এমন দুর্লভ সৌভাগ্যকেও সত্যবতী একদিন হারালেন । মৃত্যুর পূর্বে তাঁর স্বামী একটা কথা স্পষ্ট করে বুঝেছিলেন যে , তাঁর ঋণজড়িত সম্পত্তির ভার এমন কোনো পাকা লোকের হাতে দেওয়া দরকার যাঁর চালনার কৌশলে ফুটো নৌকাও পার হয়ে যাবে । এই উপলক্ষে সত্যবতী এবং তাঁর ছেলেটি সম্পূর্ণভাবে গিয়ে পড়লেন গোবিন্দর হাতে । গোবিন্দ প্রথম দিন থেকেই জানিয়ে দিলেন , সর্বাগ্রে এবং সকলের উপরে পয়সা । গোবিন্দর এই উপদেশের মধ্যে এমন একটা সুগভীর হীনতা ছিল যে , সত্যবতী লজ্জায় কুণ্ঠিত হত ।
তবু নানা আকারে আহারে-ব্যবহারে পয়সার সাধনা চলল । তা নিয়ে কথায় কথায় আলোচনা না ক ‘ রে তার উপরে যদি একটা আব্রু থাকত তা হলে ক্ষতি ছিল না । সত্যবতী মনে মনে জানতেন , এতে তাঁর ছেলের মনুষ্যত্ব খর্ব করা হয় — কিন্তু, সহ্য করা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না ; কেননা , যে চিত্তভাব সুকুমার , যার মধ্যে একটি অসামান্য মর্যাদা আছে , সেই সব চেয়ে অরক্ষিত ; তাকে আঘাত করা , বিদ্রূপ করা , সাধারণ রূঢ়স্বভাব মানুষের পক্ষে অত্যন্ত সহজ ।
শিল্পচর্চার জন্যে কিছু কিছু উপকরণ আবশ্যক । এতকাল সত্যবতী তা না চাইতেই পেয়েছেন , সেজন্যে কোনোদিন তাঁকে কুণ্ঠিত হতে হয় নি । সংসারযাত্রার পক্ষে এইসমস্ত অনাবশ্যক সামগ্রী , ব্যয়ের ফর্দে ধরে দিতে আজ যেন তাঁর মাথা কাটা যায় । তাই তিনি নিজের আহারের খরচ বাঁচিয়ে গোপনে শিল্পের সরঞ্জাম কিনিয়ে আনতেন । যা-কিছু কাজ করতেন সেও গোপনে দরজা বন্ধ করে । ভর্ৎসনার ভয়ে নয় , অরসিকের দৃষ্টিপাতের সংকোচে । আজ চুনি ছিল তাঁর শিল্প-রচনার একমাত্র দর্শক ও বিচারকারী । এই কাজে ক্রমে তার সহযোগিতাও ফুটে উঠল । তাকে লাগল বিষম নেশা । শিশুর এ অপরাধ ঢাকা পড়ে না , খাতার পাতাগুলো অতিক্রম ক ‘ রে দেয়ালের গায়ে পর্যন্ত প্রকাশ হতে থাকে । হাতে মুখে জামার হাতায় কলঙ্ক ধরা পড়ে । পয়সা-সাধনার বিরুদ্ধে ইন্দ্রদেব শিশুর চিত্তকেও প্রলুব্ধ করতে ছাড়েন না । খুড়োর হাতে অনেক দুঃখ তাকে পেতে হল ।
এক দিকে শাসন যতই বাড়াতে চলল আর-এক দিকে মা তাকে ততই অপরাধে সহায়তা করতে লাগলেন । আপিসের বড়োসাহেব মাঝে মাঝে আপিসের বড়োবাবুকে নিয়ে আপন কাজে মফস্বলে যেতেন , সেই সময়ে মায়েতে ছেলেতে মিলে অবাধ আনন্দ । একেবারে ছেলেমানুষির একশেষ! যে-সব জন্তুর মূর্তি হত বিধাতা এখনো তাদের সৃষ্টি করেন নি — বেড়ালের ছাঁচের সঙ্গে কুকুরের ছাঁচ যেত মিলে , এমন-কি মাছের সঙ্গে পাখির প্রভেদ ধরা কঠিন হত । এই-সমস্ত সৃষ্টিকার্য রক্ষা করবার উপায় ছিল না — বড়োবাবু ফিরে আসবার পূর্বেই এদের চিহ্ন লোপ করতে হত । এই দুজনের সৃষ্টিলীলায় ব্রহ্মা এবং রুদ্রই ছিলেন , মাঝখানে বিষ্ণুর আগমন হল না ।
শিল্পরচনাবায়ুর প্রকোপ সত্যবতীদের বংশে প্রবল ছিল । তারই প্রমাণ স্বরূপে সত্যবতীর চেয়ে বয়সে বড়ো তাঁরই এক ভাগনে রঙ্গলাল চিত্রবিদ্যায় হঠাৎ নামজাদা হয়ে উঠলেন । অর্থাৎ, দেশের রসিক লোক তাঁর রচনার অদ্ভুতত্ব দিয়ে খুব অট্টহাস্য জমালে । তারা যেরকম কল্পনা করে তার সঙ্গে তাঁর কল্পনার মিল হয় না দেখে তাঁর গুণপনার সম্বন্ধে তাদের প্রচণ্ড অবজ্ঞা হল । আশ্চর্য এই যে , এই অবজ্ঞার জমিতেই বিরোধ-বিদ্রূপের আবহাওয়ায় তাঁর খ্যাতি বেড়ে উঠতে লাগল ; যারা তাঁর যতই নকল করে তারাই উঠে পড়ে লাগল প্রমাণ করতে যে , লোকটা আর্টিস্ট্ হিসাবে ফাঁকি — এমন-কি , তার টেক্নিকে সুস্পষ্ট গলদ । এই পরমনিন্দিত চিত্রকর একদিন আপিসের বড়োবাবুর অবর্তমানে এলেন তাঁর মামির বাড়িতে । দ্বারে ধাক্কা মেরে মেরে ঘরে যখন প্রবেশলাভ করলেন, দেখলেন , মেঝেতে পা ফেলবার জো নেই । ব্যাপারখানা ধরা পড়ল । রঙ্গলাল বললেন , “ এতদিন পরে দেখা গেল , গুণীর প্রাণের ভিতর থেকে সৃষ্টিমূতি তাজা বেরিয়েছে, এর মধ্যে দাগা-বুলোনোর তো কোনো লক্ষণ নেই , যে বিধাতা রূপ সৃষ্টি করেন তাঁর বয়সের সঙ্গে ওর বয়সের মিল আছে । সব ছবিগুলো বে ‘ র করে আমাকে দেখাও । ”
কোথা থেকে বের করবে। যে গুণী রঙে রঙে ছায়ায় আলোয় আকাশে আকাশে চিত্র আঁকেন তিনি তাঁর কুহেলিকা-মরীচিকাগুলি যেখানে অকাতরে সরিয়ে ফেলেন , এদের কীর্তিগুলোও সেইখানেই গেছে । রঙ্গলাল মাথার দিব্যি দিয়ে তাঁর মামিকে বললেন , “ এবার থেকে তোমরা যা-কিছু রচনা করবে আমি এসে সংগ্রহ করে নিয়ে যাব । ”
বড়োবাবু এখনো আসেন নি । সকাল থেকে শ্রাবণের ছায়ায় আকাশ ধ্যানমগ্ন , বৃষ্টি পড়ছে ; বেলা ঘড়ির কাঁটার কোন্ সংকেতের কাছে তার ঠিকানা নেই , তার খোঁজ করতেও মন যায় না । আজ চুনিবাবু নৌকা-ভাসানোর ছবি আঁকতে লেগেছেন । নদীর ঢেউগুলো মকরের পাল , হাঁ করে নৌকাটাকে গিলতে চলেছে এমনিতরো ভাব ; আকাশের মেঘগুলোও যেন উপর থেকে চাদর উড়িয়ে উৎসাহ দিচ্ছে বলে বোধ হচ্ছে — কিন্তু মকরগুলো সর্বসাধারণের মকর নয় , আর মেঘগুলোকে ‘ ধূমজ্যোতিঃসলিলমরুতাং সন্নিবেশঃ ‘ বললে অত্যুক্তি করা হবে । এ কথাও সত্যের অনুরোধে বলা উচিত যে , এইরকমের নৌকো যদি গড়া হয় তা হলে ইন্সুয়োরেন্স্ আপিস কিছুতেই তার দায়িত্ব নিতে রাজি হবে না । চলল রচনা , আকাশের চিত্রীও যা-খুশি তাই করছেন , আর ঘরের মধ্যে ওই মস্ত-চোখ-মেলা ছেলেটিও তথৈবচ ।
