এমনি করে সপ্তাহ যায়, মাস যায়, ব্রিজের কাজও শুরু হয় না, টাকাও শেষ হয়। এমনি সময় একদিন হন্তদন্ত হয়ে পদাধিকারী গিয়ে কন্ট্রাক্টরের ক্যাম্পে হাজির হলেন। ‘সর্বনাশ হয়েছে, মশাই! ইংরেজ কমান্ডার আসছে ব্রিজ্ পরিদর্শন করতে। এদিক দিয়ে নাকি শত্তুর আসবে না, কিন্তু আমাদের সাঁজোয়া বাহিনী এগোবে শত্তুরকে আক্রমণ করতে!!’
কন্ট্রাক্টর চায়ের পেয়ালা নামিয়ে বললেন, ‘অত ভাবনা কীসের, দাদা? লিখে দিন অর্ডারের ভাষার অস্পষ্টতার দরুন ব্রিজ্টা এখানে না করে, হিমালয়ের পাদদেশে একটা ছোট নদীর ওপর করা হয়েছে। অ্যাওয়েটিং ফার্দার অর্ডার্স। ব্যস্৷ চুকে গেল!’
হলও তাই। তবে ঠিক চুকে গেল না। মিলিটারি থেকে দু’গুণ টাকা এল। যথাস্থানে সত্বর নতুন ব্রিজ তৈরি হোক, দিন রাত মজুর লাগাও। তার জন্যে বাড়তি টাকা। আর ভুল জায়গার ব্রিজের ওপর দিয়ে সুবিধা পেয়ে যদি জাপানিরা হানা দেয়, তাই সেটা ভেঙে ফেলার জন্যে এই এই টাকা!
বলাবাহুল্য সেই নেই-সাঁকো ভেঙে ফেলার টাকার অবিলম্বে সদগতি হল। আর ঠিক জায়গায় সাঁকো তৈরি করার আগেই যুদ্ধ থেমে গেল। মিলিটারি তখন অন্যান্য আরও জরুরি কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ব্রিজের জন্য দেওয়া ওই সামান্য দশ-পনেরো লাখ টাকার হিসেবও কেউ দেখতে চাইল না।
ডাক্তার
পৃথিবীতে— আর শুধু পৃথিবীতে কেন— আমাদের নিজেদের চারদিকেই— যত মজার ঘটনা ঘটে, অন্তত যত মজার ঘটনা ঘটেছে বলে শোনা যায়, বলাবাহুল্য তার সবটুকু আকাট বাস্তব নাও হতে পারে, সে সমস্ত যদি সংগ্রহ করে একের পর এক বলা যায়, তা হলে বোধ হয় দুনিয়ার সব রাগ দুঃখ হতাশা ক্ষোভ খেদ বিফলতা অন্তত কিছুক্ষণের মতো দূর হয়ে যায়। সেই বা কম কী?
যেমন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় কে যেন একটা মিলিটারি গল্প বলেছিল, সেটার কথাই ধরা যাক। এক বেচারা সেপাইয়ের বেজায় দাঁত ব্যথা, খেতে পারে না, ঘুমোতে পারে না, যুদ্ধ করা দূরে থাকুক। শেষ পর্যন্ত কাপ্তানের কাছ থেকে ছুটি আর অনুমতিপত্র নিয়ে গেল সে ডাক্তারি বিভাগে।
সেখানে গিয়ে দেখে মিলিটারি ডাক্তার মহা চটে আছে— এত বেশি রুগি, এত কম সময়! ডাক্তারের সহকারী, সেও এক মিলিটারি ভদ্রলোক। তিনি ছুটে এলেন, ‘আহা, এখানে না, এখানে না! যাও পাশের ঘরে গিয়ে কাপড়-চোপড় ছেড়ে রেডি হয়ে থাকো। নাম ডাকলে এসো। আমাদের সময় বড় কম।’
সেপাই বলল, ‘কাপড় ছাড়ব কেন? আমার তো দাত ব্যথা—’ সহকারী তেড়ে বললেন, ‘বাজে বোকো না। যা বলছি তাই করো। তাই নিয়ম।’
পাশের ঘরে একজন সম্পূর্ণ উলঙ্গ লোক একটি ফাইল কোলে নিয়ে, টুলে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। সেপাইকে গজগজ করতে শুনে, মুখ তুলে সে বলল, ‘অত গরম হবার কী আছে, মশাই? আমাকে দেখুন। আমি তো শুধু এই ফাইলটা দিতে এসেছিলাম।’
ডাক্তারি ব্যাপার বলতে আরেকটা গল্পও মনে পড়ে গেল। এক দাঁতের ডাক্তার বেজায় কাজে ব্যস্ত ছিলেন। একের পর এক রুগি ঢুকছে, তাড়াতাড়ি তার কাজ সেরে দিচ্ছেন। সে যেতেই আরেকজন ঢুকছে। এমন সময় ঘেমো চেহারার একজন লোক ঢুকেই চেয়ারে না বসে, কাঁচুমাচু মুখে আমতা-আমতা করে কী যেন বলবার চেষ্টা করতে লাগল। রুগিরা হামেশাই ডাক্তারদের জ্ঞান দিতে চেষ্টা করে; তার ওপর এ রুগি নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে একটু দেরি করেই এসেছে। অকুস্থল বিলেতে, সরকারি রুগি, সরকারি ডাক্তার। ডাক্তারের ধৈর্যও খুব বেশি ছিল না। তিনি রুগির কথায় কান না দিয়ে, তার কনুই ধরে, চেয়ারে বসিয়ে, হাঁ করিয়ে দেখেন মুখভরা পচা দাঁত। সঙ্গে সঙ্গে ইনজেকশন এবং পটাপট গোটাতিনেক উৎপাটন। তারপর ওষুধ লাগিয়ে, নিজের হাত ধুতে ধুতে প্রসন্ন গলায় বললেন, ‘বাঃ! বেশ হল! হ্যাঁ, এবার বলুন কী বলতে চাইছিলেন।’
রুগি আবার কঁচুমাচু মুখে বলল, ‘বলছিলাম কী, আমি রুগি নই। রুগি আমার পাশের বাড়ির ভদ্রলোক। তাঁর জ্বর হয়েছে।’
মাঝে মাঝে ডাক্তাররা এমনি বেজায় ভাল হন যে হাসি পায়। আমাদের আত্মীয় শিল্পী সত্যেন বিশীর যখন কুড়ি বছর বয়স, তখন তাকে একরকম বিটকেল হেঁচকিতে ধরল। সে আর কিছুতেই যায় না। তিন দিন ধরে সমানে চলল। সব রকম টোটকা ওষুধ চেষ্টা করা হল। কে যেন বলে গেল নাক কান এক সঙ্গে চিপকে ধরে, দু-তিন ঢোক জলের সঙ্গে একটা হেঁচকি পার করে দিতে পারলেই, হেঁচকি সেরে যায়। সত্যেনের ছোট ভাই খুশি হয়ে ওর কান চেপে ধরল, নিজে নাক বন্ধ করল, আধ গেলাস জল শেষ হল। হেঁচকি থামল না।
হঠাৎ চমকে গেলে নাকি হিক্কা বন্ধ হয়ে যায়। সত্যেনের বন্ধুরা যখন তখন ঘরে ঢুকে সম্পূর্ণ মনগড়া বীভৎস সব খবর এনে দিতে লাগল। শুনে সত্যেন আঁতকেও উঠতে থাকল। কিন্তু হিক্কা গেল না।
শেষ পর্যন্ত ওর সাহসী মাও কাঁদতে বসলেন, ‘আমি বরাবর জানি, যে হেঁচকি থামে না, সেই মানুষের শেষ হেঁচকি।’
এমন সময় তিনতলা থেকে ওদের ৮৫ বছরের বাড়িওয়ালা নেমে এসে বললেন, ‘শুনলাম হেঁচকি থামছে না, বলেন তো একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি।’ ভদ্রলোক বহুকাল অবসর-নেওয়া সিভিল সার্জেন। এক সময় খুব নাম-ডাক ছিল।
সত্যেনের মা হাতে চাঁদ পেলেন। ‘কী ওষুধ লাগবে বলুন, আনিয়ে দিচ্ছি।’
ডাক্তার বললেন, ‘বেশি কিছু লাগবে না। শুধু একটি ছোট পরিষ্কার তোয়ালে। তার আগে হাত ধোব।’
