যতীন রোগিণীর পায়ের তলায় গরম তেল সবেগে ঘষিয়া দিতে লাগিল । চিকিৎসাব্যাপারে রাত্রি অনেক হইল । হরকুমার কলিকাতা হইতে ফিরিয়া আসিয়া বারবার কুড়ানির খবর লইতে লাগিলেন । যতীন বুঝিল , সন্ধ্যাবেলায় কর্ম হইতে ফিরিয়া আসিয়া পটল-অভাবে হরকুমারের অবস্থা অচল হইয়া উঠিয়াছে — ঘন ঘন কুড়ানির খবর লইবার তাৎপর্য তাই । যতীন কহিল , “ হরকুমারবাবু ছট্ফট্ করিতেছেন; তুমি যাও, পটল । ”
পটল কহিল , “ পরের দোহাই দিবে বৈ-কি । ছট্ফট্ কে করিতেছে তা বুঝিয়াছি । আমি গেলেই এখন তুমি বাঁচো । এ দিকে কথায় কথায় লজ্জায় মুখচোখ লাল হইয়া উঠে — তোমার পেটে যে এত ছিল তা কে বুঝিবে । ”
যতীন । আচ্ছা , দোহাই তোমার , তুমি এইখানেই থাকো । রক্ষা করো — তোমার মুখ বন্ধ হইলে বাঁচি । আমি ভুল বুঝিয়াছিলাম — হরকুমারবাবু বোধ হয় শান্তিতে আছেন , এরকম সুযোগ তাঁর সর্বদা ঘটে না ।
কুড়ানি আরাম পাইয়া যখন চোখ খুলিল পটল কহিল , “ তোর চোখ খোলাইবার জন্য তোর বর যে আজ অনেকক্ষণ ধরিয়া তোকে পায়ে ধরিয়া সাধিয়াছে — আজ তাই বুঝি এত দেরি করিলি । ছি ছি , ওঁর পায়ের ধুলা নে । ”
কুড়ানি কতর্ব্যবোধে তৎক্ষণাৎ গম্ভীরভাবে যতীনের পায়ের ধুলা লইল । যতীন দ্রুতপদে ঘর হইতে চলিয়া গেল ।
তাহার পরদিন হইতে যতীনের উপরে রীতিমত উপদ্রব আরম্ভ হইল । যতীন খাইতে বসিয়াছে , এমন সময় কুড়ানি অম্লানবদনে পাখা দিয়া তাহার মাছি তাড়াইতে প্রবৃত্ত হইল । যতীন ব্যস্ত হইয়া বলিয়া উঠিল , “ থাক্ থাক্ , কাজ নাই । ” কুড়ানি এই নিষেধে বিস্মিত হইয়া মুখ ফিরাইয়া পশ্চাদ্বর্তী ঘরের দিকে একবার চাহিয়া দেখিল — তাহার পরে আবার পুনশ্চ পাখা দোলাইতে লাগিল । যতীন অন্তরালবর্তিনীর উদ্দেশে বলিয়া উঠিল , “ পটল , তুমি যদি এমন করিয়া আমাকে জ্বালাও তবে আমি খাইব না — আমি এই উঠিলাম । ”
বলিয়া উঠিবার উপক্রম করিতেই কুড়ানি পাখা ফেলিয়া দিল । যতীন বালিকার বুদ্ধিহীন মুখে তীব্র বেদনার রেখা দেখিতে পাইল ; তৎক্ষণাৎ অনুতপ্ত হইয়া সে পুনর্বার বসিয়া পড়িল । কুড়ানি যে কিছু বোঝে না , সে যে লজ্জা পায় না , বেদনা বোধ করে না , এ কথা যতীনও বিশ্বাস করিতে আরম্ভ করিয়াছিল । আজ চকিতের মধ্যে দেখিল , সকল নিয়মেরই ব্যতিক্রম আছে , এবং ব্যতিক্রম কখন হঠাৎ ঘটে আগে হইতে তাহা কেহই বলিতে পারে না । কুড়ানি পাখা ফেলিয়া দিয়া চলিয়া গেল ।
পরদিন সকালে যতীন বারান্দায় বসিয়া আছে , গাছপালার মধ্যে কোকিল অত্যন্ত ডাকাডাকি আরম্ভ করিয়াছে , আমের বোলের গন্ধে বাতাস ভারাক্রান্ত — এমন সময় সে দেখিল , কুড়ানি চায়ের পেয়ালা হাতে লইয়া যেন একটু ইতস্তত করিতেছে । তাহার হরিণের মতো চক্ষে একটা সকরুণ ভয় ছিল — সে চা লইয়া গেলে যতীন বিরক্ত হইবে কি না ইহা যেন সে বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিল না । যতীন ব্যথিত হইয়া উঠিয়া অগ্রসর হইয়া তাহার হাত হইতে পেয়ালা লইল । এই মানবজন্মের হরিণশিশুটিকে তুচ্ছ কারণে কি বেদনা দেওয়া যায় । যতীন যেমনি পেয়ালা লইল অমনি দেখিল , বারান্দার অপর প্রান্তে পটল সহসা আবির্ভূত হইয়া নিঃশব্দহাস্যে যতীনকে কিল দেখাইল; ভাবটা এই যে , “ কেমন ধরা পড়িয়াছ । ”
সেইদিন সন্ধ্যার সময় যতীন একখানি ডাক্তারি কাগজ পড়িতেছিল , এমন সময় ফুলের গন্ধে চকিত হইয়া উঠিয়া দেখিল , কুড়ানি বকুলের মালা হাতে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল । যতীন মনে মনে কহিল , ‘ বড়োই বাড়াবাড়ি হইতেছে — পটলের এই নিষ্ঠুর আমোদে আর প্রশ্রয় দেওয়া উচিত হয় না । ‘
কুড়ানিকে বলিল , “ ছি ছি কুড়ানি , তোমাকে লইয়া তোমার দিদি আমোদ করিতেছেন , তুমি বুঝিতে পার না! ”
কথা শেষ করিতে না করিতেই কুড়ানি ত্রস্ত সংকুচিত ভাবে প্রস্থানের উপক্রম করিল । যতীন তখন তাড়াতাড়ি তাহাকে ডাকিয়া কহিল , “ কুড়ানি , দেখি, তোমার মালা দেখি । ” বলিয়া মালাটি তাহার হাত হইতে লইল । কুড়ানির মুখে একটি আনন্দের উজ্জ্বলতা ফুটিয়া উঠিল , অন্তরাল হইতে সেই মুহূর্তে একটি উচ্চহাস্যের উচ্ছ্বাসধ্বনি শুনা গেল ।
পরদিন সকালে উপদ্রব করিবার জন্য পটল যতীনের ঘরে গিয়া দেখিল , ঘর শূন্য । একখানি কাগজে কেবল লেখা আছে — “ পালাইলাম । শ্রীযতীন । ”
“ ও কুড়ানি , তোর বর যে পালাইল । তাহাকে রাখিতে পারিলি নে! ” বলিয়া কুড়ানির বেণী ধরিয়া নাড়া দিয়া পটল ঘরকন্নার কাজে চলিয়া গেল ।
কথাটা বুঝিতে কুড়ানির একটু সময় গেল । সে ছবির মতো দাঁড়াইয়া স্থিরদৃষ্টিতে সম্মুখে চাহিয়া রহিল । তাহার পর ধীরে ধীরে যতীনের ঘরে আসিয়া দেখিল , তাহার ঘর খালি । তার পূর্বসন্ধ্যার উপহারের মালাটা টেবিলের উপর পড়িয়া আছে ।
বসন্তের প্রাতঃকালটি স্নিগ্ধসুন্দর ; রৌদ্রটি কম্পিত কৃষ্ণচূড়ার শাখার ভিতর দিয়া ছায়ার সহিত মিশিয়া বারান্দার উপর আসিয়া পড়িয়াছে । কাঠবেড়ালি লেজ পিঠে তুলিয়া ছুটাছুটি করিতেছে এবং সকল পাখি মিলিয়া নানা সুরে গান গাহিয়া তাহাদের বক্তব্য বিষয় কিছুতেই শেষ করিতে পারিতেছে না । পৃথিবীর এই কোণটুকুতে , এই খনিকটা ঘনপল্লব ছায়া এবং রৌদ্ররচিত জগৎখণ্ডের মধ্যে প্রাণের আনন্দ ফুটিয়া উঠিতেছিল ; তাহারই মাঝখানে ঐ বুদ্ধিহীন বালিকা তাহার জীবনের , তাহার চারি দিকের সংগত কোনো অর্থ বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিল না । সমস্তই কঠিন প্রহেলিকা । কী হইল , কেন এমন হইল , তার পরে এই প্রভাত , এই গৃহ , এই যাহা-কিছু সমস্তই এমন একেবারে শূন্য হইয়া গেল কেন । যাহার বুঝিবার সামর্থ্য অল্প তাহাকে হঠাৎ একদিন নিজ হৃদয়ের এই অতল বেদনার রহস্যগর্ভে কোনো প্রদীপ হাতে না দিয়া কে নামাইয়া দিল । জগতের এই সহজ-উচ্ছ্বসিত প্রাণের রাজ্যে, এই গাছপালা-মৃগ-পক্ষীর আত্মবিস্মৃত কলরবের মধ্যে কে তাহাকে আবার টানিয়া তুলিতে পারিবে ।
