সন্ন্যাসী কহিলেন, “তোমার মঙ্গলের জন্য জিজ্ঞাসা করিতেছি, সে কে স্পষ্ট করিয়া বলো।”
কুসুম সবলে নিজের কোমল হাত দুটি পীড়ন করিয়া হাতজোড় করিয়া বলিল, “নিতান্ত সে কি বলিতেই হইবে।”
সন্ন্যাসী কহিলেন, “হাঁ, বলিতেই হইবে।”
কুসুম তৎক্ষণাৎ বলিয়া উঠিল, “প্রভু, সে তুমি।”
যেমনি তাহার নিজের কথা নিজের কানে গিয়া পৌঁছিল অমনি সে মূর্ছিত হইয়া আমার কঠিন কোলে পড়িয়া গেল। সন্ন্যাসী প্রস্তরের মূর্তির মতো দাঁড়াইয়া রহিলেন।
যখন মূর্ছা ভাঙিয়া কুসুম উঠিয়া বসিল তখন সন্ন্যাসী ধীরে ধীরে কহিলেন, “তুমি আমার সকল কথাই পালন করিয়াছ ; আর-একটি কথা বলিব, পালন করিতে হইবে। আমি আজই এখান হইতে চলিলাম ; আমার সঙ্গে তোমার দেখা না হয়। আমাকে তোমার ভুলিতে হইবে। বলো, এই সাধনা করিবে।”
কুসুম উঠিয়া দাঁড়াইয়া সন্ন্যাসীর মুখের পানে চাহিয়া ধীর স্বরে কহিল, “প্রভু, তাহাই হইবে।”
সন্ন্যাসী কহিলেন, “তবে আমি চলিলাম।”
কুসুম আর কিছু না বলিয়া তাঁহাকে প্রণাম করিল, তাঁহার পায়ের ধুলা মাথায় তুলিয়া লইল। সন্ন্যাসী চলিয়া গেলেন।
কুসুম কহিল, “তিনি আদেশ করিয়া গিয়াছেন তাঁহাকে ভুলিতে হইবে।” বলিয়া ধীরে ধীরে গঙ্গার জলে নামিল।
এতটুকু বেলা হইতে সে এই জলের ধারে কাটাইয়াছে, শ্রান্তির সময় এ জল যদি হাত বাড়াইয়া তাহাকে কোলে করিয়া না লইবে, তবে আর কে লইবে। চাঁদ অস্ত গেল, রাত্রি ঘোর অন্ধকার হইল। জলের শব্দ শুনিতে পাইলাম, আর কিছু বুঝিতে পারিলাম না। অন্ধকারে বাতাস হু হু করিতে লাগিল ; পাছে তিলমাত্র কিছু দেখা যায় বলিয়া সে যেন ফুঁ দিয়া আকাশের তারাগুলিকে নিবাইয়া দিতে চায়।
আমার কোলে যে খেলা করিত সে আজ তাহার খেলা সমাপন করিয়া আমার কোল হইতে কোথায় সরিয়া গেল, জানিতে পারিলাম না।
(কার্তিক ১২৯১)
চিত্রকর
ময়মনসিংহ ইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আমাদের গোবিন্দ এল কলকাতায় । বিধবা মায়ের অল্প কিছু সম্বল ছিল । কিন্তু , সব চেয়ে তার বড়ো সম্বল ছিল নিজের অবিচলিত সংকল্পের মধ্যে । সে ঠিক করেছিল , ‘ পয়সা’ করবই সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দিয়ে । সর্বদাই তার ভাষায় ধনকে সে উল্লেখ করত ‘ পয়সা ‘ বলে । অর্থাৎ , তার মনে খুব- একটা দর্শন স্পর্শন ঘ্রাণের যোগ্য প্রত্যক্ষ পদার্থ ছিল ; তার মধ্যে বড়ো নামের মোহ ছিল না ; অত্যন্ত সাধারণ পয়সা , হাটে হাটে হাতে হাতে ঘুরে ঘুরে ক্ষয়ে-যাওয়া , মলিন-হয়ে-যাওয়া পয়সা , তাম্রগন্ধী পয়সা , কুবেরের আদিম স্বরূপ , যা রুপোয় সোনায় কাগজে দলিলে নানা মূর্তি পরিগ্রহ করে মানুষের মনকে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে ।
নানা বাঁকা পথের ভিতর দিয়ে নানা পঙ্কে আবিল হতে হতে আজ গোবিন্দ তার পয়সাপ্রবাহিণীর প্রশস্তধারার পাকা বাঁধানো ঘাটে এসে পৌঁচেছে । গানিব্যাগ্ওয়ালা বড়োসাহেব ম্যাক্ডুগালের বড়োবাবুর আসনে তার ধ্রুব প্রতিষ্ঠা । সবাই তাকে নাম দিয়েছিল ম্যাক্দুলাল ।
গোবিন্দর পৈতৃব্য ভাই মুকুন্দ যখন উকিল-লীলা সংবরণ করলেন তখন একটি বিধবা স্ত্রী , একটি চার বছরের ছেলে , কলকাতায় একটি বাড়ি , কিছু জমা টাকা রেখে গেলেন লোকান্তরে । সম্পত্তির সঙ্গে কিছু ঋণও ছিল , সুতরাং তাঁর পরিবারের অন্নবস্ত্রের সংস্থান বিশেষ ব্যয়সংক্ষেপের উপর নির্ভর করত । এই কারণে তাঁর ছেলে চুনিলাল যে-সমস্ত উপকরণের মধ্যে মানুষ , প্রতিবেশীদের সঙ্গে তুলনায় সেগুলি খ্যাতিযোগ্য নয় ।
মুকুন্দদাদার উইল-অনুসারে এই পরিবারের সম্পূর্ণ ভার পড়েছিল গোবিন্দর ‘ পরে । গোবিন্দ শিশুকাল থেকে ভ্রাতুষ্পুত্রের কানে মন্ত্র দিলে — ‘ পয়সা করো । ‘
ছেলেটির দীক্ষার পথে প্রধান বাধা দিলেন তাঁর মা সত্যবতী । স্পষ্ট কথায় তিনি কিছু বলেন নি , বাধাটা ছিল তাঁর ব্যবহারে । শিশুকাল থেকেই তাঁর বাতিক ছিল শিল্পকাজে । ফুল ফল পাতা নিয়ে , খাবারের জিনিস নিয়ে , কাগজ কেটে , কাপড় কেটে , মাটি দিয়ে , ময়দা দিয়ে , জামের রস ফলসার রস জবার রস শিউলিবোঁটার রস দিয়ে নানা অভূতপূর্ব অনাবশ্যক জিনিস-রচনায় তাঁর আগ্রহের অন্ত ছিল না । এতে তাঁকে দুঃখও পেতে হয়েছে । কেননা , যা অদরকারি , যা অকারণ , তার বেগ আষাঢ়ের আকস্মিক বন্যাধারার মতো — সচলতা অত্যন্ত বেশি, কিন্তু দরকারি কাজের খেয়া বাইবার পক্ষে অচল । মাঝে মাঝে এমনও হয়েছে, জ্ঞাতিবাড়িতে নিমন্ত্রণ , সত্যবতী ভুলেই গেছেন , শোবার ঘরে দরজা বন্ধ , একতাল মাটি চটকে বেলা কাটছে । জ্ঞাতিরা বললে , বড়ো অহংকার! সন্তোষজনক জবাব দেবার জো নেই । এ-সব কাজেও ভালোমন্দর যে মূল্যবিচার চলে , সেটা বইপড়া বিদ্যার যোগেই মুকুন্দ জানতেন । আর্ট্ শব্দটার মাহাত্ম্যে শরীর রোমাঞ্চিত হত । কিন্তু , তাঁর আপন গৃহিণীর হাতের কাজেও যে এই শব্দটার কোনো স্থান আছে এমন কথা মনে করতেই পারতেন না । এই মানুষটির স্বভাবটিতে কোথাও কাঁটাখোঁচা ছিল না । তাঁর স্ত্রী অনাবশ্যক খেয়ালে অযথা সময় নষ্ট করেন , এটা দেখে তাঁর হাসি পেত , সে হাসি স্নেহরসে ভরা । এ নিয়ে সংসারের লোক কেউ যদি কটাক্ষ করত তিনি তখনই তার প্রতিবাদ করতেন । মুকুন্দর স্বভাবে অদ্ভুত একটা আত্মবিরোধ ছিল — ওকালতির কাজে ছিলেন প্রবীণ , কিন্তু ঘরের কাজে বিষয়বুদ্ধি ছিল না বললেই হয় । পয়সা তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে যথেষ্ট বইত , কিন্তু ধ্যানের মধ্যে আটকা পড়ত না । সেইজন্য মনটা ছিল মুক্ত ; অনুগত লোকদের ‘ পরে নিজের ইচ্ছে চালাবার জন্যে কখনো দৌরাত্ম্য করতে পারতেন না । জীবনযাত্রার অভ্যাস ছিল খুব সাদাসিধা , নিজের স্বার্থ বা সেবা নিয়ে পরিজনদের ‘ পরে কোনোদিন অযথা দাবি করেন নি । সংসারের লোকে সত্যবতীর কাজে শৈথিল্য নিয়ে কটাক্ষ করলে মুকুন্দ তখনই সেটা থামিয়ে দিতেন । মাঝে মাঝে আদালত থেকে ফেরবার পথে রাধাবাজার থেকে কিছু রঙ , কিছু রঙিন রেশম , রঙের পেনসিল কিনে এনে সত্যবতীর অজ্ঞাতসারে তাঁর শোবার ঘরে কাঠের সিন্ধুকটার ‘ পরে সাজিয়ে রেখে আসতেন । কোনোদিন বা সত্যবতীর আঁকা একটা ছবি তুলে দিয়ে বলতেন , “ বা , এ তো বড়ো সুন্দর হয়েছে । ” একদিন একটা মানুষের ছবিকে উলটিয়ে ধরে তার পা দুটোকে পাখির মুণ্ড বলে স্থির করলেন ; বললেন , “ সতু , এটা কিন্তু বাঁধিয়ে রাখা চাই — বকের ছবি যা হয়েছে চমৎকার! ” মুকুন্দ তাঁর স্ত্রীর চিত্ররচনায় ছেলেমানুষি কল্পনা করে মনে মনে যে-রসটুকু পেতেন , স্ত্রীও তাঁর স্বামীর চিত্রবিচার থেকে ভোগ করতেন সেই একই রস । সত্যবতী মনে নিশ্চিত জানতেন , বাংলাদেশের আর-কোনো পরিবারে তিনি এত ধৈর্য , এত প্রশ্রয়, আশা করতে পারতেন না । শিল্পসাধনায় তাঁর এই দুর্নিবার উৎসাহকে কোনো ঘরে এত দরদের সঙ্গে পথ ছেড়ে দিত না । এইজন্যে যেদিন তাঁর স্বামী তাঁর কোনো রচনা নিয়ে অদ্ভুত অত্যুক্তি করতেন সেদিন সত্যবতী যেন চোখের জল সামলাতে পারতেন না ।
