এই বলে বিশ্রী করে হাসতে হাসতে একটা বিশেষ দোকান থেকে সদ্য প্রকাশিত একটা বিশেষ বইয়ের যতগুলো কপি পেল রাস্তার মাঝখানে জড়ো করে, পা দিয়ে চেপে খানিকটা হাত দিয়ে ছিঁড়ে—অন্য হাতে সমানে নারকোল তুলে ধরা বলে সেটা কাজে লাগানো যাচ্ছিল না—কেরোসিন ঢেলে—হ্যাঁ, তখন পাওয়া যেত—অগ্নিসংযোগ করে, আধ ঘণ্টার মধ্যে কাজ সেরে, যেমন নারকোল হাতে এসেছিল, তেমনি নারকোল হাতে অদৃশ্য হয়ে গেল।
প্রতি বছরের মতো সেবারও আমি ওখানে নববর্ষ করতে গেছিলাম। সারা বছরে ওইটি আমার একটি প্রিয় অনুষ্ঠান। প্রথমে আনন্দ পাবলিশার্সে ডাবের জল আর বিনা-চিনির সন্দেশ। সেখান থেকে মিত্র ঘোষে দেখি মালিকদের প্রায় সবাই শুধু যে অদর্শন তা নয়, অন্য যাঁরা আছেন তাঁদেরও এমন একটা উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি, উসকো-খুসকো চুল আর পাঞ্জাবির হাত গুটোনো, যা অতিথিবৎসল গৃহস্বামীর মধ্যে একেবারেই শোভা পায় না।
অথচ আতিথ্যের ত্রুটি ছিল না। ক্ষীরের ছাঁচ খেল সবাই। রহস্যটি ক্রমে প্রকাশ পেল, যখন একটু গরম চেহারা নিয়ে কয়েকজন গুরুস্থানীয় ফিরে এলেন। শোনা গেল যে মোটা রিবেট দিয়ে একখানা বই ওই একদিনের জন্য বিক্রি হবে। বইটিকে ধর্মবিষয়কও বলা চলে। তা দুপুরের মধ্যে ৫ হাজার কপির গোটা সংস্করণ শেষ। কিন্তু গলিতে তখনও হাজার দুই লোক। তারা আবার বইয়ের আন্দোলন করছে। আমার আবার ওই গলিতেই তিন জায়গায় নেমন্তন্ন। তা ছাড়া যথেষ্ট কৌতূহলও ছিল।
ওঁদের বারণ না শুনে গলিতে ঢুকে আমি থ! একটা নলের মধ্যে যদি তিন-চারটে দড়ি লম্বালম্বিভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, গলির প্রায় সেই অবস্থা। কিন্তু সেরকম চ্যাঁচামেচি শুনলাম না। কারণ মালিকরা ছাপ দেওয়া স্লিপ বিলি করতে শুরু করেছিলেন। সেই স্লিপ দেখালে সকলে নতুন মুদ্রণের বই পেয়ে যাবেন। মিত্র ঘোষের বইয়ের দোকানের গ্রিল মনে হল গায়ের জোরে বন্ধ করা হয়েছিল। তবে ততক্ষণে পরিস্থিতিটা থিতিয়ে পড়েছিল।
আমি বলতেই আন্দোলনকারীরা পথ ছেড়ে দিলেন। গন্তব্য স্থানে গিয়ে দেখি দরজা ভেতর থেকে এঁটে বন্ধ। ততক্ষণে ভিড়ের মেজাজ ভাল হয়ে গেছিল। তাঁরা মহা উৎসাহে আমাকে সাহস দিতে লাগলেন, ‘হাঁক পাড়ুন, দরজা পেটান। আমাদের ভয়ে সবাই ভেতরে বসে আছে। ধাক্কাধাক্কি করুন।’ বলে সবাই হাসতে লাগল।
বাস্তবিক দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। ভেতরে ঢুকে বললাম, ‘ছি! ছি! ভিতু! কাপুরুষ! সিংহের সে তেজ কই?’ বন্ধুরা বললেন, ‘তা বলতে পারেন। কিন্তু যদি ইয়ে করে দিত!’ বলেই একটা লিমকো আর এক বাক্স সন্দেশ উপস্থিত করলেন।
পরে বাইরে বেরিয়ে দেখি চারদিক ফাঁকা, শান্তিপূর্ণ, নববর্ষের মধুর গুঞ্জনে মুখর। আন্দোলনকারীরা কেউ কেউ পান কিনছেন। এমন রোমাঞ্চ আর কোথায় পাব?
বাঘ ও বিজয়মেসো
ইলা পালচৌধুরী ছিলেন রাজ্যসভার সদস্যা। তাঁর বাবা বিজয়চন্দ্র বসু ছিলেন আলিপুরের চিড়িয়াখানার অধ্যক্ষ। চিড়িয়াখানার বড় ফটক দিয়ে একটু দূরে এগোলেই বাঁ হাতে তাঁর সুন্দর কোয়ার্টার চোখে পড়ত। শৈশবে আমি সেই বাড়িতে কত সকাল বিকেল বড় আনন্দে কাটিয়েছি।
বিজয় বসুর শ্যালা ছিলেন আমার বড় মেসোমশাই। তবে শুধু সেই সুবাদেই ওঁদের সঙ্গে আত্মীয়তা নয়। সেকালের ব্রাহ্ম পরিবারগুলোকে তাঁদের হিন্দু আত্মীয়স্বজনরা খানিকটা অপ্রীতির চোখে দেখতেন বলে ব্রাহ্মদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতাটা ছিল বেশি। বিজয় বসুর স্ত্রীকে আমরা ইন্দুমাসিমা বলতাম। আমার জ্যাঠামশাই উপেন্দ্রকিশোরের বাড়িতে আমার জন্মের আগে থেকেই তাঁদের যাওয়া-আসা ছিল। যতদূর জানি ইন্দুমাসিমা বিয়ের আগে ব্রাহ্মবালিকা শিক্ষালয়ে পড়াতেন। আমার মা তখন ওখানকার ছাত্রী ছিলেন।
সে যাই হোক, আমাদের কাছে বড়-মাসিতে আর ইন্দু-মাসিতে বিশেষ তফাত ছিল না। বরং আমাদের কাছে ইন্দুমাসির বাড়িটাই বেশি আকর্ষণীয় ছিল। ঘাস-জমির পাশে, ফুলবাগানের কিনারায় আঁকাবাঁকা পুকুর, তাতে কালো রাজহাঁস চরত। একবার দেখেছিলাম জলের মধ্যে ঘন সবুজ ঘাসের চাপড়া; তার মধ্যিখানে কালো রাজহাঁস ডিম পেড়ে, ন্যাড়া ন্যাড়া বাচ্চা পালছে।
অনেক সময় চিড়িয়াখানায় জন্মানো ছোট ছোট জানোয়ারদের আর রুগ্ণ পাখিদের, কিছুদিন নিজের বাড়িতে রেখে, বিজয়মেসো তাদের দেখাশুনো করে সুস্থ করে তুলতেন। একবার একটা সুন্দর ঝাঁকড়াচুল বদমেজাজি কুকুর আমাকে কামড়ে দিয়েছিল। আরেকবার একজোড়া নীল লোমওয়ালা পার্শিয়ান বেড়ালের গায়ে হাত বোলাতে গেলে, তারা আমার ছোট ভাইয়ের হাতে চার ইঞ্চি লম্বা আঁচড় দিয়েছিল। সেখানে আয়োডিন দিতে হয়েছিল। বিজয়মেসো বলেছিলেন অচেনা লোক দেখলে রুগ্ণ জানোয়াররা ভয় পায়।
বিজয়মেসোর বাড়ির কাছেই বাঘের ঘর। সেখান থেকে নানারকম অদ্ভুত আওয়াজ আসত।
কিন্তু বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তু ছিলেন বিজয়মেসো নিজে। মাঝারি লম্বা, শক্ত কর্মঠ চেহারা, চোখ দেখে মনে হত সর্বদা হাসি পাচ্ছে। বাড়িসুদ্ধ সবাই গানবাজনাপাগল, বাদে উনি। তবে স্নানের ঘরের দরজা বন্ধ করে মাঝে মাঝে তাঁকেও গুনগুন করতে শোনা যেত, ‘সা-গা! গা-ধার পা! না মানুষের পা!’ কৈশোরে যত জায়গায় গিয়েছি, বিজয়মেসোর বাড়ির কাছে কোনওটা দাঁড়াতে পারত না। এমনকী তাঁদের শোবার ঘরে গিয়ে দেখেছি বিশাল এক মশারির নীচে মস্ত এক বিজ্লি পাখা ঘুরছে!
