যে সময়ে স্বেন হেদিন মানস সরোবর দেখতে গেছিলেন, আমার দাদামশাই, রামানন্দস্বামীও তার কাছাকাছি সময়ে কৈলাস পর্বত, মানস সরোবরে গেছিলেন। তফাত ছিল এই যে সাহেব গেছিলেন জ্ঞান আহরণ করতে, দাদামশাই গেছিলেন তীর্থ করতে। অবিশ্যি ভ্রমণের নেশা দুজনারই সমান ছিল।
দাদামশাই সন্ন্যাসী মানুষ, ষাটের ওপর বয়স। দিব্যি সুন্দর পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে সমস্ত ব্যবস্থা করে নিয়ে, দেরাদুন থেকে পায়ে হেঁটে রওনা হয়ে গেলেন। সঙ্গে রসদ নেননি। সন্ন্যাসীরা কখনও ভবিষ্যতের ব্যবস্থা করে পথ চলেন না। পথের দরকার পথ থেকেই জুটে যায়।
দাদামশাই নিয়েছিলেন একটা কম্বল, একটা কাঠের বাটি, একটা মোটা লাঠি। দেরাদুন থেকে যোগী মঠ, সেখান থেকে কৈলাসের রাস্তা। ১৩০৫ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে রওনা। দুজন সেবক সঙ্গে গেল। একজনের ওই অঞ্চলেই বাড়ি। তিব্বতী ভাষা ভাল জানত। ওই পথে ওইরকম একজন সঙ্গে না থাকলে চলে না।
সেই বরফ-জমা অঞ্চলে পায়ে হেঁটে পথ চলা বড়ই কষ্টকর। থেকে থেকেই গুহাগহ্বর। অনেক সময়ই তার কাছে একটা গরম জলের উৎস। যেন ভগবানই তীর্থযাত্রীদের জন্যে ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
সেকালে দু’জাতের লোক তিব্বত যেত, ব্যাবসাদাররা আর তীর্থযাত্রীরা। সবাই গুহায় রাত কাটাত, গরম জলের উৎসে গা ধুত। জাতের বালাই কি অমন জায়গায় টেকে?
পথে গন্ধমাদন পর্বত দেখেছিলেন, ম্যাপে নিশ্চয় তার অন্য নাম। পাহাড়ে নানা রকম ওষুধের গাছ আছে। রাতে দাদামশাই পাহাড়ে আলো জ্বলতে দেখেছিলেন। ওখানে নাকি কেউ থাকে না। কীসের আলো কে জানে।
নিতি গিরিপথের কাছেই হোতি গিরিপথ। তাদেরও অন্য নাম আছে। সেই পথ দিয়ে গেছিলেন। নিতি হল গিয়ে ইংরেজশাসিত ভারত থেকে স্বাধীন তিব্বত দেশের মধ্যিখানের প্রবেশপথ।
এইখানে একটু গোলমাল দেখা দিল। এর আগে অবধি সাধু-সন্ন্যাসীরা ওপথে গেলে কেউ বাধা দিত না। তবে সাহেবদের ঢুকতে দেওয়া হত না। এদিকে লাসা অঞ্চলের মানচিত্র করবার জন্যে মাপজোক করতে লোক পাঠানো দরকার। শেষ পর্যন্ত এদেশি লোকদের সাধু সাজিয়ে লাসা পাঠানো হয়েছিল। সেকথা জানাজানি হতে কতক্ষণ!
লাসার শাসনকর্তারা মহা রেগেমেগে নিয়ম করলেন, তিব্বতে গেলে সাধু-সন্ন্যাসীদেরও জামিন রেখে যেতে হবে। ওখানে মরগাঁও বলে একটা গ্রাম ছিল, সেখানে ১০ দিন বাস করতে হত। সুখের বিষয়, এ-সমস্ত অসুবিধাও আপনা থেকে দূর হয়ে গেল। মরগাঁওয়ের প্রধান দাদামশায়ের ভক্ত হয়ে পড়ল এবং সব রকম বন্দোবস্ত করে দিল।
হোতি গিরিপথ ১৫০০০ ফুট উঁচু আর বড় দুর্গম। সেই পথে পার হওয়া গেল। ওপারে পৌঁছে প্রধান নিজেই জামিন হল। সে এক ব্যাপার। আড়াই সেরি এক পাথরকে সমান দু’টুকরো করা হল— কী উপায়ে তা জানি না। তারপর টুকরো দুটোকে ন্যাকড়ায় জড়িয়ে সিলমোহর করে লিখে দিতে হল যে এই সাধু ইংরেজের ছদ্মবেশী চর কিংবা কম্পাসওয়ালা নন। তিব্বতে গিয়ে ধরা পড়ে যদি প্রমাণ হয় উনি ছদ্মবেশী চর, তা হলে কেদার সিং জামিন হয়েছে, অতএব তাকে ওই আধখানা পাথরের সমান ওজনের সোনা জরিমানা দিতে হবে। এমনকী ওখানকার রাজা ইচ্ছা করলে ওর প্রাণদণ্ডও দিতে পারেন।
বলাবাহুল্য দাদামশায়ের সে ভয় ছিল না। পাছে চর বলে স্থানীয় লোকরা সন্দেহ করে, সাধুরা তাই জুতো, ছাতা, বা ব্যাগ জাতীয় জিনিস সঙ্গে নিতেন না। দাদামশাই অনেক শারীরিক কষ্ট সয়ে আর মানসিক আনন্দ পেয়ে, কৈলাস, মানস সরোবর, নানা গুম্ফা, রক্ষিত তিব্বতী হরফে লেখা প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথির সংগ্রহ আর বহু পবিত্র জিনিস দেখে নিরাপদে অন্য গিরিপথ দিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর জন্যে কেদার সিংকে কোনও বিপদে পড়তে হয়নি।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল যে ওই বিদেশ-বিভুঁইয়ের ভিন্ন ভাষাভাষী গ্রামের লোকরা সঙ্গে করে ফলমূল, দুধ, মাখন, মিষ্টান্ন নিয়ে দলে দলে সাধু দেখতে আসত। তাঁদের শীতের রাত কাটাবার জন্য ছাউনি কিংবা গোয়ালঘর ছেড়ে দিত। তবু নিশ্চয় শীতে কষ্ট পেতেন, খালি পা, কম্বল ছাড়া গরম কাপড় নেই— কিন্তু সেটুকু তো হবেই।
যৎসামান্য খরচে, স্বেন হেদিনের যাত্রার প্রস্তুতিতে যত সময় লাগত তার সিকির সিকির চেয়েও কম সময়ের মধ্যে তোড়জোড় করে, লাঠি কমণ্ডলু কাঠের বাটি আর দুজন সঙ্গী সম্বল নিয়ে, দাদামশাই মানস সরোবর আর কৈলাস পাহাড় দেখে এসেছিলেন, আজ থেকে আশি বছর আগে।
দিলীপ
আজকাল যে শহরটাকে পুনে বলে, সেখানে একজন আশ্চর্য মানুষ থাকতেন। ৮০-র ওপর বয়স, লম্বা লম্বা পাকা দাড়ি, মাথায় টাক, মোটা শরীর, কানে কম শুনতেন, শরীরও বেশ অক্ষম হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তিনিই ছিলেন এযুগের বাণীর বরপুত্র। বছর দুই হল তিনি পরলোকে গেছেন।
তাঁর নাম দিলীপকুমার রায়। ইদানীং লোকে তাঁকে নিয়ে আর মাতামাতি করত না। কারণ তিনি ধর্মের বিষয়ে ছাড়া গদ্যও লিখতেন না, কবিতাও লিখতেন না। আর যে মহৎ গুণের জন্য তাঁকে দেশকালোত্তর বলা যায়, যে ক্ষেত্রে তিনি একক আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেই সংগীতও ধর্ম বিষয়ে ছাড়া তিনি গাইতেন না।
এক হাজারের ওপর গান নিজে রচনা করেছেন। তার চেয়েও বেশি গানে সুর দিয়েছেন। কিছু কাল আগে রবীন্দ্রসদনে তাঁর ভক্তবন্ধুরা মিলে একটি গানের আসরের ব্যবস্থা করেছিলেন। বেশিরভাগ গান ও সুরই দিলীপকুমারের রচনা, কিছু তাঁর শিষ্যদের। অন্যরকম হাওয়া, অন্যরকম মেজাজ। দিলীপকুমার নিজে উপস্থিত থাকলে, তাঁর প্রবল ব্যক্তিত্বের গুণে আর দেবদুর্লভ কণ্ঠের মাধুর্যে সেই বিশেষ সন্ধ্যাটি সে বছরের, আর শুধু সে বছরের কেন, অনেক বছরের আর সব সন্ধ্যা থেকে দশগুণ উজ্জ্বল হয়ে মনের মধ্যে ধরা থাকত।
