আরেকবার যেই না জনাই রোডে গাড়ি থেমেছে, একজন যাত্রী বললেন, ‘আবার রোড কেন? জনাই নামই তো বেশ ছিল।’ আরেকজন বললেন, ‘তিন মাইল দূরে জনাই গ্রাম আছে কিনা, তার সঙ্গে তফাত করবার জন্য স্টেশনের নাম জনাই রোড।’
তৃতীয় যাত্রী বললেন, ‘মোটেই তিন মাইল নয়। বড় জোর দেড় মাইল।’ আগের বক্তা বিরক্ত হলেন, ‘বলছি মশাই পাক্কা তিন মাইল।’ পরের বক্তাও তেরিয়া হয়ে উঠলেন, ‘আজ্ঞে না মশাই, যা-তা বললে তো আর হবে না। দেড় মাইলের এক পা-ও বেশি নয়।’
কামরায় বেশ একটা গরম হাওয়া জমে উঠল। কোনও পক্ষেরই পৃষ্ঠপোষকের অভাব হল না। শেষ পর্যন্ত প্রথম ভদ্রলোক বললেন, ‘কী মুশকিল, এতে এত তপ্ত হবার কী আছে? আচ্ছা দেখাই যাক না, কার কথা ঠিক। আপনিই আগে বলুন অত নিশ্চয়তার সঙ্গে কী করে বলছেন দেড় মাইল?’
সে বলল, ‘আমি জানব না তো কে জানবে বলুন? একরকম বলতে গেলে আমি এখানকার একজন ইনহ্যাবিট্যান্ট। আজকাল কলকাতায় থাকলেও এইখানেই আমার বাড়ি। ওই পথের প্রত্যেকটা ইট-পাটকেল ঝোপ-ঝাড় নেড়িকুত্তো আমার চেনা।’
তখন অন্য লোকটিকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘তা হলে আপনিই বা তিন মাইল বলছেন কেন?’ ভদ্রলোক কাষ্ঠ হাসলেন, ‘বলছি কী সাধে! ওই তিন মাইলের প্রত্যেকটা ইঞ্চি ট্যাঙস্ ট্যাঙস্ করে হেঁটেছি বলে বলছি। দু’বছর আগে আমরা ফুটবল ম্যাচ খেলতে এলাম। ওঁরা স্টেশন থেকে গলায় ফুলের মালা পরিয়ে ট্রাকে চড়িয়ে খেলার মাঠে নিয়ে গেলেন। কী আর বলব মশাই, হেরে ভূত হয়ে গেলাম! আর এনারা করলেন কী, আমাদের খেলার মাঠে ফেলে, ট্রাকটি নিয়ে বিকট জয়ধ্বনি দিতে দিতে শোভাযাত্রায় বেরুলেন। অগত্যা হেঁটে স্টেশনে আসা ছাড়া গত্যন্তর রইল না। হুঁঃ!’
মধ্যস্থ তখন বললেন, ‘তা হলে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে দূরত্বটা দুই মাইল।’
ভালবাসা
বড় হয়ে গেলাম কিন্তু ভালবাসার মাথামুন্ডু আজ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারলাম না। আমাদের সেকেলে গিন্নিরা শুনেছি স্বামী ছাড়া কিছু জানেন না। এটা যে খুব প্রশংসনীয় কাজ তাতে কোনও সন্দেহ নেই, বিশেষ করে যা মেজাজ একেকটা স্বামীর আর যা চেহারা! এখনকার চেহারা বিয়ের সময়ে কল্পনা করতে পারলে দেখা যেত কে কাকে কতখানি ভালবাসে৷ হ্যাঁঃ।
তবে ওই যা বলছিলাম, বিয়ে দিয়েই যদি ভালবাসার বিচার করতে হয়, বিশেষত যেসব ক্ষেত্রে নিজেরা পছন্দ করে বিয়ে করেছে, তবে বলিহারি, বাপু! প্রথম কথা হল গোড়াতেই যে কী দেখে কে কাকে ভালবেসে ফেলে, তাই বোঝা দায়।
বছর চল্লিশ আগে আর জি কর হাসপাতালে আমার গলব্লাডার অপারেশন হয়েছিল। আমার জন্যে রসময়ী বলে একজন দাইকে রাখা হয়েছিল। কাজকর্মে অতিশয় পটু আর তার চেয়েও বড় কথা, উদয়াস্ত নানা রসের কথা বলে আমাকে খুশি রাখত।
দেখতে ভাল না। মোটা, বেঁটে, কালো, থ্যাবড়া নাক, পুরু ঠোঁট। কিন্তু সবটার ওপরে এমন একটা সস্নেহ অমায়িক ভাব যে আমার তাকে বড্ড ভাল লাগত। ও সধবা কি বিধবা ঠাওর হত না। পরনে সরু পাড় ধুতি, খালি হাত, গলায় সোনার বিছে হার, কানে সোনার মাকড়ি।
সেকালের পক্ষে ভাল রোজগার ছিল। মাসে শদুই তো হবেই। বলেছিল ভাইপোর বাড়িতে পয়সা দিয়ে থাকে। বউ খুব যত্ন করে। রাতে পায়ে তেল মালিশ করে দেয়। দেবে না-ই বা কেন? পিসি মলে ওরাই সব পাবে। চটালে শেষটা কী হতে কী হয়ে যাবে কে জানে!
এক দিন রসময়ীকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার স্বামী নেই?’ রসময়ী আকাশ থেকে পড়ল। ‘নেই মানে? আছেই তো! খুব বেশি করেই আছে। আমাকে পছন্দ হয়নি বলে আরেকটা বে করে, নারকেলডাঙার ওদিকে খোলার ঘর তুলে রয়েছে।
‘পাশে একটা দোতলা বাড়ি। সেখানে আমার সই গেছল। অনেক দিন থেকে সেই মেয়েমানুষটাকে দেখার বড় শখ ছিল। কত বড় সুন্দরী সে! কী বলব দিদি, দেখে আমি হাঁ হয়ে গেনু! এ কী তাজ্জব ব্যাপার! এই লম্বা হটকা শিড়িঙে চেহারা, কুচকুচে কালো, উটকপালী, উঁচু দাঁত, মাথার সামনে টাক! বলিহারি পুরুষ-মানুষের পছন্দ। ওকে নিয়ে সুখে থাক। আমার কোনও আপত্তি নেই!’
এই বলে আমার চায়ের পেয়ালা তুলে নিয়ে, দুম দুম করে রসময়ী চলে গেল।
মাঝে মাঝে মধুপুরে গিয়ে আমার ভাসুরদের বাড়িতে কিছুদিন কাটিয়ে আসতাম। পুজো থেকে দোল পর্যন্ত বড় চমৎকার সময় সেখানে। ওঁরা ছুটি কাটাতে যেতেন, অন্য সময় বাড়ি খালিই পড়ে থাকত; মালিরা দেখাশুনো করত।
আমার বড়-জা কেবলই বলতেন, ‘মালিদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিস। ছোটনা, বুধুয়া, পাঁচু— এরা লোক ভাল, কিন্তু বেজায় কুঁড়ে। তবে ওদের বউরা ভাল। বিশেষ করে পাঁচুর বউ লখিয়া।’
বাস্তবিকই তাই। সে যে না বলতেই আমার কত কাজ করে দিয়ে যেত, তার ঠিক নেই। আমারও বয়স তখন কম ছিল, গিন্নিপনায় আনাড়ি ছিলাম। লখিয়া আমার সমবয়সি বন্ধুর মতো ছিল। সারি সারি গুদোমঘরে দু’-তিন বাড়ির মালিরা পরিবার নিয়ে থাকত। বুধুয়া ছিল সবার বুড়ো। বয়স ষাটের কাছাকাছি, চুল পাকা, শরীরটাও পাকানো দড়ির মতো।
একবার আমি গিয়ে পৌঁছতেই, বড়দিদি বললেন, ‘আমরা কাল চলে যাচ্ছি, তুই খুব সাবধানে থাকিস। আর ওই বদ মেয়েমানুষ লখিয়াটাকে ঘরে ঢুকতে দিবি না।’ আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। ‘কেন, বড়দি?’
বড়দিদি হাঁড়িমুখে বললেন, ‘সে তোর শুনে কাজ নেই।’ ‘বলুন না কী ব্যাপার।’
