হাত ধুয়ে তোয়ালে নিয়ে, ডাক্তার সত্যেনকে বললেন, ‘দেখি, বড় একটা হাঁ কর তো, বাবা। থাক, থাক, উঠতে হবে না।’
সত্যেন শুয়ে-শুয়েই হাঁ করল। সঙ্গে সঙ্গে হাতে তোয়ালেটা জড়িয়ে, টপ্ করে ওর জিব ধরে, ডাক্তার ওকে টেনে বসিয়ে দিলেন! ওর মনে হল শেকড়-বাকড় সুদ্ধ জিব বুঝি উপড়ে এল! ব্যথার চোটে উঁ-উঁ করতে করতেই টের পেল যে হেঁচকি একেবারে সেরে গেছে!!
আরেকবার হাত ধুতে ধুতে খুশি হয়ে ডাক্তার বললেন, ‘ষাট বছর আগে, লন্ডনের গাইজ হসপিটালে আমার মাস্টারমশাই এই নিয়মটা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এতকাল পরে পরখ করে দেখবার একটা সুযোগ পাওয়া গেল! আচ্ছা, অনেক ধন্যবাদ!’
দজ্জাল মেয়ে
পৃথিবী জুড়ে সবাই যখন নারীর অধিকার নিয়ে আন্দোলন করে, আমার তখন হাসি পায়। কারণ আমাদের দেশে এতকাল মিটিং-টিটিং না করেই, হাতরুটির বেলনা আর মুড়ো ঝাঁটার সাহায্যে আমরা যে নিজেদের অধিকার রক্ষা করে এসেছি, তার ভূরি ভূরি প্রমাণ দেখতে পাওয়া যায়। বক্তৃতা-টক্তৃতা করেও যা হয় না— সে চেষ্টাও নিরিবিলিতে প্রচুর করা হয়েছে— একটা সামান্য কাঠের বেলনা দিয়ে যদি তা সম্পন্ন করা যায়, তা হলে মন্দ কী? ভেবে দেখুন কত সময়, পরিশ্রম আর খরচ বেঁচে যায়।
দাক্ষিণাত্য আমাদের এক বন্ধুর দেশ। সেখানকার মেয়েরা কোনওকালেও পরদার আড়াল হয়নি। তাদের আচার-আচরণ দেখে এখনও তার পরিচয় পাওয়া যায়। কী তাদের দাপট! দেখে ভক্তি হয়। তারই মধ্যে আমাদের বন্ধুর পিসিমা ছিলেন অনন্যা। তাঁর ভয়ে পিসেমশাই মুখে রা কাড়তেন না। বন্ধুবান্ধবরা তাই নিয়ে হাসাহাসি করতেন। বলতেন— এ-রাম! বউকে ভয় পায়!
গাঁয়ের কুয়োতলার সামনে শম্ভু বলে এক বন্ধুর বাড়িতে রোজ তাঁদের বৈকালীন আড্ডা বসত। গাঁয়ের গিন্নিরা আর মেয়েরা ওই সময় পানীয় জল তুলতে এসে, কুয়োর পাড়ে গল্পগুজব করত। একদিন তাদের মধ্যে পিসিমাকে দেখে, শম্ভু বলল, ‘ওই যে তোর বউ! তুই তো ওর সামনে ঠোঁট ফাঁক করতে ভয় পাস!’ তাই শুনে বাকিদের কী বিশ্রী হাসি!
পিসেমশায়ের আঁতে ঘা লাগল। তিনি বললেন, ‘ও তোমাদের ভুল ধারণা। তোমাদের মতো কথায়-কথায় বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করি না বটে, কিন্তু দরকার হলে কষে দু’কথা শুনিয়ে দিতেও ছাড়ি না! ও মাথা নিচু করে শোনে, তা জানিস! ওকে আমি থোড়াই কেয়ার করি! চাও তো তার প্রমাণ দিতে পারি!’
বন্ধুরা আরও মজা পেয়ে বলল, ‘বেশ দশ টাকা বাজি। কাল বিকেলে তুমি আমাদের সামনে বউকে আচ্ছাসে দু’কথা শোনালে, ও কেমন মাথা নিচু করে শোনে, তার প্রমাণ দিও।’
বাড়ি ফিরেই পিসেমশাই পিসিমাকে বললেন, ‘কাল দশ টাকা রোজগার করতে চাও?’ পিসিমা ইডলি তুলতে তুলতে বললেন, ‘কী করতে হবে?’ পিসেমশাই ঢোঁক গিলে বললেন, ‘কিচ্ছু না। আমি কুয়োতলায় গিয়ে তোমাকে দুটো কড়া কথা বলব, তুমি মাথা নিচু করে শুনবে।’
পিসিমা ইডলির পাত্র চাপা দিয়ে বললেন, ‘এগারো টাকা।’ পিসেমশাই বললেন, ‘বেশ, তাই সই!’ আত্মসম্মানের কাছে একটা টাকা কিচ্ছু না।
পরদিন যথাসময়ে পিসিমা কুয়োতলায় পৌঁছে, জল তুলে, বন্ধুদের সঙ্গে দুটো কথা বলছেন, এমন সময় পিসেমশাই সেখানে দাপাতে দাপাতে গিয়ে বললেন, ‘তুমি ভেবেছ কী লক্ষ্মীয়াম্মা! বাড়ির কাজ ফেলে রোজ সন্ধ্যা অবধি গালগল্প আমি আর সইব না। যাও, বাড়ি যাও!’
তাই শুনে বন্ধুদের এবং পাশের বাড়ির দালানে বসা পুরুষ দর্শকদের অবাক করে দিয়ে, পিসিমা কাঁচুমাচু মুখ করে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। ওতেই পিসেমশাইয়ের কাল হল। অনাস্বাদিত বিজয়গর্ব তাঁর মাথায় চড়ল। গিন্নিকে মাথা নিচু করে বেণী দুলিয়ে চলে যেতে দেখে, তিনি আর লোভ সামলাতে পারলেন না। দিলেন বেণী ধরে হেঁচকা টান।
আর যায় কোথা! অমনি ঘুরে দাঁড়িয়ে, দাঁত খিঁচিয়ে পিসিমা বললেন, ‘এ মতো তো কথা ছিল না!’ বলে এক নিমেষের মধ্যে পিসেমশাইকে একেবারে মাটির সঙ্গে বিছিয়ে দিয়ে, দুম-দুম করতে করতে বাড়ি চলে গেলেন। ব্যাপার দেখে পিসেমশায়ের বন্ধুরা থ’! বলাবাহুল্য কেউ টাকাকড়ি পেল না।
কথায় বলে মেয়েদের অসাধ্য কিছু নেই, তারও একটা নমুনা দিচ্ছি। তবে এ গল্পের সত্যমিথ্যার জন্য আমি দায়ী নই। লোকে বলত কলকাতায় বা তার আশপাশে, দুশো টাকা ভাড়ার মধ্যে এমন বাড়ি ছিল না, যেখানে লাটুবাবু আর তাঁর স্ত্রী কিছুদিন বাস করেননি। সব বাড়ি ছাড়ার একটাই কারণ, সেটি হল ওই গিন্নি। হয় বাড়ি পছন্দ নয়, নয় বাড়িওয়ালার সঙ্গে ঝগড়া, নয় পাশের বাড়ির ভাড়াটেদের বরদাস্ত করা যায় না, নয় আর কিছু।
এমনি করে খুঁজে খুঁজে যখন শহরের সমস্ত দুশো টাকার ভাড়া-বাড়ি শেষ করে এনেছেন, তখন আপিস ফেরার পথে এক দালাল এসে লাটুবাবুকে ধরল। বেহালা অঞ্চলে নাকি একটা চমৎকার বাড়ি পাওয়া যেতে পারে, সেখানে এক রাত বাস করতে পারলে, পরের ছয় মাস ভাড়া দিতে হবে না এবং তার পরেও ওই দুশো টাকা।
লাটুবাবু সঙ্গে সঙ্গে দালাল সমভিব্যাহারে মালিকের বাড়ি গিয়ে চুক্তিপত্র সই করে এলেন। সেখান থেকে বেরিয়েই দালাল বলল, ‘দেখুন একটা কথা আপনাকে বলা হয়নি, এখন তাই বিবেকে বাধছে।’ ‘কী আবার কথা?’ ‘বাড়িটা একবার দেখলেনও না—’ ‘দেখার কী আছে, সব বাড়িই এক। গিন্নি কোথাও বেশি দিন থাকেন না। কিন্তু কথাটা কী শুনি?’
