দ্রব্যসামগ্রী কতক পাবনা হইতে পথের মধ্যে কতক-বা ভগ্নপ্রায় পাকশালায় গলিয়া গুলিয়া উনান নিবিয়া একাকার হইয়া গেছে । সহসা উপযুক্ত পরিমাণ আহার্য সংগ্রহ করা যাইতে পারে বুড়াশিবতলা এমন গ্রামই নহে ।
গৌরসুন্দর যজ্ঞেশ্বরের দুর্গতিতে খুশি হইলেন । কহিলেন , “ এতগুলা মানুষকে তো অনাহারে রাখা যায় না , কিছু তো উপায় করিতে হইবে । ”
বরযাত্রগণ খেপিয়া উঠিয়া মহা হাঙ্গামা করিতে লাগিল । কহিল , “ আমরা স্টেশনে গিয়া ট্রেন ধরিয়া এখনই বাড়ি ফিরিয়া যাই । ”
যজ্ঞেশ্বর হাত জোড় করিয়া কহিলেন , “ একেবারে উপবাস নয় । শিবতলার ছানা বিখ্যাত । উপযুক্ত পরিমাণে ছানা কদমা সংগ্রহ আছে । আমার অন্তরের মধ্যে যাহা হইতেছে তাহা অন্তর্যামীই জানেন । ”
যজ্ঞেশ্বরের দুর্গতি দেখিয়া বাথানপাড়ার গোয়ালারা বলিয়াছিল , “ ভয় কী ঠাকুর , ছানা যিনি যত খাইতে পারেন আমরা জোগাইয়া দিব । ” বিদেশের বরযাত্রীগণ না খাইয়া ফিরিলে শিবতলা গ্রামের অপমান ; সেই অপমান ঠেকাইবার জন্য গোয়ালারা প্রচুর ছানার বন্দোবস্ত করিয়াছে ।
বরযাত্রগণ পরামর্শ করিয়া জিজ্ঞাসা করিল , “ যত আবশ্যক ছানা জোগাইতে পারিবে তো ? ”
যজ্ঞেশ্বর কথঞ্চিৎ আশান্বিত হইয়া কহিল , “ তা পারিব । ” “ আচ্ছা, তবে আনো ” বলিয়া বরযাত্রগণ বসিয়া গেল । গৌরসুন্দর বসিলেন না , তিনি নীরবে এক প্রান্তে দাঁড়াইয়া কৌতুক দেখিতে লাগিলেন ।
আহারস্থানের চারিদিকেই পুষ্করিণী ভরিয়া উঠিয়া জলে কাদায় একাকার হইয়া গেছে । যজ্ঞেশ্বর যেমন- যেমন পাতে ছানা দিয়া যাইতে লাগিলেন তৎক্ষণাৎ বরযাত্রগণ তাহা কাঁধ ডিঙাইয়া পশ্চাতে কাদার মধ্যে টপ্ টপ্ করিয়া ফেলিয়া দিতে লাগিল ।
উপায়বিহীন যজ্ঞেশ্বরের চক্ষু জলে ভাসিয়া গেল । বারংবার সকলের কাছে জোড়হাত করিতে লাগিলেন ; কহিলেন , “ আমি অতি ক্ষুদ্র ব্যক্তি , আপনাদের নির্যাতনের যোগ্য নই । ”
একজন শুস্কহাষ্য হাসিয়া উত্তর করিল , “ মেয়ের বাপ তো বটেন , সে অপরাধ যায় কোথায় । ” যজ্ঞেশ্বরের স্বগ্রামের বৃদ্ধগণ বারবার ধিক্কার করিয়া বলিতে লাগিল , “ তোমার যেমন অবস্থা সেইমত ঘরে কন্যাদান করিলেই এ দুর্গতি ঘটিত না । ”
এ দিকে অন্তঃপুরে মেয়ের দিদিমা অকল্যাণশঙ্কাসত্ত্বেও অশ্রু সংবরণ করিতে পারিলেন না । দেখিয়া মেয়ের চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল । যজ্ঞেশ্বরের জ্যাঠাইমা আসিয়া বিভূতিকে কহিলেন , “ ভাই , অপরাধ যা হইবার তা তো হইয়া গেছে , এখন মাপ করো , আজিকার মতো শুভকর্ম সম্পন্ন হইতে দাও । ”
এ দিকে ছানার অন্যায় অপব্যয় দেখিয়া গোয়ালার দল রাগিয়া হাঙ্গামা করিতে উদ্যত । পাছে বরযাত্রদের সহিত তাহাদের একটা বিবাদ বাধিয়া যায় এই আশঙ্কায় যজ্ঞেশ্বর তাহাদিগকে ঠাণ্ডা করিবার জন্য বহুতর চেষ্টা করিতে লাগিলেন । এমন সময় ভোজনশালায় অসময়ে বর আসিয়া উপস্থিত । বরযাত্ররা ভাবিল , বর বুঝি রাগ করিয়া অন্তঃপুর হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছেন; তাহাদের উৎসাহ বাড়িয়া উঠিল ।
বিভূতি রুদ্ধকন্ঠে কহিলেন , “ বাবা , আমাদের এ কিরকম ব্যবহার । ” বলিয়া একটা ছানার থালা স্বহস্তে লইয়া তিনি পরিবেশনে প্রবৃত্ত হইলেন । গোয়ালাদিগকে বলিলেন , “ তোমরা পশ্চাৎ দাঁড়াও , কাহারো ছানা যদি পাঁকে পড়ে তো সেগুলা আবার পাতে তুলিয়া দিতে হইবে । ”
গৌরসুন্দরের মুখের দিকে চাহিয়া দুই-একজন উঠিবে কি না ইতস্তত করিতেছিল — বিভূতি কহিলেন , “ বাবা , তুমিও বসিয়া যাও , অনেক রাত হইয়াছে । ”
গৌরসুন্দর বসিয়া গেলেন । ছানা যথাস্থানে পৌঁছিতে লাগিল ।
রাজটিকা
নবেন্দুশেখরের সহিত অরুণলেখার যখন বিবাহ হইল তখন হোমধূমের অন্তরাল হইতে ভগবান প্রজাপতি ঈষৎ একটু হাস্য করিলেন। হায়, প্রজাপতির পক্ষে যাহা খেলা আমাদের পক্ষে তাহা সকল সময়ে কৌতুকের নহে।
নবেন্দুশেখরের পিতা পূর্ণেন্দুশেখর ইংরাজরাজ-সরকারে বিখ্যাত। তিনি এই ভবসমুদ্রে কেবলমাত্র দ্রুতবেগে সেলাম-চালনা দ্বারা রায়বাহাদুর পদবীর উত্তুঙ্গ মরুকূলে উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন; আরো দুর্গমতর সম্মানপথের পাথেয় তাঁহার ছিল, কিন্তু পঞ্চান্ন বৎসর বয়ঃক্রমকালে অনতিদূরবর্তী রাজখেতাবের কুহেলিকাচ্ছন্ন গিরিচূড়ার প্রতি করুণ লোলুপ দৃষ্টি স্থিরনিবদ্ধ করিয়া এই রাজানুগৃহীত ব্যক্তি অকস্মাৎ খেতাববর্জিত-লোকে গমন করিলেন এবং তাঁহার বহু-সেলাম-শিথিল গ্রীবাগ্রন্থি শ্মশানশয্যায় বিশ্রাম লাভ করিল।
কিন্তু, বিজ্ঞানে বলে, শক্তির স্থানান্তর ও রূপান্তর আছে, নাশ নাই— চঞ্চলা লক্ষ্মীর অচঞ্চলা সখী সেলামশক্তি পৈতৃক স্কন্ধ হইতে পুত্রের স্কন্ধে অবতীর্ণ হইলেন, এবং নবেন্দুর নবীন মস্তক তরঙ্গতাড়িত কুষ্মাণ্ডের মতো ইংরাজের দ্বারে দ্বারে অবিশ্রাম উঠিতে পড়িতে লাগিল।
নিঃসন্তান অবস্থায় ইঁহার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু হইলে যে পরিবারে ইনি দ্বিতীয় দারপরিগ্রহ করিলেন সেখানকার ইতিহাস ভিন্নপ্রকার।
সে পরিবারের বড়োভাই প্রমথনাথ পরিচিতবর্গের প্রীতি এবং আত্মীয়বর্গের আদরের স্থল ছিলেন। বাড়ির লোকে এবং পাড়ার পাঁচজনে তাঁহাকে সর্ববিষয়ে অনুকরণস্থল বলিয়া জানিত।
প্রমথনাথ বিদ্যায় বি.এ. এবং বুদ্ধিতে বিচক্ষণ ছিলেন, কিন্তু মোটা মাহিনা বা জোর কলমের ধার ধারিতেন না; মুরুব্বির বলও তাঁহার বিশেষ ছিল না, কারণ, ইংরাজ তাঁহাকে যে পরিমাণ দূরে রাখিত তিনিও তাহাকে সেই পরিমাণ দূরে রাখিয়া চলিতেন। অতএব, গৃহকোণে এবং পরিচিতমণ্ডলীর মধ্যেই প্রমথনাথ জাজ্বল্যমান ছিলেন, দুরস্থ লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার কোনো ক্ষমতা তাঁহার ছিল না।
