এমন সময় পশ্চাতে একটি সহাস্য নারীকণ্ঠ বলিয়া উঠিল , “ কী যতীন , পূর্বজন্মের কারও কথা ভাবিতেছ বুঝি? ”
যতীন কহিল , “কেন পটল, আমি এমনিই কি হতভাগা যে , ভাবিতে হইলেই পূর্বজন্ম লইয়া টান পাড়িতে হয় । ”
আত্মীয়সমাজে ‘পটল ‘ নামে খ্যাত এই মেয়েটি বলিয়া উঠিল , “ আর মিথ্যা বড়াই করিতে হইবে না । তোমার ইহজন্মের সব খবরই তো রাখি , মশায় । ছি ছি , এত বয়স হইল তবু একটা সামান্য বউও ঘরে আনিতে পারিলে না। আমাদের ঐ-যে ধনা মালীটা , ওরও একটা বউ আছে — তার সঙ্গে দুইবেলা ঝগড়া করিয়া সে পাড়াসুদ্ধ লোককে জানাইয়া দেয় যে , বউ আছে বটে। আর তুমি যে মাঠের দিকে তাকাইয়া ভান করিতেছ , যেন কার চাঁদমুখ ধ্যান করিতে বসিয়াছ , এ-সমস্ত চালাকি আমি কি বুঝি না — ও কেবল লোক দেখাইবার ভড়ং মাত্র। দেখো যতীন , চেনা বামুনের পৈতের দরকার হয় না- আমাদের ঐ ধনাটা তো কোনোদিন বিরহের ছুতা করিয়া মাঠের দিকে অমন তাকাইয়া থাকে না; অতিবড়ো বিচ্ছেদের দিনেও গাছের তলায় নিড়ানি হাতে উহাকে দিন কাটাইতে দেখিয়াছি, কিন্তু উহার চোখে তো অমন ঘোর-ঘোর ভাব দেখি নাই। আর তুমি, মশায়, সাতজন্ম বউয়ের মুখ দেখিলে না — কেবল হাসপাতালে মড়া কাটিয়া ও পড়া মুখস্থ করিয়া বয়স পার করিয়া দিলে , তুমি অমনতরো দুপুরবেলা আকাশের দিকে গদ্গদ হইয়া তাকাইয়া থাক কেন। না, এ-সমস্ত বাজে চালাকি আমার ভালো লাগে না । আমার গা জ্বালা করে। ”
যতীন হাতজোড় করিয়া কহিল, “থাক্, থাক্ , আর নয়। আমাকে আর লজ্জা দিয়ো না । তোমাদের ধনাই ধন্য । উহারই আদর্শে আমি চলিতে চেষ্টা করিব। আর কথা নয়, কাল সকালে উঠিয়াই যে কাঠকুড়ানি মেয়ের মুখ দেখিব, তাহারই গলায় মালা দিব — ধিক্কার আমার আর সহ্য হইতেছে না। ”
পটল । তবে এই কথা রইল ?
যতীন । হাঁ , রহিল ।
পটল । তবে এসো ।
যতীন । কোথায় যাইব ।
পটল । এসোই-না ।
যতীন । না, না , একটা-কী দুষ্টুমি তোমার মাথায় আসিয়াছে । আমি এখন নড়িতেছি না ।
পটল । আচ্ছা , তবে এইখানেই বোসো । – বলিয়া সে দ্রুতপদে প্রস্থান করিল ।
পরিচয় দেওয়া যাক । যতীন এবং পটলের বয়সের একদিন মাত্র তারতম্য । পটল যতীনের চেয়ে একদিনের বড়ো বলিয়া যতীন তাহার প্রতি কোনোপ্রকার সামাজিক সম্মান দেখাইতে নারাজ । উভয়ে খুড়তুতো-জাঠতুতো ভাইবোন । বরাবর একত্রে খেলা করিয়া আসিয়াছে । ‘ দিদি ‘ বলে না বলিয়া পটল যতীনের নামে বাল্যকালে বাপ-খুড়ার কাছে অনেক নালিশ করিয়াছে , কিন্তু কোনো শাসনবিধির দ্বারা কোনো ফল পায় নাই — একটিমাত্র ছোটো ভাইয়ের কাছেও তাহার পটল-নাম ঘুচিল না ।
পটল দিব্য মোটাসোটা গোলগাল , প্রফুল্লতার রসে পরিপূর্ণ । তাহার কৌতুকহাস্য দমন করিয়া রাখে , সমাজে এমন কোনো শক্তি ছিল না । শাশুড়ির কাছেও সে কোনোদিন গাম্ভীর্য অবলম্বন করিতে পারে নাই। প্রথম প্রথম তা লইয়া অনেক কথা উঠিয়াছিল। কিন্তু , শেষকালে সকলকেই হার মানিয়া বলিতে হইল — ওর ঐ রকম। তার পরে এমন যে , পটলের দুর্নিবার প্রফুল্লতার আঘাতে গুরুজনদের গাম্ভীর্য ধূলিসাৎ হইয়া গেল। পটল তাহার আশেপাশে কোনোখানে মন-ভার মুখ-ভার দুশ্চিন্তা সহিতে পারিত না — অজস্র গল্প-হাসি-ঠাট্টায় তাহার চারি দিকের হাওয়া যেন বিদ্যুৎশক্তিতে বোঝাই হইয়া থাকিত।
পটলের স্বামী হরকুমারবাবু ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট — বেহার-অঞ্চল হইতে বদলি হইয়া কলিকাতায় আবগারি-বিভাগে স্থান পাইয়াছেন। প্লেগের ভয়ে বালিতে একটি বাগানবাড়ি ভাড়া লইয়া থাকেন, সেখান হইতে কলিকাতায় যাতায়াত করেন । আবগারি-পরিদর্শনে প্রায়ই তাঁহাকে মফস্বলে ফিরিতে হইবে বলিয়া দেশ হইতে মা এবং অন্য দুই-একজন আত্মীয়কে আনিবার উপক্রম করিতেছেন , এমন সময় ডাক্তারিতে নূতন-উত্তীর্ণ পসারপ্রতিপত্তিহীন যতীন বোনের নিমন্ত্রণে হপ্তাখানেকের জন্য এখানে আসিয়াছে।
কলিকাতার গলি হইতে প্রথম দিন গাছপালার মধ্যে আসিয়া যতীন ছায়াময় নির্জন বারান্দায় ফাল্গুন মধ্যাহ্নের রসালস্যে আবিষ্ট হইয়া বসিয়া ছিল , এমন সময়ে পূর্বকথিত সেই উপদ্রব আরম্ভ হইল। পটল চলিয়া গেলে আবার খানিকক্ষণের জন্য সে নিশ্চিন্ত হইয়া একটুখানি নড়িয়া-চড়িয়া বেশ আরাম করিয়া বসিল — কাঠকুড়ানি মেয়ের প্রসঙ্গে ছেলেবেলাকার রূপকথার অলিগলির মধ্যে তাহার মন ঘুরিয়ে বেড়াইতে লাগিল।
এমন সময় আবার পটলের হাসিমাখা কণ্ঠের কাকলিতে সে চমকিয়া উঠিল ।
পটল আর-একটি মেয়ের হাত ধরিয়া সবেগে টানিয়া আনিয়া যতীনের সম্মুখে স্থাপন করিল ; কহিল, “ ও কুড়ানি । ”
মেয়েটি কহিল, “ কী , দিদি । ”
পটল । আমার এই ভাইটি কেমন দেখ্ দেখি ।
মেয়েটি অসংকোচে যতীনকে দেখিতে লাগিল । পটল কহিল , “ কেমন , ভালো দেখিতে না ? ”
মেয়েটি গম্ভীরভাবে বিচার করিয়া ঘাড় নাড়িয়া কহিল , “ হাঁ, ভালো । ”
যতীন লাল হইয়া চৌকি ছাড়িয়া উঠিয়া কহিল , “ আঃ পটল , কী ছেলেমানুষি করিতেছ । ”
পটল। আমি ছেলেমানুষি করি , না তুমি বুড়োমানুষি কর! তোমার বুঝি বয়সের গাছপাথর নাই!
যতীন পলায়ন করিল । পটল তাহার পিছনে পিছনে ছুটিতে ছুটিতে কহিল , “ ও যতীন , তোমার ভয় নাই , তোমার ভয় নাই । এখনই তোমার মালা দিতে হইবে না — ফাল্গুন-চৈত্রে লগ্ন নাই — এখনো হাতে সময় আছে । ”
পটল যাহাকে কুড়ানি বলিয়া ডাকে , সেই মেয়েটি অবাক হইয়া রহিল । তাহার বয়স ষোলো হইবে , শরীর ছিপ্ছিপে — মুখশ্রী সম্বন্ধে অধিক কিছু বলিবার নাই , কেবল মুখে এই একটি অসামান্যতা আছে যে দেখিলে যেন বনের হরিণের ভাব মনে আসে । কঠিন ভাষায় তাহাকে নির্বুদ্ধি বলা যাইতেও পারে- কিন্তু তাহা বোকামি নহে, তাহা বুদ্ধিবৃত্তির অপরিস্ফুরণমাত্র , তাহাতে কুড়ানির মুখের সৌন্দর্য নষ্ট না করিয়া বরঞ্চ একটি বিশিষ্টতা দিয়াছে ।
