পণ্ডিতমশাই বললেন, ‘মন তোমার এত ভাল, তবু লোকের পকেট হাতড়াও কেন?’ ছেলেটা ফিক করে হেসে বলল, ‘কী করব, অব্বেস!’ এই বলে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
আরেক ভদ্রলোক, ঝমঝম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সন্ধেবেলায় বড়বাজারের এক গলি দিয়ে চলেছেন। হঠাৎ খেয়াল হল, তাঁর সামনে একটা লোক একপাল ছাগল ভেড়া নিয়ে যাচ্ছে। সবাই ভিজে চুপ্পড়, এমন সময় একটা পড়ো বাড়ি দেখা গেল। ভদ্রলোক শুনেছিলেন যে এই রকম বাড়িই বর্ষাকালে লোকের ঘাড়ে ভেঙে পড়ে, তাই একটু ঘাবড়াচ্ছিলেন।
তারপর যখন দেখলেন সেই লোকটা ছাগল-ভেড়াসুদ্ধু দিব্যি সুন্দর পড়ো বাড়ির দাওয়ায় উঠে পড়ল, উনিও সঙ্গে সঙ্গে উঠলেন। উঠে, গা থেকে জল ঝেড়ে, একটা বিড়ি ধরালেন। তাই দেখে লোকটির চোখ চকচক করে ওঠাতে, তাকেও একটা বিড়ি দিলেন। দুজনে একটুক্ষণ আরামে বিড়ি টানবার পর, ভদ্রলোক বললেন, ‘এ জায়গাটা নাকি ভাল নয়।’
লোকটি বলল, ‘ভাল তো নয়ই। এ পাড়ার কেউ এখানে পা দেয় না। বৃষ্টির জলে ভেসে গেলেও না। ভারী বদনাম এ বাড়ির।’
ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি ভূতটুতে বিশ্বাস করি না।’ লোকটির বিড়ি খাওয়া হয়ে গেছিল, মাথাটুকু ফেলে দিয়ে বলল, ‘তা আপনি না করতে পারেন, কিন্তু আমি করি।’ এই বলে ছাগল-ভেড়ার পালসুদ্ধু অদৃশ্য হয়ে গেল! ভদ্রলোকও জল-ঝড়ে বেরিয়ে পড়ে ছুটতে লাগলেন।
ভবানীপুরে একটা পুরনো বাড়ি ছিল, ভাগে ভাগে ভাড়া দেওয়া। বাড়ির গিন্নির ছেলেপুলে ছিল না; স্বামীর সঙ্গে অষ্টপ্রহর খিটিমিটি লেগেই থাকত। ঝগড়া হলেই স্বামী দুমদাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন আর সে রাতে ফিরতেন না। ভয়ে ভাবনায় গিন্নির প্রাণ যায় আর কী! তখন তিনি তিনতলার রান্নাঘরের পাশে এক টুকরো খোলা ছাদে গিয়ে কান্নাকাটি করতেন, দেবতাকে ডাকতেন।
হঠাৎ দেখতেন পাশের ভাড়াটেদের ছোট্ট ছাদে তিন-চারটে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দুপুর রাতে মহা হুল্লোড় লাগিয়েছে। সঙ্গে আবার কতকগুলো কুকুর-বেড়াল। দেখে দেখে তাঁর মন ভাল হয়ে যেত। ছেলেমেয়েগুলো টপাটপ মধ্যিখানের পাঁচিল টপকে এদিকে এসে, তাঁর কোলে-পিঠে চাপত আর হিন্দিতে ইংরেজিতে মিশিয়ে কী যে না বলত, তার ঠিক নেই। কোথায় নাকি চমৎকার ফল-বাগান আছে, ঝরনা আছে, আন্টিকে সেখানে নিয়ে যাবে। ছিঃ! আর কেঁদো না, ডিয়ারি।
তারপর ওঁর স্বামী বদলি হয়ে গেলেন, ওঁরাও ও-বাড়ি ছেড়ে পশ্চিমে চলে গেলেন। তারপর প্রায় কুড়ি-বাইশ বছর কেটে গেল। ততদিনে স্বামীর মাথা ঠান্ডা হয়ে গেছে, গিন্নিও অনেক বেশি সুখী। একটি অনাথ মেয়েকে মানুষ করে, বিয়ে দিয়েছেন। কলকাতায় এসে হঠাৎ মনে হল, সেই বাড়িটা একবার দেখে আসি। গিয়ে দেখেন ঘর-দোর আরও জীর্ণ, রং-ওঠা। মনে হয় এই বাইশ বছরে কোথাও এক পোঁছ পালিশ পড়েনি।
গেলেন ওঁদের সেই তিনতলার পুরনো ফ্ল্যাটে। এখন সেখানে এক বুড়ি থাকেন। তিনি বললেন, ‘তাঁর স্বামী বছর দশেক গত হয়েছেন, ছেলে-বউ বোম্বাইতে চলে গেছে, বড়ই একা পড়েছেন। তবে পাশের বাড়ির এক গাদা ছেলেমেয়ে, কুকুর-বেড়াল রাতে ভারী মজা করে।’
এবার গিন্নি আর কৌতূহল রাখতে না পেরে, একটা টুল টেনে নিয়ে পাশের ছোট ছাদটিতে গিয়ে নামলেন। তারপর উলটো দিকের পাঁচিলের ওপর দিয়ে ঝুঁকে দেখবার চেষ্টা করলেন, ছেলেমেয়েগুলো কোত্থেকে আসে। দেখলেন পাঁচিলের ওপাশে খাড়া দেয়াল নেমে গেছে। ওদিকে কোনও ঘরের চিহ্ন নেই, জায়গাও নেই। পাশ দিয়ে একটা গলি চলে গেছে।
মাছ-ধরা
ভ্রমণের কথা বলতে গেলে, আমার দৌড় হল কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন, আবার শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা। একটা গাড়ি ছিল, সেটা বোলপুর ছাড়ত বেলা চারটের পর আর হাওড়া পৌঁছত রাত সাড়ে আটটা। ঘণ্টাচারেকের ওয়াস্তা। ‘ছাড়ত’ বলছি, কারণ এখন আর ওগাড়িতে যাতায়াত করি না। তবে একথা বলতে বাধা নেই যাত্রাটি ছিল বড়ই রোমাঞ্চকর।
প্রথম কথা গাড়িটির এক ঘণ্টা আগে-পরে আসা কিছুই বিচিত্র ছিল না। এ-লাইনে কুড়ি মিনিট লেটকেও আমরা অন-টাইম বলি। রোমাঞ্চ অন্য কারণে। গাড়ির বাতিগুলো ছিল কেমন যেন। ট্রেন ছাড়লেই জ্বলে উঠত; যতই বেগ বাড়ত ততই জোরালো হয়ে উঠত, কিন্তু কোনও স্টেশনে এসে ঢুকলে, কমতে কমতে শেষটা নিবেই যেত। কে নামল, কে উঠল কিছুই মালুম দিত না। হঠাৎ অন্ধকার কথা কয়ে উঠত।
একবার ওই গাড়িতে কলকাতা ফিরছি আমরা জনাতিনেক। আলোও ওইরকম বাড়তে বাড়তে কমতে কমতে, শেষটা এক্কেবারে নিবে গেল। কর্ড লাইন দিয়ে চলেছি। এটুকু টের পাচ্ছিলাম। অন্ধকারে একদল লোক লটবহর নিয়ে গাড়িতে উঠল, এটুকু টের পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে মৃদু একটা গন্ধে কামরা ভরে গেল আর আমার জ্যাঠামশাইদের। জন্য বড়ই মনকেমন করতে লাগল। কোন কালে তাঁরা স্বর্গে গেছেন, এখন হঠাৎ কেন তাঁদের জন্য মনকেমন করবে? ট্রেনের বেগটা একটু বাড়তেই আলোও জ্বলে উঠল, আমিও মনকেমনের কারণ বুঝলাম।
যাঁরা উঠেছিলেন তাঁদের কাপড়চোপড় আলুথালু, অপরিষ্কার, নাকমুখ রোদেপোড়া কালো ভূত। কিন্তু চোখে সুগভীর তৃপ্তি। সঙ্গের লটবহর হল লম্বা লম্বা বাঁশের ছিপ, গোল গোল বেতের চুপড়ি, তাতে কালো কালো কিছু কিলবিল করছে আর একটা ময়লা ন্যাকড়া-বাঁধা কাঠের বাক্স, তার ভেতর থেকে ভুরভুর করছে মশলার গন্ধ। প্রাণটা আঁকুপাঁকু করে উঠল। এ যে আমার বড় চেনা গন্ধ, খুব একটা সুগন্ধ হয়তো নয়, কিন্তু নাকে যেতেই হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে উঠল। সোজা ভাষায় এটি মাছ-ধরার চারের গন্ধ।
