ইন্দুমাসির বাড়ির হলঘরের দেওয়ালে একটা বড় হুকে সর্বদা একটা গুলিভরা বন্দুক ঝুলত। চারদিকে নানারকম হিংস্র জানোয়ারের বাস। হঠাৎ কী বিপদ ঘটে বলা তো যায় না। তবে কেউ নাকি কখনও ওই বন্দুকটাকে ব্যবহার হতে দেখেনি।
একদিন রাতের খাওয়া সেরে বিজয়মেসো সবে উঠেছেন, এমন সময় একজন চৌকিদার হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে বলল, ‘সাহাব! শের ভাগা!’ বিজয়মেসো আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘সে কী রে! কোন শের ভাগা?’ সে বলল যে নতুন বাঘটা বোল্টন সাহেব উপহার পাঠিয়েছেন, সেই বাঘ কাঠের ক্রেট ভেঙে পালিয়েছে।
বিজয়মেসো বললেন, ‘তাঁর খাঁচা তো তৈরি ছিল। সেখানে পোরা হয়নি কেন?’ চৌকিদার বলল, ‘নাথুলালের জ্বর হয়েছে, সে কাজে আসেনি। বাকিরা অত বড় বাঘ ঘাঁটতে ভয় পাচ্ছে।’
বিজয়মেসো আঁচিয়ে এসে, দেওয়াল থেকে বন্দুকটা পেড়ে নিয়ে বললেন, ‘চল তা হলে।’ চৌকিদারের মুখ সাদা, ‘সাহাব!’ বিজয়মেসো বললেন, ‘কেন, তোর কাছে খাঁচার চাবি নেই?’ ‘জি, হাঁ।’ ‘তবে আবার কী? আমার সঙ্গে সঙ্গে চল!’ একটু তফাত রেখে চৌকিদার পেছন পেছন চলল।
গেট দিয়ে বেরোতেই, সামনের অন্ধকার ঝোপঝাপগুলো একটু নড়ে উঠল আর একটা বিরাট বাঘ বেরিয়ে এসে, বিজয়মেশোর দুই কাঁধে দুই থাবা রেখে, দু’পায়ে উঠে দাঁড়াল। ওঁর গলার কাছে বাঘের মুখ।
বিজয়মেসো প্রমাদ গনলেন। এমন সময় শুনতে পেলেন বাঘের গলা থেকে খুশি-হওয়া বেড়ালছানার মতো খ-র-র খ-র-র শব্দ বেরোচ্ছে!
আর বলে দিতে হল না। এক নিমেষে সমস্ত ব্যাপারটা তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। বাঘের মাথায় হাত বুলিয়ে, নরম গলায় বিজয়মেসো বললেন, ‘আরে বাচ্চু! বাচ্চু! তুই ফিরে এসেছিস্!’
বাঘটাও কী করবে ভেবে না পেয়ে ওঁর বুকে মাথা ঘষতে লাগল। বিজয়মেসো পকেট থেকে ওঁর বড় রুমালটা বের করে নিচু হতেই, বাঘও চার পা মাটিতে নামিয়ে ওঁর পায়ে মুখ ঘষতে লাগল। বিজয়মেসো ওর গলায় রুমাল বেঁধে, চৌকিদারকে বললেন, ‘তুই আগে আগে গিয়ে দু’নম্বর খাঁচার দরজা খোল। ওটাই তৈরি আছে।’
চৌকিদার এতক্ষণ হাঁ করে ভাবছিল এ কী ভেলকি দেখছে, না কি? এখন সে আর একমুহূর্তও অপেক্ষা করল না। চাবি নিয়ে দৌড়ল। বিজয়মেসোও বাঘের সঙ্গে কথা বলতে বলতে খাঁচার মধ্যে ঢুকলেন। তারপর বাঘের মুখে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘তুই এখন ঘুমো বাচ্চু। আমি কাল আবার আসব।’
বেরিয়ে এসে খাঁচার তলায় চাবি ঘুরিয়ে, চৌকিদারকে বললেন, ‘চল্ রে, রামধরিয়া। অনেক রাত হল।’
রামধরিয়ার মুখে কথা নেই। কিছু দূর গিয়ে মুখ ফিরিয়ে বিজয়মেসো বললেন, ‘কী রে, তাজ্জব বনে গেছিস্ বুঝি? আরে মানুষ ভুলে যায়, জানোয়ার কখনও ভোলে না। ওই বাচ্চু এই বাগানেই জন্মেছিল। ওর মা তখনই মারা গিয়েছিল। আমি ঝুড়িতে করে ওকে বাড়িতে এনে, বোতলে করে দুধ খাইয়ে বড় করেছিলাম। এই বাড়িতে ওর শৈশব কেটেছিল। তাই ছাড়া পেয়েই এখানে চলে এসেছিল।
জানিস্ তো এখানকার নিয়ম, বাড়তি জানোয়ার ভাল জায়গা দেখে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এক সাহেব ওকে কিনেছিল মনে আছে। সে বোধহয় বিলেত ফিরে যাবার সময় বোল্টনকে বাঘটা দিয়ে গেছিল। বোল্টনকে আমি চিনি না, তাই হঠাৎ বুঝতে পারিনি।
বাচ্চু কিন্তু আমাদের বাড়ি আর আমাকে ঠিকই চিনেছিল।’
বাঘের গল্প
বলেছি তো চার রকম গল্প খুব উতরোয়, বাঘের প্রেমের চোরের আর ভূতের। তার মধ্যে বাঘের কথাই ধরা যাক। ছোটবেলা থেকে বাবার কাছে অজস্র বাঘের গল্প শুনে এসেছি। আমাদের দেশের বাড়ি ছিল ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ সাব-ডিভিশনের মসূয়া গ্রামে।
চারদিকের জল-জংলায় বড় বড় ডোরাকাটা বাঘ কিলবিল করত। তারা দিনের বেলাও গ্রামে এসে দাপিয়ে বেড়াতে পেছপাও হত না! বেঘো কাশি শোনামাত্র চারদিকে, ‘বাঘ আইসে! বাঘ আইসে!’ রব উঠত। যে যেখানে ছিল দুমদাম দরজা-জানলা বন্ধ করে ভেতরে বসে থাকত। যতক্ষণ না গাঙ পার হয়ে বাঘের বনে ফেরার খবর পাওয়া যেত, ততক্ষণ কেউ বেরোত না। শুনেছি বাবার ঠাকুমার সময়ও এইরকম অবস্থা ছিল।
বাবার ছোটবেলাটা দেশে কেটেছিল, তবে ততদিনে বাঘের উপদ্রব অনেক কমে গেছিল। কমেছিল, কিন্তু একেবারে বন্ধ হয়নি। আমার বড় জ্যাঠা, মেট্রোপলিটান কলেজের অধ্যক্ষ সারদারঞ্জন রায় পড়াশুনোর সঙ্গে সঙ্গে শরীর মজবুত করাতে বিশ্বাস করতেন। ছুটিছাটাতে দেশে গিয়ে গাঁসুদ্ধ ছেলেদের নিয়ে খেলাধুলো, মাছধরা, সাঁতার কাটা, শিকার করায় মেতে যেতেন।
কী শিকার? না বুনো শুয়োর আর শেয়াল। এরা গৃহস্থদের তরমুজ খেতের বড়ই ক্ষতি করত। ঠিক হল ফাঁদ তৈরি করে, শেয়াল ধরা হবে। মহা উৎসাহে জাল দিয়ে কাঠ দিয়ে ফাঁদ তৈরি হল। তারপর প্রায় রোজই ফাঁদে শেয়াল পড়তে লাগল। সকলের উৎসাহ আরও বেড়ে গেল।
একদিন ছোট জ্যাঠা আর বাবা, দুজনে সবার আগে উঠে, বড়দের কাউকে কিছু না বলেই ফাঁদ দেখতে ছুটলেন। কেউ কোত্থাও নেই, চারদিক থমথম করছে, পাখিটাখিও ডাকছে না। আর ফাঁদের মধ্যে সমস্ত জায়গাটা জুড়ে, গোঁফ ফুলিয়ে একটা হলদে-কালো ডোরাকাটা বাঘ বসে রাগে ফোঁসফোঁস করছে। শুনেছি ঠাকুমার বকাবকির ফলে ফাঁদ ভেঙে ফেলা হল।
বাঘের সঙ্গে বাবার মোকাবিলা হয় এর অনেক পরে, যখন ভারতীয় জরিপ বিভাগের কাজে উত্তর-পূর্ব ভারতে, শ্যামদেশে, বর্মায় বনে-জঙ্গলে তাঁকে দলবল নিয়ে যেতে হত। যত না চোখে দেখতেন, তার চেয়েও অনেক বেশি আশ্চর্য সব গল্প শুনতেন।
