২
বাবা ছিলেন, কোনো নামজাদা ব্যাঙ্কের অন্যতম অধিনায়ক , তারই একজন অংশিদার হলেম আমি । যাকে বলে ঘুমিয়ে-পড়া অংশিদার একেবারেই তা নয় । আষ্টেপৃষ্ঠে লাগাম দিয়ে জুতে দিলে আমাকে আপিসের কাজে । আমার শরীর-মনের সঙ্গে এই কাজটা মানানসই নয় । ইচ্ছা ছিল , ফরেস্ট্ বিভাগে কোথাও পরিদর্শকের পদ দখল করে বসি , খোলা হাওয়ায় দৌড়ধাপ করি , শিকারের শখ নিই মিটিয়ে । বাবা তাকালেন প্রতিপত্তির দিকে ; বললেন , ‘ যে কাজ পাচ্ছ সেটা সহজে জোটে না বাঙালির ভাগ্যে । হার মানতে হল । তা ছাড়া মনে হয় , পুরুষের প্রতিপত্তি জিনিসটা মেয়েদের কাছে দামী । সুনেত্রার ভগ্নীপতি অধ্যাপক ; ইম্পীরিএল সার্ভিস তার , সেটাতে ওদের মেয়েমহলের মাথা উপরে তুলে রাখে । যদি জংলি ‘ নিস্পেকেট্টর সাহেব ‘ হয়ে সোলার হ্যাট প ‘ রে বাঘ-ভালুকের চামড়ায় মেঝে দিতুম ঢেকে , তাতে আমার দেহের গুরুত্ব কমিয়ে রাখত , সেই সঙ্গে কমাত আমার পদের গৌরব আর-পাঁচজন পদস্থ প্রতিবেশীর তুলনায় । কী জানি এই লাঘবতায় মেয়েদের আত্মাভিমান বুঝি কিছু ক্ষুণ্ন করে ।
এ দিকে ডেস্কে-বাঁধা স্থাবরত্বের চাপে দেখতে দেখতে আমার যৌবনের ধারা আসছে ভোঁতা হয়ে । অন্য কোনো পুরুষ হলে সে কথাটা নিশ্চিন্ত মনে ভুলে গিয়ে পেটের পরিধিবিস্তারকে দুর্বিপাক বলে গণ্য করত না । আমি তা পারি নে । আমি জানি , সুনেত্রা মুগ্ধ হয়েছিল শুধু আমার গুণে নয় , আমার দেহসৌষ্ঠবে । বিধাতার স্বরচিত যে বরমাল্য অঙ্গে নিয়ে একদিন তাকে বরণ করেছি নিশ্চিত তার প্রয়োজন আছে প্রতিদিনের অভ্যর্থনায় । আশ্চর্য এই যে , সুনেত্রার যৌবন আজও রইল অক্ষুণ্ন , দেখতে দেখতে আমিই চলেছি ভাঁটার মুখে — শুধু ব্যাঙ্কে জমছে টাকা ।
আমাদের মিলনের প্রথম অভ্যুদয়কে আর-একবার প্রত্যক্ষ চোখের সামনে আনল আমার মেয়ে অরুণা । আমাদের জীবনের সেই উষারুণরাগ দেখা দিয়েছে ওদের তারুণ্যের নবপ্রভাতে । দেখে পুলকিত হয়ে ওঠে আমার সমস্ত মন । শৈলেনের দিকে চেয়ে দেখি , আমার সেদিনকার বয়স ওর দেহে আবির্ভূত । যৌবনের সেই ক্ষিপ্রশক্তি , সেই অজস্র প্রফুল্লতা , আবার ক্ষণে ক্ষণে প্রতিহত দুরাশায় ম্লানায়মান উৎসাহের উৎকণ্ঠা । সেই দিন আমি যে পথে চলতেম সেই পথ ওরও সামনে , তেমনি করেই অরুণার মায়ের মন বশ করবার নানা উপলক্ষ ও সৃষ্টি করছে , কেবল যথেষ্ট লক্ষগোচর নই আমিই । অপর পক্ষে অরুণা জানে মনে মনে , তার বাবা বোঝে মেয়ের দরদ । এক-একদিন কী জানি কেন দুই চক্ষে অদৃশ্য অশ্রুর করুণা নিয়ে চুপ ক ‘ রে এসে বসে আমার পায়ের কাছের মোড়ায় । ওর মা নিষ্ঠুর হতে পারে , আমি পারি নে ।
অরুণার মনের কথা ওর মা যে বোঝে না তা নয় ; কিন্তু তার বিশ্বাস , এ-সমস্তই ‘ প্রভাতে মেঘডম্বরম্ ‘, বেলা হলেই যাবে মিলিয়ে । ঐখানেই সুনেত্রার সঙ্গে আমার মতের অনৈক্য । খিদে মিটতে না দিয়ে খিদে মেরে দেওয়া যায় না তা নয় , কিন্তু দ্বিতীয়বার যখন পাত পড়বে তখন হৃদয়ের রসনায় নবীন ভালোবাসার স্বাদ যাবে মরে । মধ্যাহ্নে ভোরের সুর লাগাতে গেলে আর লাগে না । অভিভাবক বলেন , বিবেচনা করবার বয়েস হোক আগে , তার পরে, ইত্যাদি । হায় রে , বিবেচনা করবার বয়েস ভালোবাসার বয়েসের উলটো পিঠে ।
কয়েকদিন আগেই এসেছিল ‘ ভরা বাদর মাহ ভাদর ‘ । ঘনবর্ষণের আড়ালে কলকাতার ইটকাঠের বাড়িগুলো এল মোলায়েম হয়ে , শহরের প্রখর মুখরতা অশ্রুগদ্গদ কণ্ঠস্বরের মতো হল বাষ্পাকুল । ওর মা জানত অরুণা আমার লাইব্রেরি ঘরে পরীক্ষার পড়ায় প্রবৃত্ত । একখানা বই আনতে গিয়ে দেখি , মেঘাচ্ছন্ন দিনান্তের সজল ছায়ায় জানলার সামনে সে চুপ করে বসে; তখনো চুল বাঁধে নি , পুবে হাওয়ায় বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে তার এলোচুলে ।
সুনেত্রাকে কিছু বললেম না । তখনি শৈলেনকে লিখে দিলেম চায়ের নিমন্ত্রণ-চিঠি । পাঠিয়ে দিলেম আমার মোটরগাড়ি ওদের বাড়িতে । শৈলেন এল , তার অকস্মাৎ আবির্ভাব সুনেত্রার পছন্দ নয় , সেটা বোঝা কঠিন ছিল না । আমি শৈলেনকে বললেম , “ গণিতে আমার যেটুকু দখল তাতে হাল আমলের ফিজিক্সের তল পাই নে , তাই তোমাকে ডেকে পাঠানো ; কোয়ান্টম থিওরিটা যথাসাধ্য বুঝে নিতে চাই , আমার সেকেলে বিদ্যেসাধ্যি অত্যন্ত বেশি অথর্ব হয়ে পড়েছে । ”
বলা বাহুল্য , বিদ্যাচর্চা বেশিদূর এগোয় নি । আমার নিশ্চিত বিশ্বাস অরুণা তার বাবার চাতুরি স্পষ্টই ধরেছে আর মনে মনে বলেছে , এমন আদর্শ বাবা অন্য কোনো পরিবারে আজ পর্যন্ত অবতীর্ণ হয় নি ।
কোয়ান্টম থিওরির ঠিক শুরুতেই বাজল টেলিফোনের ঘন্টা — ধড়ফড়িয়ে উঠে বললেম , “ জরুরি কাজের ডাক । তোমরা এক কাজ করো , ততক্ষণ পার্লার টেনিস খেলো , ছুটি পেলেই আবার আসব ফিরে । ”
টেলিফোনে আওয়াজ এল , “ হ্যালো , এটা কি বারোশো অমুক নম্বর । ”
আমি বললেম , “ না , এখানকার নম্বর সাতশো অমুক । ”
পরক্ষণেই নিচের ঘরে গিয়ে একখানা বাসি খবরের কাগজ তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করলেম , অন্ধকার হয়ে এল , দিলেম বাতি জ্বেলে ।
সুনেত্রা এল ঘরে । অত্যন্ত গম্ভীর মুখ । আমি হেসে বললেম , “ মিটিয়রলজিস্ট্ তোমার মুখ দেখলে ঝড়ের সিগ্ নাল দিত । ”
ঠাট্টায় যোগ না দিয়ে সুনেত্রা বললে , “ কেন তুমি শৈলেনকে অমন করে প্রশ্রয় দাও বারে বারে । ”
