সে যাই হোক, সারাদিন চুপচাপ পড়ে থাকত, সন্ধে হলেই একবার শরীরটাকে টেনে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এক পাক ঘুরে আসত। ফিরে এসে আমাদের ফ্ল্যাটের পেছনের দরজার তলার দিকে, ইঁদুররা একসময় যে ফুটো করেছিল, তার মধ্যে দিয়ে থাবা ঢুকিয়ে দরজায় আঁচড়াত আর ম্যাও-ম্যাও করে ডাকত। অমনি কেউ না কেউ ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিত। দেখা যেত নতুন নতুন আঁচড়-কামড়! আমাদের সে কী দুঃখ!
আগে যারা ওর ভয়ে আমাদের বাড়ির ধারেকাছে ঘেঁষত না, আজকাল তারা কার্নিশে— পাঁচিলে বসে মজা দেখে। আমরা ঠেঙা নিয়ে তাদের তাড়াতাম। তারাই বোধহয় নেপোকে নীচে একা পেয়ে তার শোধ তুলছে! নেপোকে কোলে নিয়ে, রক্ত ধুয়ে আর্নিকা লাগানো হত।
তারপর একদিন বিকেলে আমি গাড়ি করে বেরোচ্ছি, দেখি একতলার পাঁচিলের ওপর দিয়ে, একটার পেছনে একটা, দশটা হুলো বেড়াল আকাশের দিকে ল্যাজ খাড়া করে চলেছে। তাদের সবার আগে নেপো!! রামভূজের যত ভাবনা, ‘দেখলেন, মা? বেচারি চোখে দেখে না, কানে শোনে না, হাঁটতে পারে না! এখুনি কী বিপদে পড়বে। ওকে বরং বাড়িতে রেখে আসি।’
এই বলে রামভূজ হাত বাড়িয়ে নেপোর ঠ্যাং ধরে এক টান দিল। খান কুড়ি বাঁকা নখ বের করে, নেপো বলল, ‘ফ্যাঁচ্!’ এই বলে এক লাফে ১০নং ফ্ল্যাটের মেমের রান্নাঘরের জানলা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। ওর পেছন পেছন বাকি ন-টাও ঢুকল। দুমদাম ঝনঝন শব্দ, চিৎকার, দৌড়োদৗড়ি।
রামভূজ বলল, ‘আমরা বরং রওনা দিই।’
বোলপুরের রেল
ট্রেনে চাপলেই আমার মেজাজ অন্যরকম হয়ে যায়। অবিশ্যি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমার রেলের দৌড়ও কমতে কমতে এখন কলকাতা থেকে বোলপুর আর বোলপুর থেকে কলকাতায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাই বলে রেলযাত্রার রোমাঞ্চ একটুও কমেনি। হাওড়া থেকে বোলপুরের দূরত্ব ৯৫ মাইল হলেও, মনে হয় এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে গেলাম। কালো এঁটেল মাটির বদলে দেখা যায়, লাল ঝরা মাটি। লতাগুল্মের ঝাড়ের বদলে ভাঙা ডাঙার ওপর দেখা যায় বেঁটে বেঁটে খেজুর গাছ। রেলগাড়িও বাঁধের ওপর না চলে, কাটিং-এর মধ্যে নামে। সহযাত্রীদের ধরনটাও দেখি অন্যরকম। কালো, লম্বা, কোঁকড়া চুল, সাজের ঘটা কম, কিন্তু চালাক-চালাক মুখ, বন্ধুসুলভ হাবভাব।
এই দুই সীমানার মধ্যিখানে ৮০-৯০ মাইল পথের বিচিত্র ব্যাপার। একবার বর্ধমানে গাড়ি ছাড়ব-ছাড়ব করছে, এমন সময় একসঙ্গে অনেকগুলি যাত্রী উঠলেন। একজন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা আধা-বয়সি ভদ্রলোক, দুঃখী-দুঃখী মুখের একজন ৪০-৫০ বছরের মহিলা, তাঁর সঙ্গে একটি বছর তিনেকের খুকি আর কটকটে হলুদ হাওয়াই শার্ট গায়ে এক লম্বা-চুলো ছোকরা। জায়গা-টায়গা খুব বেশি ছিল না। আর আমাদের পাশেই দাঁড়াল। ভদ্রমহিলাকে একটু বসবার জায়গা করে দেওয়া হল। খুকিও বসল।
দুঃখী-দুঃখী মুখের ভদ্রমহিলা হলদে-শার্ট ছোকরার সামনে একটা বড় সাইজের হ্যান্ডব্যাগ খুলে ধরলেন। হ্যান্ডব্যাগে পাঁচ টাকা দশ টাকার নোট যেমন তেমন করে ঠাসা। ব্যাগের পেট ফুলো হয়ে আছে। ছোকরা তার ভেতর থেকে গোটা তিনেক দশ টাকার আর গোটাতিনেক পাঁচ টাকার নোট তুলে নিয়ে বলল, ‘তা হলে এগুলোও নেব?’ এই বলেই পিছোতে পিছোতে শেষটা কামরা থেকে নেমেই গেল!
সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রমহিলা খোলা অবস্থাতেই হ্যান্ডব্যাগটাকে টাকাকড়িসুদ্ধ আমাদের সামনের বেঞ্চিতে ফেলে, ‘কোথায় গেল? কোথায় গেল?’ বলে আর্তনাদ করতে করতে উঠি-পড়ি দরজার দিকে ছুটলেন। খুকিও এই বড় হাঁ করে তারস্বরে কান্না জুড়ে দিল।
আমরা শশব্যস্ত হয়ে উঠলাম। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ও কে? আপনার ছেলে নাকি?’ বাধা পেয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘না না, আমার ছেলে হতে যাবে কেন? এর আগে কখনও চোখেও দেখিনি। প্ল্যাটফর্মে দেখা হল, বলল আমার ভাইকে চেনে। আমেদপুরে দুজনেই এক আপিসে চাকরি করে। সেখানে নাকি নোট ভাঙানো যায় না। তাই আমার নোটগুলো ভাঙিয়ে দেবে বলে কিনা নোট নিয়ে গাড়ি থেকেই নেমে গেল!’
ভদ্রলোক বললেন, ‘নিয়ে গেল আবার কী! আপনিই তো একরকম গুছিয়ে দিলেন। বসুন। দেখি কী করতে পারি।’ বলে তিনিও নেমে গেলেন।
আমরা ভদ্রমহিলাকে টেনে বসিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ও টাকার আশা ছাড়ুন। আপনার বাকি টাকাগুলোও আমেদপুর অবধি পৌঁছবে কি না সন্দেহ। এতক্ষণ যে ভাবে ব্যাগটা খুলে ফেলে রেখে দিয়েছেন, আমরা যে-কেউ একগোছা তুলে নিতে পারতাম!’
তিনি আঁতকে উঠে ব্যাগ বন্ধ করলেন। খুকি ‘খিদে পেছে’ বলে চ্যাঁচাতে লাগল। গাড়ি ছেড়ে দিল।
এমন সময় চলন্ত গাড়িতে খচমচ করে সেই ভদ্রলোক উঠে পড়ে, ভদ্রমহিলাকে তিনটে দশ টাকার তিনটে পাঁচ টাকার নোট দিয়ে বললেন, ‘নিন, ধরুন। কখনও কোথাও কোনও অচেনা লোককে বিশ্বাস করবেন না। এমনকী আমাকেও না।’
ভদ্রমহিলা তো অবাক, ‘ওমা! অচেনা কোথায়? বলল যে ভাইকে চেনে! নিজের থেকে আলাপ করল। পান কিনে দিল।’
আমরা আর থাকতে না পেরে ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কিন্তু তাকে ধরলেন কী করে?’
তিনি হাসলেন, ‘তাও পারব না? ওই তো আমার কাজ। ২৫ বছর ওয়াচ অ্যান্ড ওয়ার্ডে আছি না! বেরুবার ফটকে ক্যাঁক করে ধরেছি বাছাধনকে! অমনি নোটগুলো ছুড়ে ফেলে দিয়ে পগার পার! রেলওয়ে পুলিশকে জিম্মা করে দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হলে এত কষ্টে পাওয়া ছুটিটা মাঠে মারা যেত। আর দেখলেন তো কী ইনকম্পিটেন্ট! ছিনতাই করবি তো হলুদ শার্ট কেন? ভিড়ের সঙ্গে মিশে থাকতে হয় তাও জানিস না আবার চুরি করতে আসিস!’
