অনেকক্ষণ পরে মৃদু শব্দে সচকিত হইয়া মুখ তুলিয়া দেখিলেন। তাঁহার সম্মুখে রুপার থালায় ফলমূলমিষ্টান্ন রাখিয়া গিরিবালা অদূরে দাঁড়াইয়া নীরবে অপেক্ষা করিতেছিল। তিনি মস্তক তুলিতেই নিরাভরণা শুভ্রবসনা বিধবাবেশধারিণী গিরিবালা তাঁহাকে নতজানু হইয়া ভূমিষ্ঠ প্রণাম করিল।
বিধবা উঠিয়া দাঁড়াইয়া যখন শীর্ণমুখ ম্লানবর্ণ ভগ্নশরীর শশিভূষণের দিকে সকরুণ স্নিগ্ধনেত্রে চাহিয়া দেখিল, তখন তাহার দুই চক্ষু ঝরিয়া, দুই কপোল বাহিয়া অশ্রু পড়িতে লাগিল।
শশিভূষণ তাহাকে কুশলপ্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে চেষ্টা করিলেন কিন্তু ভাষা খুঁজিয়া পাইলেন না; নিরুদ্ধ অশ্রুবাষ্প তাঁহার বাক্যপথ সবলে অবরোধ করিল, কথা এবং অশ্রু উভয়েই নিরুপায়ভাবে হৃদয়ের মুখে কণ্ঠের দ্বারে বদ্ধ হইয়া রহিল। সেই কীর্তনের দল ভিক্ষা সংগ্রহ করিতে করিতে অট্টালিকার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল এবং পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করিয়া গাহিতে লাগিল-এসো এসো হে !
আশ্বিন-কার্তিক, ১৩০১ বঃ
যজ্ঞেশ্বরের যজ্ঞ
এক সময় যজ্ঞেশ্বরের অবস্থা ভালোই ছিল । এখন প্রাচীন ভাঙা কোঠাবাড়িটাকে সাপ – ব্যাঙ-বাদুড়ের হস্তে সমর্পণ করিয়া খোড়ো ঘরে ভগবদগীতা লইয়া কালযাপন করিতেছেন ।
এগারো বৎসর পূর্বে তাঁহার মেয়েটি যখন জন্মিয়াছিল তখন বংশের সৌভাগ্যশশী কৃষ্ণপক্ষের শেষকলায় আসিয়া ঠেকিয়াছে । সেইজন্য সাধ করিয়া মেয়ের নাম রাখিয়াছিলেন কমলা । ভাবিয়াছিলেন , যদি এই কৌশলে ফাঁকি দিয়া চঞ্চলা লক্ষ্মীকে কন্যারূপে ঘরে ধরিয়া রাখিতে পারেন । লক্ষ্মী সে ফন্দিতে ধরা দিলেন না , কিন্তু মেয়েটির মুখে নিজের শ্রী রাখিয়া গেলেন । বড়ো সুন্দরী মেয়ে ।
মেয়েটির বিবাহ সম্বন্ধে যজ্ঞেশ্বরের যে খুব উচ্চ আশা ছিল তাহা নহে । কাছাকাছি যে-কোনো একটি সৎপাত্রে বিবাহ দিতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন । কিন্তু তাঁহার জ্যাঠাইমা তাঁহার বড়ো আদরের কমলাকে বড়ো ঘর না হইলে দিবেন না , পণ করিয়া বসিয়া আছেন । তাঁহার নিজের হাতে অল্প – কিছু সংগতি ছিল , ভালো পাত্র পাইলে তাহা বাহির করিয়া দিবেন , স্থির করিয়াছেন ।
অবশেষে জ্যাঠাইমার উত্তেজনায় শাস্ত্রাধ্যয়নগুঞ্জিত শান্ত পল্লীগৃহ ছাড়িয়া যজ্ঞেশ্বর পাত্রসন্ধানে বাহির হইলেন । রাজশাহিতে তাঁহার এক আত্মীয় উকিলের বাড়িতে গিয়া আশ্রয় লইলেন ।
এই উকিলের মক্কেল ছিলেন জমিদার গৌরসুন্দর চৌধুরী । তাঁহার একমাত্র পুত্র বিভূতিভূষণ এই উকিলের অভিভাবকতায় কলেজে পড়াশুনা করিত । ছেলেটি কখন যে মেয়েটিকে আসিয়া দেখিয়াছিল তাহা ভগবান প্রজাপতিই জানিতেন ।
কিন্তু প্রজাপতির চক্রান্ত যজ্ঞেশ্বরের বুঝিবার সাধ্য ছিল না । তাই বিভূতি সম্বন্ধে তাঁহার মনে কোনোপ্রকার দুরাশা স্থান পায় নাই । নিরীহ যজ্ঞেশ্বরের অল্প আশা , অল্প সাহস ; বিভূতির মতো ছেলে যে তাঁহার জামাই হইতে পারে এ তাঁহার সম্ভব বলিয়া বোধ হইল না ।
উকিলের যত্নে একটি চলনসই পাত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে । তাহার বুদ্ধিশুদ্ধি না থাক্ বিষয়-আশয় আছে । পাস একটিও দেয় নাই বটে কিন্তু কালেক্টরিতে ৩২৭৫ টাকা খাজনা দিয়া থাকে ।
পাত্রের দল একদিন আসিয়া মেয়েটিকে পছন্দ করিয়া ক্ষীরের ছাঁচ , নারিকেলের মিষ্টান্ন ও নাটোরের কাঁচাগোল্লা খাইয়া গেল । বিভূতি তাহার অনতিকাল পরে আসিয়া খবর শুনিলেন । যজ্ঞেশ্বর মনের আনন্দে তাঁহাকেও কাঁচাগোল্লা খাওয়াইতে উদ্যত হইলেন । কিন্তু ক্ষুধার অত্যন্ত অভাব জানাইয়া বিভূতি কিছু খাইল না । কাহারো সহিত ভালো করিয়া কথাই কহিল না , বাড়ি চলিয়া গেল ।
সেইদিনই সন্ধ্যাবেলায় উকিলবাবু বিভূতির কাছ হইতে এক পত্র পাইলেন । মর্মটা এই , যজ্ঞেশ্বরের কন্যাকে তাহার বড়ো পছন্দ এবং তাহাকে সে বিবাহ করিতে উৎসুক ।
উকিল ভাবিলেন , ‘ এ তো বিষম মুশকিলে পড়িলাম । গৌরসুন্দরবাবু ভাবিবেন , আমিই আমার আত্মীয়কন্যার সহিত তাঁহার ছেলের বিবাহের চক্রান্ত করিতেছি । ‘
অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া তিনি যজ্ঞেশ্বরকে দেশে পাঠাইলেন , এবং পূর্বোক্ত পাত্রটির সহিত বিবাহের দিন যথাসম্ভব নিকটবর্তী করিয়া দিলেন । বিভূতিকে ডাকিয়া অভিভাবকমহাশয় পড়াশুনা ছাড়া আর-কোনো দিকে মন দিতে বিশেষ করিয়া নিষেধ করিলেন । শুনিয়া রাগে বিভূতির জেদ চার গুণ বাড়িয়া গেল ।
বিবাহের আয়োজন উদ্যোগ চলিতেছে এমন সময় একদিন যজ্ঞেশ্বরের খোড়ো ঘরে বিভূতিভূষণ স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত ।
যজ্ঞেশ্বর ব্যস্ত হইয়া কহিলেন , “ এসো, বাবা , এসো । ” কিন্তু কোথায় বসাইবেন , কী খাওয়াইবেন , কিছুই ভাবিয়া পাইলেন না । এখানে নাটোরের কাঁচাগোল্লা কোথায়।
বিভূতিভূষণ যখন স্নানের পূর্বে রোয়াকে বসিয়া তেল মাখিতেছেন তখন জ্যাঠাইমা তাঁহার রজতগিরিনিভ গৌর পুষ্ট দেহটি দেখিয়া মুগ্ধ হইলেন । যজ্ঞেশ্বরকে ডাকিয়া কহিলেন , “ এই ছেলেটির সঙ্গে আমাদের কমলের বিবাহ হয় না কি । ”
“ ভীরু যজ্ঞেশ্বর বিস্ফারিত নেত্রে কহিলেন , সে কি হয়! ”
জ্যাঠাইমা কহিলেন , “ কেন হইবে না । চেষ্টা করিলেই হয় । ” এই বলিয়া তিনি বাথানপাড়ার গোয়ালাদের ঘর হইতে ভালো ছানা ও ক্ষীর আনাইয়া বিবিধ আকার ও আয়তনের মোদক-নির্মাণে প্রবৃত্ত হইলেন ।
স্নানাহারের পর বিভূতিভূষণ সলজ্জে সসংকোচে নিজের বিবাহের প্রস্তাব উত্থাপন করিলেন । যজ্ঞেশ্বর আনন্দে ব্যাকুল হইয়া জ্যাঠাইমাকে সুসংবাদ দিলেন ।
