আমতা আমতা করে সে বলল, ‘ইয়ে— মানে রোজ রাতে যে লোকটা আসে, সে মানুষ নয়।’ লাটুবাবু একবার থমকে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, ‘ওসব গিন্নি সামলাবেন। আমার রোজ নাইট ডিউটি থাকে। কাল ভোরে এসে বাড়িটা একবার দেখিয়ে দেবেন।’
হাতে হাতে জিনিসপত্র গোছানো হল। যাযাবর পরিবারের বাড়তি জিনিস থাকে না। পরদিন সকালে বাড়ি দেখে গিন্নি মহা খুশি। এমন ভাল বাড়িতে তিনি নাকি জন্মে কখনও থাকেননি। আশেপাশে লোকালয় নেই, সব খোলা মাঠ। তাই দেখে লাটুবাবুও অনেকটা আশ্বস্ত হলেন।
হাতে হাতেই জিনিসের বেশিরভাগ গোছানো হয়ে গেল। সন্ধ্যার আগে খেয়েদেয়ে টিফিন নিয়ে লাটুবাবু তাঁর খবরের কাগজের আপিসে গেলেন। ভোরে এসে ভয়ে ভয়ে দরজার কড়া নাড়লেন। কাজটা বোধহয় ভাল হয়নি। কে জানে কী দেখতে কী দেখবেন।
গিন্নি কিন্তু হাসিমুখে দরজা খুলে দিয়ে, পরটা ভাজতে বসলেন। খেতে খেতে লাটুবাবু চারদিকে চেয়ে দেখলেন, সব কিছু কাল যেমন রেখে গেছিলেন তেমনি আছে। খালি শ্বশুরমশায়ের কাঁঠাল কাঠের মুগুরটা তাকের ওপর শোভা পাচ্ছে।
সেদিকে তাকাতেই, তাঁর পাতে আরও দুটো পরটা দিয়ে গিন্নি বললেন, ‘কী দেখছ? কাল রাতে যে ভারী মজা হয়েছিল। কোথা দিয়ে কে জানে, এক ব্যাটা চোর এসেছিল। অমনি সুড়সুড় করে ওপরে উঠে যাচ্ছিল। পকেট থেকে একগাছা দড়ি ঝুলছিল।
‘আমি রান্নাঘরে বাসনের বাক্স খুলেছিলাম। ব্যাটাকে দেখে বাক্স থেকে বাবার ওই মুগুরটা না নিয়ে, পেছন থেকে ছুটে গিয়ে ব্যাটার ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, আগাপাছতলা এমনি পেটান পেটালাম যে হতভাগা ট্যাঁফু করতে পারল না। কীসব গায়ে দিয়ে এসেছিল, খালি খালি ফসকে যাচ্ছিল, যেন শূন্যে খামচাচ্ছি! তবু ছাড়িনি, শ্যাম গোঁসাইয়ের মেয়েকে চেনেনি লক্ষ্মীছাড়া। শেষটা মারের চোটে নাকটা ভেঙে গিয়ে থাকবে।
‘তখন আবার পায়ে পড়ে বলতে লাগল, ‘হেঁই মা, ছাঁড়ান দিন, ছাঁড়ান দিন, আঁর কঁক্ষনও এঁখানে আঁসব না, এঁই নাঁকে খঁৎ দিলাম!’
‘তাপ্পরেই এমনি চালাক, প্রায় আমার মুঠোর মধ্যে থেকে খসে কোথায় সে পালাল। মুগুর হাতে কত খুঁজলাম আর দেখতে পেলাম না। এ্যাঁ, ও কী হল!’
কী আর হবে, লাটুবাবু মুচ্ছো গেলেন।
বলাবাহুল্য, নেই-মানুষটা আর আসেনি। ছয় মাস বিনি ভাড়ায় থাকার পর, লাটুবাবু সস্তা দরে বাড়িটা কিনে ফেলেছেন।
দাদামশাই ও স্বেন হেদিন
ভ্রমণকাহিনির কথাই ধরা যাক। সত্যি কথা, অথচ ভূতের গল্পের মতো লোম খাড়া করে দেয়। কেউ কেউ বানিয়ে কিংবা বাড়িয়ে লেখেন, কিন্তু তার চেয়েও রোমাঞ্চকর যে ভ্রমণকাহিনি একেবারে আনকোরা বাস্তব। আমাদের বন্ধু শ্রীউমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যেমন হিমালয় ভ্রমণ লেখেন, শ্রীমতী সবিতা ঘোষ যেমন বিদেশ ভ্রমণ লেখেন। সেকালেও এইরকম খাঁটি ভ্রমণকারীদের আত্মকথা পত্রিকাতে, বইতে বেরোত। তাঁদের একজন স্বেন হেদিন।
সুইডেনে বাড়ি, ছোটবেলা থেকে মধ্য ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ভ্রমণের শখ। তখন পর্যন্ত যে সমস্ত অজ্ঞাত নির্জন দেশ হিমালয়ের উত্তরে গাঢাকা দিয়ে থাকত, সেই সব জায়গায়, অনুমতি নিয়ে কিংবা বিনা অনুমতিতে, প্রাণ হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। তাকলামাকান, তিব্বত, মানস সরোবর, কৈলাস পর্বত যাবার অনুমতি পাওয়া লালমুখো সাহেবের পক্ষে বড় শক্ত ছিল। তবু যেতেন। বারেবারে যেতেন। ফিরে এসে বই লিখতেন, ছবিটবি দিয়ে। সেকালে ক্যামেরা অত সহজলভ্য ছিল না, তাই নিজের হাতে চমৎকার ছবি এঁকে নিতেন। বইতে সেই ছবিও থাকত।
ভারী রসিক ছিলেন। রসবোধ না থাকলে কেউ অজ্ঞাত বিপজ্জনক কষ্টকর পথে পা দিয়ে আনন্দ পায়? খরচপত্র ছিল। সরকারি সাহায্য জোগাড় করতেন। মধ্য এশিয়ায় পৌঁছে, অনেক সময় বোগদাদে আস্তানা গাড়তেন। হারুণ-অল-রশিদের কথিত রাজধানী বোগদাদ। ইউরোপের লোক সেই জায়গাটাকেই সুদূরের সীমান্ত বলে মনে করে। আর তাঁর যাত্রা শুরু হত সেখান থেকে। একেকবার ভারবাহী ঘোড়া, খচ্চর, মজুর, গাইড, দোভাষী, রসদ সংগ্রহ করতেই এক বছরের ওপর কেটে যেত। স্থানীয় ভাষা টাকা চলনসই গোছের শিখে নিতেন। আমীর-ওমরাহ থেকে ফকির, মুশাফিরদের সকলের সঙ্গে চেনা হয়ে যেত। দেশ থেকে বেশি সঙ্গীসাথী আনতেন না, কারণ রওনা হবার আগেই তাদের দেশের জন্য মন-কেমন করতে শুরু করত।
একবার বোগদাদে ওইরকম অনেক দিন ধরে তোড়জোড় চলছে। এমন সময় এক মুশাফির এসে কিছু সাহায্য চাইল। তাকে বিদায় করবার জন্য যৎসামান্য দেওয়া হল। তাতে সে মোটেই খুশি হল না। উলটে বলল, ‘কী! আমি পৃথিবীর যে কোনও ভাষার শ্রেষ্ঠ কাব্য থেকে লাইনের পর লাইন মুখস্থ বলতে পারি আর আমাকে কিনা এই সামান্য বিদায় দেওয়া…!’
একথা শুনে স্বেন হেদিনের ভারী মজা লাগল। তিনি বললেন, ‘তাই নাকি? আচ্ছা বলো তো দেখি, আমার দেশের শ্রেষ্ঠ কাব্য থেকে দশ লাইন।’ বলবামাত্র লোকটা নিখুঁত উচ্চারণে গড়গড় করে সুইডেনের বিখ্যাত প্রাচীন কাব্য থেকে দশ-বারো লাইন আউড়ে গেল। স্বেন হেদিনের গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। তিনি তাকে আরও অনেকগুলো টাকা দিয়ে ফেললেন।
তখন লোকটা বলল, ‘নাঃ! আপনাকে বেশিক্ষণ এরকম ধাঁধার মধ্যে ফেলে রাখা কর্তব্য হবে না।’ এই বলে এক টানে চুল দাড়ি গোঁফ খুলে ফেলে দিল। ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল স্বেন হেদিনের পুরনো বন্ধু, সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়ের এশীয় ভাষার বিখ্যাত অধ্যাপক! মাঝে মাঝে এইরকম মজা হত বলেই, স্বেন হেদিন ওই রকম অমানুষিক কষ্ট সইবার মনের জোর পেতেন।
