জ্যাঠাইমা শান্ত মুখে কহিলেন , “ তা বেশ হয়েছে, বাপু , কিন্তু তুমি একটু ঠাণ্ডা হও । ” তাঁহার পক্ষে এটা কিছুই আশাতীত হয় নাই । যদি কমলার জন্য এক দিক হইতে কাবুলের আমীর ও অন্য দিক হইতে চীনের সম্রাট তাঁহার দ্বারস্থ হইত তিনি আশ্চর্য হইতেন না ।
ক্ষীণাশ্বাস যজ্ঞেশ্বর বিভূতিভূষণের হাত ধরিয়া বলিতে লাগিলেন , “ দেখো বাবা , আমার সকল দিক যেন নষ্ট না হয় । ”
বিবাহের প্রস্তাব পাকা করিয়া বিভূতিভূষণ তাঁহার বাপের কাছে আসিয়া উপস্থিত হইলেন ।
গৌরসুন্দর নিজে নিরক্ষর ছিলেন বলিয়া শিক্ষিত ছেলেটিকে মনে মনে বিশেষ খাতির করিতেন । তাঁহার কোনো আচরণে বা মতে পাছে তাঁহার ছেলের কাছে সুশিক্ষা বা শিষ্টতার অভাব ধরা পড়ে এই সংকোচ তিনি দূর করিতে পারিতেন না । তাঁহার একমাত্র প্রাণাধিক পুত্র যেন বাপকে মনে মনে ধিক্কার না দেয় , যেন অশিক্ষিত বাপের জন্য তাহাকে লজ্জিত না হইতে হয় , এ চেষ্টা তাঁহার সর্বদা ছিল । কিন্তু তবু যখন শুনিলেন বিভূতি দরিদ্রকন্যাকে বিবাহ করিতে উদ্যত , তখন প্রথমটা রাগ প্রকাশ করিয়া উঠিলেন । বিভূতি নতশিরে চুপ করিয়া রহিল । তখন গৌরসুন্দর কিঞ্চিৎ শান্ত হইয়া নিজেকে সংশোধন করিয়া লইয়া কহিলেন , “ আমি কি পণের লোভে তোমাকে বিবাহ করিতে বলিতেছি । তা মনে করিয়ো না । নিজের ছেলেকে লইয়া বেহাইয়ের সঙ্গে দরদস্তুর করিতে বসিব , আমি তেমন ছোটোলোক নই । কিন্তু বড়ো ঘরের মেয়ে চাই । ”
বিভূতিভূষণ বুঝাইয়া দিলেন , যজ্ঞেশ্বর সম্ভ্রান্তবংশীয় , সম্প্রতি গরিব হইয়াছেন ।
গৌরসুন্দর দায়ে পড়িয়া মত দিলেন। কিন্তু মনে মনে যজ্ঞেশ্বরের প্রতি অত্যন্ত রাগ করিলেন ।
তখন দুই পক্ষে কথাবার্তা চলিতে লাগিল । আর-সব ঠিক হইল কিন্তু বিবাহ হইবে কোথায় তাহা লইয়া কিছুতেই নিষ্পত্তি হয় না । গৌরসুন্দর এক ছেলের বিবাহে খুব ধুমধাম করিতে চান , কিন্তু বুড়াশিবতলার সেই খোড়ো ঘরে সমস্ত ধুমধাম ব্যর্থ হইয়া যাইবে । তিনি জেদ করিলেন , তাঁহারই বাড়িতে বিবাহসভা হইবে ।
শুনিয়া মাতৃহীনা কন্যার দিদিমা কান্না জুড়িয়া দিলেন । তাঁহাদেরও তো এক সময় সুদিন ছিল , আজ লক্ষ্মী বিমুখ হইয়াছেন বলিয়া কি সমস্ত সাধ জলাঞ্জলি দিতে হইবে , পিতৃপুরুষের মান বজায় থাকিবে না ? সে হইবে না ; আমাদের ঘর খোড়ো হউক আর যাই হউক , এইখানেই বিবাহ দিতে হইবে ।
নিরীহপ্রকৃতি যজ্ঞেশ্বর অত্যন্ত দ্বিধায় পড়িয়া গেলেন । অবশেষে বিভূতিভূষণের চেষ্টায় কন্যাগৃহেই বিবাহ স্থির হইল ।
ইহাতে গৌরসুন্দর এবং তাঁহার দলবল কন্যাকর্তার উপর আরো চটিয়া গেলেন । সকলেই স্থির করিলেন , স্পর্ধিত দরিদ্রকে অপদস্থ করিতে হইবে । বরযাত্র যাহা জোটানো হইল তাহা পল্টনবিশেষ । এ সম্বন্ধে গৌরসুন্দর ছেলের কোনো পরামর্শ লইলেন না ।
বৈশাখ মাসে বিবাহের দিন স্থির হইল । যজ্ঞেশ্বর তাহার স্বল্পাবশিষ্ট যথাসর্বস্ব পণ করিয়া আয়োজন করিয়াছে । নূতন আটচালা বাঁধিয়াছে , পাবনা হইতে ঘি ময়দা চিনি দধি প্রভৃতি আনাইয়াছে । জ্যাঠাইমা তাঁহার যে গোপন পুঁজির বলে স্বগৃহেই বিবাহপ্রস্তাবে জেদ করিয়াছিলেন তাহার প্রায় শেষ পয়সাটি পর্যন্ত বাহির করিয়া দিয়াছেন ।
এমন সময় দুর্ভাগার অদৃষ্টক্রমে বিবাহের দুই দিন আগে হইতে প্রচণ্ড দুর্যোগ আরম্ভ হইল । ঝড় যদি-বা থামে তো বৃষ্টি থামে না , কিছুক্ষণের জন্য যদি-বা নরম পড়িয়া আসে আবার দ্বিগুণ বেগে আরম্ভ হয় । এমন বর্ষণ বিশ পঁচিশ বছরের মধ্যে কেহ দেখে নাই ।
গৌরসুন্দর পূর্ব হইতেই গুটিকতক হাতি ও পালকি স্টেশনে হাজির রাখিয়াছিলেন । আশপাশের গ্রাম হইতে যজ্ঞেশ্বর ছইওয়ালা গোরুর গাড়ির জোগাড় করিতে লাগিলেন । দুর্দিনে গাড়োয়ানরা নড়িতে চায় না , হাতে পায়ে ধরিয়া দ্বিগুণ মূল্য কবুল করিয়া যজ্ঞেশ্বর তাহাদের রাজি করিলেন । বরযাত্রের মধ্যে যাহাদিগকে গোরুর গাড়িতে চড়িতে হইল তাহারা চটিয়া আগুন হইল ।
গ্রামের পথে জল দাঁড়াইয়া গেছে । হাতির পা বসিয়া যায় , গাড়ির চাকা ঠেলিয়া তোলা দায় হইল । তখনও বৃষ্টির বিরাম নাই । বরযাত্রগণ ভিজিয়া, কাদা মাখিয়া, বিধিবিড়ম্বনার প্রতিশোধ কন্যাকর্তার উপর তুলিবে বলিয়া মনে মনে স্থির করিয়া রাখিল । হতভাগ্য যজ্ঞেশ্বরকে এই অসাময়িক বৃষ্টির জন্য জবাবদিহি করিতে হইবে ।
বর সদলবলে কন্যাকর্তার কুটিরে আসিয়া পৌঁছিলেন । অভাবনীয় লোকসমাগম দেখিয়া গৃহস্বামীর বুক দমিয়া গেল । ব্যাকুল যজ্ঞেশ্বর কাহাকে কোথায় বসাইবেন ভাবিয়া পান না , কপালে করাঘাত করিয়া কেবলই বলিতে থাকেন , “ বড়ো কষ্ট দিলাম বড়ো কষ্ট দিলাম । ” যে আটচালা বানাইয়াছিলেন তাহার চারি দিক হইতে জল পড়িতেছে । বৈশাখ মাসে যে এমন শ্রাবণধারা বহিবে তাহা তিনি স্বপ্নেও আশঙ্কা করেন নাই । গণ্ডগ্রামের ভদ্র অভদ্র সমস্ত লোকই যজ্ঞেশ্বরকে সাহায্য করিতে উপস্থিত হইয়াছিল ; সংকীর্ণ স্থানকে তাহারা আরো সংকীর্ণ করিয়া তুলিল এবং বৃষ্টির কল্লোলের উপর তাহাদের কলরব যোগ হইয়া একটি সমুদ্রমন্থনের মতো গোলমালের উৎপত্তি হইল । পল্লীবৃদ্ধগণ ধনী অতিথিদের সম্মাননার উপযুক্ত উপায় না দেখিয়া যাহাকে-তাহাকে ক্রমাগতই জোড়হস্তে বিনয় করিয়া বেড়াইতে লাগিল ।
বরকে যখন অন্তঃপুরে লইয়া গেল তখন ক্রুদ্ধ বরযাত্রীর দল রব তুলিল , তাহাদের ক্ষুধা পাইয়াছে , আহার চাই । মুখ পাংশুবর্ণ করিয়া যজ্ঞেশ্বর গলায় কাপড় দিয়া সকলকে বলিলেন , “ আমার সাধ্যমত যাহা-কিছু আয়োজন করিয়াছিলাম সব জলে ভাসিয়া গেছে । ”
