সন্ধ্যাবেলায় হরকুমারবাবু কলিকাতা হইতে ফিরিয়া আসিয়া যতীনকে দেখিয়া কহিলেন , “ এই-যে , যতীন আসিয়াছ , ভালোই হইয়াছে । তোমাকে একটু ডাক্তারি করিতে হইবে । পশ্চিমে থাকিতে দুর্ভিক্ষের সময় আমরা একটি মেয়েকে লইয়া মানুষ করিতেছি — পটল তাহাকে কুড়ানি বলিয়া ডাকে । উহার বাপ-মা এবং ঐ মেয়েটি আমাদের বাংলার কাছে একটি গাছতলায় পড়িয়া ছিল । যখন খবর পাইয়া গেলাম গিয়া দেখি , উহার বাপ-মা মরিয়াছে , মেয়েটির প্রাণটুকু আছে মাত্র । পটল তাহাকে অনেক যত্নে বাঁচাইয়াছে । উহার জাতের কথা কেহ জানে না — তাহা লইয়া কেহ আপত্তি করিলেই পটল বলে , ‘ ও তো দ্বিজ ; একবার মরিয়া এবার আমাদের ঘরে জন্মিয়াছে , উহার সাবেক জাত কোথায় ঘুচিয়া গেছে । ‘ প্রথমে মেয়েটি পটলকে মা বলিয়া ডাকিতে শুরু করিয়াছিল ; পটল ধমক দিয়া বলিল , ‘ খবরদার, আমাকে মা বলিস নে — আমাকে দিদি বলিস । ‘ পটল বলে , ‘ অতবড়ো মেয়ে মা বলিলে নিজেকে বুড়ি বলিয়া মনে হইবে যে । ‘ বোধ করি সেই দুর্ভিক্ষের উপবাসে বা আর-কোনো কারণে উহার থাকিয়া থাকিয়া শূলবেদনার মতো হয় । ব্যাপারখানা কী, তোমাকে ভালো করিয়া পরীক্ষা করিয়া দেখিতে হইবে । ওরে তুল্ সি , কুড়ানিকে ডাকিয়া আন্ তো । ”
কুড়ানি চুল বাঁধিতে বাঁধিতে অসম্পূর্ণ বেণী পিঠের উপরে দুলাইয়া হরকুমারবাবুর ঘরে আসিয়া উপস্থিত হইল । তাহার হরিণের মতো চোখদুটি দুজনের উপর রাখিয়া সে চাহিয়া রহিল ।
যতীন ইতস্তত করিতেছে দেখিয়া হরকুমার তাহাকে কহিলেন, “ বৃথা সংকোচ করিতেছ , যতীন । উহাকে দেখিতে মস্ত ডাগর , কিন্তু কচি ডাবের মতো উহার ভিতরে কেবল জল ছল্ছল্ করিতেছে — এখনো শাঁসের রেখা মাত্র দেখা দেয় নাই। ও কিছুই বোঝে না — উহাকে তুমি নারী বলিয়া ভ্রম করিয়ো না , ও বনের হরিণী । ”
যতীন তাহার ডাক্তারী কর্তব্য সাধন করিতে লাগিল — কুড়ানি কিছুমাত্র কুণ্ঠা প্রকাশ করিল না। যতীন কহিল, “শরীরযন্ত্রের কোনো বিকার তো বোঝা গেল না। ”
পটল ফস্ করিয়া ঘরে ঢুকিয়া বলিল , “ হৃদয়যন্ত্রেরও কোনো বিকার ঘটে নাই । তার পরীক্ষা দেখিতে চাও ? ”
বলিয়া কুড়ানির কাছে গিয়া তাহার চিবুক স্পর্শ করিয়া কহিল, “ও কুড়ানি, আমার এই ভাইটিকে তোর পছন্দ হইয়াছে?”
কুড়ানি মাথা হেলাইয়া কহিল, “ হাঁ । ”
পটল কহিল , “ আমার ভাইকে তুই বিয়ে করিবি ? ”
সে আবার মাথা হেলাইয়া কহিল , “ হাঁ । ”
পটল এবং হরকুমারবাবু হাসিয়া উঠিলেন । কুড়ানি কৌতুকের মর্ম না বুঝিয়া তাঁহাদের অনুকরণে মুখখানি হাসিতে ভরিয়া চাহিয়া রহিল ।
যতীন লাল হইয়া উঠিয়া ব্যস্ত হইয়া কহিল , “ আঃ, পটল , তুমি বাড়াবাড়ি করিতেছ — ভারি অন্যায় । হরকুমারবাবু , আপনি পটলকে বড়ো বেশি প্রশ্রয় দিয়া থাকেন । ”
হরকুমার কহিলেন , “ নহিলে আমিও যে উঁহার কাছে প্রশ্রয় প্রত্যাশা করিতে পারি না । কিন্তু যতীন , কুড়ানিকে তুমি জান না বলিয়াই অত ব্যস্ত হইতেছ । তুমি লজ্জা করিয়া কুড়ানিকে সুদ্ধ লজ্জা করিতে শিখাইবে দেখিতেছি । উহাকে জ্ঞানবৃক্ষের ফল তুমি খাওয়াইয়ো না । সকলে উহাকে লইয়া কৌতুক করিয়াছে — তুমি যদি মাঝের থেকে গাম্ভীর্য দেখাও তবে সেটা উহার পক্ষে একটা অসংগত ব্যাপার হইবে । ”
পটল । ঐজন্যই তো যতীনের সঙ্গে আমার কোনোকালেই বনিল না , ছেলেবেলা থেকে কেবলই ঝগড়া চলিতেছে — ও বড়ো গম্ভীর ।
হরকুমার । ঝগড়া করাটা বুঝি এমনি করিয়া একেবারে অভ্যাস হইয়া গেছে — ভাই সরিয়া পড়িয়াছেন , এখন —
পটল । ফের মিথ্যা কথা। তোমার সঙ্গে ঝগড়া করিয়া সুখ নাই — আমি চেষ্টাও করি না ।
হরকুমার । আমি গোড়াতেই হার মানিয়া যাই ।
পটল । বড়ো কর্মই করো । গোড়ায় হার না মানিয়া শেষে হার মানিলে কত খুশি হইতাম ।
রাত্রে শোবার ঘরে জানলা-দরজা খুলিয়া দিয়া যতীন অনেক কথা ভাবিল । যে মেয়ে আপনার বাপ-মাকে না খাইতে পাইয়া মরিতে দেখিয়াছে, তাহার জীবনের উপর কী ভীষণ ছায়া পড়িয়াছে । এই নিদারুণ ব্যাপারে সে কত বড়ো হইয়া উঠিয়াছে — তাহাকে লইয়া কি কৌতুক করা যায় । বিধাতা দয়া করিয়া তাহার বুদ্ধিবৃত্তির উপরে একটা আবরণ ফেলিয়া দিয়াছেন — এই আবরণ যদি উঠিয়া যায় তবে অদৃষ্টের রুদ্রলীলার কী ভীষণ চিহ্ন প্রকাশ হইয়া পড়ে । আজ মধ্যাহ্নে গাছের ফাঁক দিয়া যতীন যখন ফাল্গুনের আকাশ দেখিতেছিল , দূর হইতে কাঁঠালমুকুলের গন্ধ মৃদুতর হইয়া তাহার ঘ্রাণকে আবিষ্ট করিয়া ধরিতেছিল , তখন তাহার মনটা মাধুর্যের কুহেলিকায় সমস্ত জগৎটাকে আচ্ছন্ন করিয়া দেখিয়াছিল- ঐ বুদ্ধিহীন বালিকা তাহার হরিণের মতো চোখদুটি লইয়া সেই সোনালি কুহেলিকা অপসারিত করিয়া দিয়াছে ; ফাল্গুনের এই কূজন-গুঞ্জন-মর্মরের পশ্চাতে যে সংসার ক্ষুধাতৃষ্ণাতুর দুঃখ কঠিন দেহ লইয়া বিরাট মূর্তিতে দাঁড়াইয়া আছে , উদ্ঘাটিত যবনিকার শিল্পমাধুর্যের অন্তরালে সে দেখা দিল ।
পরদিন সন্ধ্যার সময় কুড়ানির সেই বেদনা ধরিল । পটল তাড়াতাড়ি যতীনকে ডাকিয়া পাঠাইল । যতীন আসিয়া দেখিল কষ্টে কুড়ানির হাতে পায়ে খিল ধরিতেছে , শরীর আড়ষ্ট । যতীন ঔষধ আনিতে পাঠাইয়া বোতলে করিয়া গরম জল আনিতে হুকুম করিল । পটল কহিল , “ ভারি মস্ত ডাক্তার হইয়াছ , পায়ে একটু গরম তেল মালিশ করিয়া দাও-না । দেখিতেছ না পায়ের তলা হিম হইয়া গেছে । ”
