এদিকে মাছের গায়ে হাত দেবার জন্য, বন্ধুদের হাত নিশপিশ করছিল। গোমস্তা সযত্নে বঁড়শি খুলে ফেললেন। তখন সকলের খেয়াল হল যে মাছের নাকে একটা পেতলের নথ পরানো হয়ে গেছে। তাতে খুদে একটা পেতলের টিকিট ঝুলছে। গোমস্তা ডেকে বললেন, ৭৩ নং। সংখ্যাটি খাতায় লেখা হল।
সঙ্গে সঙ্গে কেউ কিছু বুঝবার আগেই, মাছটাকে ঠেলে ঝুপ্ করে আবার জলে ফেলে দেওয়া হল। মাছুড়েদের চক্ষুস্থির! এত কষ্টের মাছ গো!!
ইদিকে ম্যানেজার মনিব্যাগ খুলে বললেন, ‘সাড়ে বারোক্কে ছয় আনা হল গিয়ে ছয় বারোং বাহাত্তর আর তিন। এই ধরুন চার টাকা এগারো আনা। বাড়ি যাবার পথে ভাল দেখে একটা কিনে নিয়ে যাবেন, কেমন?’
তারপর চার বন্ধুর বজ্রাহত মুখের দিকে চেয়ে বললেন, ‘আরে ছি! ছি! কর্তামশাই বোধহয় বলতে ভুলে গেছিলেন যে আমাদের এখানকার নিয়ম যে মাছ ধরা হবে, কিন্তু মারা হবে না। আনন্দটা তো ধরাতেই, মারাতে তো আর নয়। আমরা এই খাতায় মাছদের নম্বর দেখে, ওদের বাড়ের একটা হিসাব পাই। এবার চলুন, খাবার তৈরি।’
না, ওঁরা রেগেমেগে না খেয়ে চলে যাননি। গেলে ভুল করতেন। মখমলের আসনে বসিয়ে, শ্বেতপাথরের থালা বাটিতে ষোলো বেন্নুনে খাইয়েছিল। তারপর দই, রাবড়ি, সন্দেশ। শুধু বোকারাই রেগেমেগে না খেয়ে বাড়ি যায়।
বইপাড়া
সবাই বলে বইপাড়া। মেয়েদের সেখানে খুব একটা দেখা যায় না। মেয়েরা বই পড়ে, বই কেনে, বই পড়ায়, বই লেখে, বইয়ের সম্পাদক প্রকাশক পর্যন্ত হয়, অথচ বইপাড়ার বইয়ের দোকানে তাদের খুব কম দেখা যায়। অবিশ্যি তা সত্ত্বেও ওই নারীবিবর্জিত ঘন বনে রোমাঞ্চের এতটুকু অভাব নেই। সত্যি কথা বলতে কী ওটি হল কলকাতা শহরের সব চাইতে চাঞ্চল্যকর জায়গা। খুব একটা বিস্তৃত অঞ্চলও নয়। এই ধরুন কলেজ স্ট্রীট আর মহাত্মা গাঁধী রোডের সংযোগস্থলে কম্পাসের খোঁচামতোটাকে গেড়ে, যদি সেখান থেকে কলুতলার মোড় অবধি ব্যাসার্ধ নিয়ে একটা গোলমতো আঁকা যায়, তাহলেই বই-পাড়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাগুলো ওর মধ্যে পড়ে যাবে। অবিশ্যি ইদিকে-উদিকে কিছু শুঁড়টুড় বেরিয়ে থাকবে! এই অঞ্চলের মধ্যে আবার সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হল শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট বলে একটা রাস্তা, যেখান দিয়ে চারজন মোটা মানুষ পাশাপাশি হাঁটলে, অন্য পথচারীদের কাঁকড়ার মতো পাশ ফিরে এগোতে হবে।
ওই রাস্তার প্রত্যেকটি বাড়িতে বোধ হয় তিন থেকে পাঁচটি বইয়ের দোকান। সব চাইতে ভাল ব্যাপার হল যে সেখানে বই বেচা-কেনা ছাড়া আর কিছু হয় না, হবার চেষ্টাও থাকে না, দরকারও নেই। যাদের মেঝে থেকে ছাদ অবধি থাকে থাকে শুধু নতুন নতুন বই, তাদের আবার ঘর সাজাবার কী দরকার?
অবিশ্যি ‘কিছু হয় না’ ভুল বললাম। কারণ ভারী মনোহর অতিথি আপ্যায়ন হয়। এত বেশি অতিথিবৎসল মানুষ এত কাছাকাছি পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না সন্দেহ। তা ছাড়া উৎকৃষ্ট সন্দেশের দোকানও নিশ্চয় আছে, কিন্তু কোথায় আছে। চোখে পড়ে না।
একটা বাড়ি আছে ওই রাস্তায়, তার একতলার সামনের ঘরগুলোতে অপেক্ষাকৃত বড় বইয়ের দোকান। তারই এক পাশে অন্দরে যাবার খিড়কি দোর। সেটা সর্বদা খোলা থাকে। সেখান দিয়ে ঢুকলে একটা উঠোনে পৌঁছনো যায়। সাবেকি উঠোন। এককালে কার গেরস্থালির অন্দরমহল ছিল, এখনও দেখলে মনকেমন করে। চারদিকে রক্ বাঁধানো। সেই রকে বেশ কিছু বইয়ের দোকান। একজন পথপ্রদর্শক ওই পর্যন্ত আমার সঙ্গে গিয়ে, ছায়ার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কিন্তু দোকানে যারা ছিল, তারা আমাকে ঘিরে দাঁড়াল। কী দিয়ে যে আমাকে সুখী করবে তা তারা ভেবে পাচ্ছিল না। বই না, চা না, লিম্কো না, পান না। অন্য কিছু বই আমদানি করে দেবে? না, তাও না। মোট কথা বিশ্বনাথ বলে আমি যে সুন্দরপানা খোঁচা নাক, রোগা লোকটিকে ছাড়া, মনে হল দুনিয়ার যাবতীয় সামগ্রী ওরা আমার জন্য এনে দিতে পারে। এমন কী আমি মিষ্টি খাই না শুনে, ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ চপ-কাটলেটের প্রসঙ্গও তুলেছিল। শেষপর্যন্ত বিশ্বনাথ যে ব্যবস্থা করে দেবে ভেবেছিলাম, সম্পূর্ণ অচেনা একটি ছেলে তার সবই করে দিল।
ওই রাস্তায় আরেকটা দোকান আছে, সে এত ছোট যে বইপত্র ছাড়া মাত্র তিনজনের জায়গা হয়। তাও একজনকে রাস্তার দিকে আর বাকি দুজনকে তার দিকে মুখ করে বসতে হয়। সে দুজনের নিচু টুল, অন্য জনের উঁচু আসন। নইলে তিন জোড়া হাঁটু রাখার জায়গা কুলোয় না। কিন্তু বড় ভাল জায়গা। ওখানে আমি জীবনের অনেকটা সময় কাটাতে রাজি আছি। অজেয় রায় বলে আমার চেনা একজন অপেক্ষাকৃত কমবয়সি লেখককে একবার ওখানে দু’ঘণ্টা বসে কিছু পাণ্ডুলিপির সংশোধন করে দিতে হয়েছিল। তিনি হাত-পা এলিয়ে দোকান জুড়ে বসে কাজ করছিলেন বলে তো আর প্রখ্যাত অতিথিসৎকার বন্ধ থাকতে পারে না! কিছু পরেই দেখা গেল রাস্তায় টুল পেতে—ফুটপাথের বালাইও নেই, জায়গাও নেই—তার ওপর দাঁড়িয়ে মালিকের ছেলে প্লেটে করে একটা গরম ডবল ডিমের মামলেট্ বাড়িয়ে ধরে আছে!
তাই বলে এহেন স্বর্গেও যে হিংসাত্মক ব্যাপার ঘটে না এমন নয়। অকুস্থলের চাক্ষুষ দর্শকদের কাছে শুনেছি, কয়েক বছর আগে, বেলা গড়িয়ে যখন প্রায় বিকেল, তখন এক হাতে একটা করে নারকোল প্যাটার্নের জিনিস উঁচু করে ধরে, কয়েকজন ভদ্র চেহারার যুবকের আবির্ভাব হল। তাদের দেখে সবাই কৌতূহলী হয়ে উঠতেই, তারা বলল, ‘এগুলো নারকোল নয়, বোমা। যে যার নিজের জায়গায় বসে থাকলে কোনও ভয় নেই। কিন্তু রাস্তায় নেমে এলেই ইয়ে—!’
