হয়।
–পাগল!
-–সবই তো পরের গাড়ি মামীমা, কোনটা আমাদের নিজেদের গাড়ি? বলল শ্রীকান্ত। আবার ওঠা-নামার ঝক্যি বওয়ার দায় এড়াতে বলতে হল তাকে!
–যদি পুলিসে ধরে নিয়ে যায়। সাহেবদের গাড়ি যে! মামীমা কন।
–হ্যাঁ, ধরলেই হল! তুমি চুপ করে থাক, ব্যাটারা বাংলা বোঝে তুমি ঘাবড়ে গেছ জানলে আরো লাফাবে।
অগত্যা মামী চুপ করলেন।
খানিক বাদেই ব্যারাকপুরে এল। গাড়ি দাঁড়াতেই ফিরিঙ্গীগুলো একজন সাহেব কর্মচারীকে ডেকে আনল। তিনি এসে বললেন, বাবু টোমাডের নামিটে হইবে–যাহাদের সাহেবি ড্রেস, এ কেবল টাহাদিগের জন্য!
মামা বললেন, তা একথা আগে বলনি সাহেব? আমাডোরো সাহেব পোশাক আছে। আমাদের সময় দাও, আমরা এখুনি সাহেব বনে যাচ্ছি। ওগো ট্রাঙ্কের চাবিটা দাও তো–
