বউদিদি বললেন, ‘কী আবার ব্যাপার! পাঁচুকে ছেড়ে, বুধুয়ার সঙ্গে ঘর করছে।’
শুনে আমি আরেকটু হলে পড়েই যাচ্ছিলাম! বুধুয়ার অন্যান্য গুণের ওপর, সে পাঁচুর আপন জ্যাঠামশাই! আর পাঁচু দেখতে কী ভাল! সে যাই হোক, বড়দিদিরা তো চলে গেলেন। একটু পরেই দেখি লখিয়া বাড়ির বাইরে ঘুর-ঘুর করছে। আমি বেরিয়ে আসতেই বলল, ‘বাসনগুলো মেজে দিয়ে যাই, কাকিমা?’
আমি বললাম, ‘বড়মা তোকে ঘরে ঢুকতে দিতে মানা করে গেছেন। এটা কী করলি লখিয়া? বুড়োর ষাট বছর বয়স, চিমড়ে চেহারা, ওই বদ্রাগী! আর পাঁচু কী সুন্দর, কী ঠান্ডা মেজাজ। তা ছাড়া বুড়ো তোর জ্যাঠশ্বশুর হয় না?’
লখিয়া বুক ফুলিয়ে, ঘাড় উঁচু করে, সোজা আমার মুখের দিকে চেয়ে বলল, ‘তা কী করব, উনার সঙ্গে ভালবাসা হয়ে গেল যে!’ যেন এ বিষয়ে আর কোনও কথাই হতে পারে না। তারপর দাপিয়ে চলে গেল। আর ওকে দেখিনি।
আমাদের এক পাতানো ছোটঠাকুমা ছিলেন, তাঁর বেলা ঠিক এর উলটো দেখলাম। ঠাকুমা দেখতে কী ভাল, কিন্তু ঠাকুরদা! হাজার গুণী হলেও বেঁটে মোটা, বেজায় পেটুক, নিজের বিষয়ে বড় বড় কথা বলতেন, খিটখিটে, খুঁতখুঁতে। কিন্তু সবাই বলত ওঁরা আদর্শ স্বামী-স্ত্রী। বিয়ের আগে পরস্পরকে একটিবার দেখেই সেই যে ভালবেসে ফেলেছিলেন, তারপর ৫২ বছরেও সেই ভালবাসায় এতটুকু ছেদ পড়েনি। গুণ দেখেই নাকি ঠাকুমা মুগ্ধ হয়েছিলেন, কন্দর্পকান্তি নিয়ে কি ধুয়ে খেতেন?
ওই তো ছোট শরিকদের রাঙা পিসেমশাইটি আছেন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নাকি তাঁর রূপ দেখে তাঁকে নাটকে পার্ট দিতেন। অথচ সারাজীবন রাঙাপিসিকে কি কম জ্বালিয়েছেন! ভালবাসা আলাদা জিনিস। টাকাকড়ি রূপ— এসব তুচ্ছ জিনিসের সঙ্গে তার সম্বন্ধ নেই।
একবার ছোটঠাকুমাকে চেপে ধরা হয়েছিল। পাকা আমটির মতো মানুষটি ফিকফিক করে হেসে বললেন, ‘সে এক ব্যাপার, ভাই! চিড়িয়াখানায় দেখা হল। আমি এনট্রান্স পাশ করেছি, উনি নতুন ডেপুটি হয়েছেন। সামনাসামনি বসিয়ে “খুকু একটা কবিতা বল তো” তো আর চলে না।
‘ওই যে বড় পুকুরে কালো হাঁস ভাসে, তারই পাশে আমরা চার বোন মা-মাসিদের সঙ্গে বসে গল্প করতে লাগলাম। আর ওনারা পাঁচ বন্ধু পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন, নিজেদের মধ্যে যেন কতই অন্যমনস্কভাবে কথা বলতে বলতে।
‘ওরই মধ্যে চারি চক্ষুর মিলন হল, সঙ্গে সঙ্গে পছন্দও হয়ে গেল। কপাল ঘেমে গেল। বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। আমি মা’র কাছে মত দিয়ে ফেললাম। এক মাসের মধ্যে বিয়েও হয়ে গেল। সেই ইস্তক পরম সুখে আছি। তবে কী জানিস—’ এই বলে ছোটঠাকুমা উঠে পড়লেন।
আমরা ছাড়ব কেন! ‘না, তোমাকে বলতেই হবে— তবে কী জানিস মানে কী?’
ছোটঠাকুমার ফরসা গাল লাল হয়ে উঠল, ‘সত্যি কথা বলতে কী জানিস, আমি আসলে ওঁকে চিনতে পারিনি। ওঁর বন্ধু জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সঙ্গে ছিলেন, তাঁকেই পছন্দ করে ফেলেছিলাম। তা এই বা মন্দ কি? ৫২ বছর কেমন সুখে— খুব একটা শান্তিতে না হলেও— কাটিয়ে তো দিলাম। এর বেশি কী আশা করতে পারতাম?’
ওই যে গোড়ায় বলেছিলাম ভালবাসার কথা আর বলবেন না।
ভ্-ভূত
আমাদের পাড়ায় একটা পুরনো বাড়ি আছে, তার বয়স হয়তো দুশো বছরের বেশি হবে। সেখানে কেউ থাকতে চায় না। তাই বলে যেন কেউ ভেবে না বসেন যে বাড়িটা খালি পড়ে থাকে। মোটেই তা নয়। তবে রাতে কেউ সামনের বারান্দাটাতে যায় না। সবাই বলে সেখানে নাকি লম্বা কালো কোট পরা এক রোগা সায়েব পায়চারি করে। তার সমস্ত শরীরটা স্পষ্ট দেখা যায়, বাদে পায়ের পাতা দুটো। পায়ের কব্জি দুটো মেঝের ওপর বসানো থাকে, তাই দিয়েই সে পায়চারি করে। বিকট দেখায়। কিন্তু সে কাউকে কিছু বলে না। তবু কিছুদিন ওইরকম দেখার পর, ভাড়াটেরা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। আবার নতুন ভাড়াটে আসে।
আমাদের পাড়ার এক ফিরিঙ্গি বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম যে ওর ঠাকুরদা অনেক দিন ওই বাড়ির ভাড়াটে ছিলেন। ঠাকুরদার ছোটবেলাতেও রোগা সায়েব ওই বারান্দায় পায়চারি করত। কিন্তু তখন তার জুতোটুতো সব দেখা যেত। তারপর দেখা গেল বেশি বৃষ্টি হলেই রাস্তায় জল দাঁড়ায়। সেই জল ক্রমে বারান্দার ওপর উঠতে আরম্ভ করল। অগত্যা এক প্রস্থ ইট বসিয়ে বারান্দাটাকে উঁচু করা হল। রোগা সায়েব বোধহয় অতটা টের পায়নি, তাই অভ্যাসমতো পুরনো মেঝেটার ওপরেই হাঁটে। কাজেই জুতো দেখা যায় না।
কলকাতার পথেঘাটে ট্রামে-বাসে যে এত অসম্ভব বেশি লোক, তাদের সক্কলেই সত্যিকার মানুষ কি না এ বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। ট্রামে-বাসে যেখানে ধরে ঝুলবার মতোও এক ইঞ্চি জায়গা নেই, সেখানেও কী করে অনেকে লটকে থাকতে পারে, এ আমার বোঝার বাইরে। শুনেছি একবার নাকি এক পণ্ডিতমশাই অনেক কষ্টে ছাতার বাঁটটি বাসের জানলার শিকে আটকিয়ে কোনও রকমে ঝুলে আছেন, এমন সময় টের পেলেন কে যেন তাঁর মেরজাইয়ের পকেট হাতড়াচ্ছে!
ফিরে দেখেন কালো কুচকুচে, রোগা টিং-টিঙে এক ছোকরা, কিছু না ধরে শূন্যে ঝুলে আছে। পণ্ডিতমশাই এমনি আঁতকে উঠলেন যে ছাতার বাঁট থেকে হাত ফসকে, আরেকটু হলেই বিতিকিচ্ছিরি এক কাণ্ড করে বসতেন, কিন্তু শূন্যে-ঝোলা ছোকরা খপ্ করে তাঁর হাত ধরে, আবার ছাতার বাঁটে লটকে দিল।
