এদের খেয়াল ছিল না যে , দরজা খোলা । বড়োবাবু এলেন । গর্জন করে উঠলেন , “ কী হচ্ছে রে। ”
ছেলেটার বুক কেঁপে উঠল , মুখ হল ফ্যাকাশে । ছবি কোথায় লুকোবে তার জায়গা পায় না। বড়োবাবু স্পষ্ট বুঝতে পারলেন , পরীক্ষায় চুনিলালের ইতিহাসে তারিখ ভুল হচ্ছে তার কারণটা কোথায় । ইতিমধ্যে চুনিলাল ছবিটাকে তার জামার মধ্যে লুকোবার ব্যর্থ প্রয়াস করাতে অপরাধ আরও প্রকাশমান হয়ে উঠল । টেনে নিয়ে গোবিন্দ যা দেখলেন, তাতে তিনি আরও অবাক — এটা ব্যাপারখানা কী। এর চেয়ে যে ইতিহাসের তারিখ ভুলও ভালো । ছবিটা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেললেন । চুনিলাল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ।
সত্যবতী একাদশীর দিন প্রায় ঠাকুরঘরেই কাটাতেন । সেইখান থেকে ছেলের কান্না শুনে ছুটে এলেন । ছবির ছিন্ন খণ্ডগুলো মেঝের উপর লুটোচ্ছে আর মেঝের উপর লুটোচ্ছে চুনিলাল । গোবিন্দ তখন ইতিহাসের তারিখ-ভুলের কারণগুলো সংগ্রহ করছিলেন অপসারণের অভিপ্রায়ে ।
সত্যবতী এতদিন কখনো গোবিন্দর কোনো ব্যবহারে কোনো কথা বলেন নি । এঁরই ‘ পরে তাঁর স্বামী নির্ভর স্থাপন করেছেন , এই স্মরণ করেই তিনি নিঃশব্দে সব সহ্য করেছেন । আজ তিনি অশ্রুতে আর্দ্র , ক্রোধে কম্পিত কণ্ঠে বললেন , “ কেন তুমি চুনির ছবি ছিঁড়ে ফেললে । ”
গোবিন্দ বললেন , “ পড়াশুনো করবে না ? আখেরে ওর হবে কী । ”
সত্যবতী বললেন, “ আখেরে ও যদি পথের ভিক্ষুক হয় সেও ভালো। কিন্তু, কোনোদিন তোমার মতো যেন না হয়। ভগবান ওকে যে সম্পদ দিয়েছেন তারই গৌরব যেন তোমার পয়সার গর্বের চেয়ে বেশি হয়, এই ওর প্রতি আমার , মায়ের আশীর্বাদ। ”
গোবিন্দ বললেন , “ আমার দায়িত্ব আমি ছাড়তে পারব না , এ চলবে না কিছুতেই । আমি কালই ওকে বোর্ডিঙ-স্কুলে পাঠিয়ে দেব — নইলে তুমি ওর সর্বনাশ করবে । ”
বড়োবাবু আপিসে গেলেন । ঘনবৃষ্টি নামল , রাস্তা জলে ভেসে যাচ্ছে ।
সত্যবতী চুনির হাত ধরে বললেন , “ চল্ , বাবা । ”
চুনি বললে , “ কোথায় যাবে , মা । ”
“ এখান থেকে বেরিয়ে যাই । ”
রঙ্গলালের দরজায় এক-হাঁটু জল । সত্যবতী চুনিলালকে নিয়ে তার ঘরে ঢুকলেন ; বললেন , “ বাবা , তুমি নাও এর ভার । বাঁচাও এ ‘ কে পয়সার সাধনা থেকে । ”
চোরাই ধন
মহাকাব্যের যুগে স্ত্রীকে পেতে হত পৌরুষের জোরে ; যে অধিকারী সেই লাভ করত রমণীরত্ন । আমি লাভ করেছি কাপুরুষতা দিয়ে , সে কথা আমার স্ত্রীর জানতে বিলম্ব ঘটেছিল । কিন্তু , সাধনা করেছি বিবাহের পরে, যাকে ফাঁকি দিয়ে চুরি করে পেয়েছি তার মূল্য দিয়েছি দিনে দিনে ।
দাম্পত্যের স্বত্ব সাব্যস্ত করতে হয় প্রতিদিনই নতুন করে , অধিকাংশ পুরুষ ভুলে থাকে এই কথাটা । তারা গোড়াতেই কাস্টম্ হৌসে মাল খালাস করে নিয়েছে সমাজের ছাড়চিঠি দেখিয়ে , তার পর থেকে আছে বেপরোয়া । যেন পেয়েছে পাহারাওয়ালার সরকারি প্রতাপ উপরওয়ালার দেওয়া তকমার জোরে ; উর্দিটা খুলে নিলেই অতি অভাজন তারা ।
বিবাহটা চিরজীবনের পালাগান ; তার ধুয়ো একটামাত্র , কিন্তু সংগীতের বিস্তার প্রতিদিনের নব নব পর্যায়ে । এই কথাটা ভালোরকম করে বুঝেছি সুনেত্রার কাছ থেকেই । ওর মধ্যে আছে ভালোবাসার ঐশ্বর্য , ফুরোতে চায় না তার সমারোহ ; দেউড়িতে চার-প্রহর বাজে তার সাহানা রাগিণী । আপিস থেকে ফিরে এসে একদিন দেখি আমার জন্যে সাজানো আছে বরফ-দেওয়া ফল্সার শরবত , রঙ দেখেই মনটা চমকে ওঠে ; তার পাশেই ছোটো রুপোর থালায় গোড়ে মালা , ঘরে ঢোকবার আগেই গন্ধ আসে এগিয়ে । আবার কোনোদিন দেখি আইসক্রীমের যন্ত্রে জমানো শাঁসে রসে মেশানো , তালশাঁস এক-পেয়ালা , আর পিরিচে একটিমাত্র সূর্যমুখী । ব্যাপারটা শুনতে বেশি কিছু নয় কিন্তু বোঝা যায় , দিনে দিনে নতুন করে সে অনুভব করেছে আমার অস্তিত্ব । এই পুরোনোকে নতুন করে অনুভব করার শক্তি আর্টিস্টের । আর ইতরে জনাঃ প্রতিদিন চলে দস্তুরের দাগা বুলিয়ে । ভালোবাসার প্রতিভা সুনেত্রার নবনবোন্মেষশালিনী সেবা । আজ আমার মেয়ে অরুণার বয়স সতেরো , অর্থাৎ ঠিক যে বয়সে বিয়ে হয়েছিল সুনেত্রার । ওর নিজের বয়স আটত্রিশ , কিন্তু সযত্নে সাজসজ্জা করাটাকে ও জানে প্রতিদিন পুজোর নৈবেদ্য-সাজানো , আপনাকে উৎসর্গ করবার আহ্নিক অনুষ্ঠান ।
সুনেত্রা ভালোবাসে শান্তিপুরে সাদা শাড়ি কালো পাড়ওয়ালা । খদ্দর-প্রচারকদের ধিক্কারকে বিনা প্রতিবাদে স্বীকার করে নিয়েছে; কিছুতেই স্বীকার করে নি খদ্দরকে । ও বলে, ‘ দিশি তাঁতির হাত , দিশি তাঁতির তাঁত , এই আমার আদরের । তারা শিল্পী , তাদেরই পছন্দে সুতো , আমার পছন্দ সমস্ত কাপড়টা নিয়ে । আসল কথা , সুনেত্রা বোঝে হালকা সাদা রঙের শাড়িতে সকল রঙেরই ইশারা খাটে সহজে । ও সেই কাপড়ে নূতনত্ব দেয় নানা আভাসে , মনে হয় না সেজেছে । ও বোঝে , আমার অবচেতন মনের দিগন্ত উদ্ভাসিত হয় ওর সাজে — আমি খুশি হই , জানি নে কেন খুশি হয়েছি ।
প্রত্যেক মানুষেই আছে একজন আমি , সেই অপরিমেয় রহস্যের অসীম মূল্য জোগায় ভালোবাসায় । অহংকারের মেকি পয়সা তুচ্ছ হয়ে যায় এর কাছে । সুনেত্রা আপন মনপ্রাণ দিয়ে এই পরম মূল্য দিয়ে এসেছে আমাকে , আজ একুশ বছর ধরে । ওর শুভ্র ললাটে কুঙ্কুমবিন্দুর মধ্যে প্রতিদিন লেখা হয় অক্লান্ত বিস্ময়ের বাণী । ওর নিখিল জগতের মর্মস্থান অধিকার করে আছি আমি , সেজন্যে আমাকে আর-কিছু হতে হয় নি সাধারণ জগতের যে-কেউ হওয়া ছাড়া । সাধারণকেই অসাধারণ করে আবিষ্কার করে ভালোবাসা । শাস্ত্রে বলে , আপনাকে জানো । আনন্দে আপনাকেই জানি আর-একজন যখন প্রেমে জেনেছে আমার আপনকে ।
