সেদিন সকালে ডাঙায় নেমে আমরা প্রাতরাশ আহার করছি, হঠাৎ মুখ তুলে দেখেই বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলুম!
আমাদের কাছ থেকে হাত ত্রিশ তফাতেই তিনটে বন্যমহিষ স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তারা যে সে জীব নয়, এমন বিরাটদেহ মহিষ আমি জীবনে কখনও দেখিনি। তারা যে ছায়ার মতো নিঃশব্দে কখন সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, আমরা কেউই তা টের পাইনি!
দুই এক মুহূর্তের জন্যে আমরা সকলেই নীরব হয়ে রইলুম। এ নীরবতা যেন মৃত্যুরই অগ্রদূতজীবন ও পৃথিবী যখন শ্বাস রোধ করে থাকে!
পরমুহূর্তেই আমি আমার মসার রাইফেলটা তুলে নিলুম। এবং আমার দেখাদেখি ফিয়েরও তাই করলে। কারণ এই মহিষ তিনটে যদি আগে থাকতে হঠাৎ আক্রমণ করে তাহলে
আমাদের কারুরই আর রক্ষা নেই!
আমি বন্দুক ছুড়লুম–গাছের পাখিদের শশব্যস্ত করে আওয়াজ হল ধ্রুম! সবচেয়ে বড় মহিষটা ধপাস করে পড়ে গিয়ে যন্ত্রণায় মাথা নাড়া দিলে, তারপর উঠেই ঝোপের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল, অন্য দুটোও ছুটল তার পিছনে-পিছনে।
খানিক পরে দেখা গেল, অন্য মহিষদুটো অনেক দূরে নদীর ধার দিয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটে পালাচ্ছে। কিন্তু আহত বড় মহিষটার আর দেখা নেই।
কোথায় গেল সে? মারাত্মকরূপে জখম হয়ে সে কি ঝোপের ভিতরে কাত হয়ে পড়ে আছে?
মাটির ওপরে রক্তের দাগ ধরে আমরা খুব সহজেই তার অনুসরণে চললুম, কিন্তু তখন জানতুম না আমরা চলেছি স্বেচ্ছায় মরণের সন্ধানে।
তাকে ধরা সহজ হল না। আমরা চলেছি তো চলেছিই–সে সুদীর্ঘ রক্তের দাগের যেন শেষ নেই!
ছয় ঘণ্টা কেটে গেল, আমাদের শরীর একেবার কাবু হয়ে পড়ল। খানিকক্ষণ আর বিশ্রাম না করলেই নয়। একটা গাছের ছায়ায় বসে জিরুতে লাগলুম।
সূর্য অস্ত যাবার কিছু আগে হঠাৎ একজন কুলি এসে খবর দিলে যে, খানিক তফাতেই একটা ঝোপের ভিতরে সেই আহত মহিষটা পড়ে পড়ে ধুকছে।
আমরা দুজনে তখনই সোৎসাহে উঠে সেইদিকে ছুটলুম।
কিন্তু সেই ঝোপের কাছে যাওয়া মাত্রই মহিষটা উঠে আগেই আমাদের আক্রমণ করলে। আমরা দুজনেই একসঙ্গে বন্দুক ছুড়লুম-মহিষটা আবার চোট খেলে। কিন্তু তবু থামল না!
তার পথ থেকে আমি সরে দাঁড়াতে গেলুম, কিন্তু দৈবগতিকে একটা গাছের শিকড়ে পা আটকে একেবারে ভূতলশায়ী হলুম।
মূর্তিমান যমদূতের মতো মহিষটা আমার ওপরে এসে পড়ল এবং আমাকে শিঙে করে টেনে তোলবার চেষ্টা করলে।
আমি কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে তার শিংদুটো দু-হাতে চেপে ধরলুম! আমার হাত ছাড়াবার জন্যে মহিষটা বিষম এক মাথা নাড়া দিলে এবং তার একটা শিং প্রবল বেগে আমার গালের ভিতরে ঢুকে গেল! ভীষণ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে আমি তার শিংদুটো ছেড়ে দিলুম এবং পরমুহূর্তে অনুভব করলুম সে আমাকে শূন্যে তুলে ছুঁড়ে দূরে ফেলে দিলে! তারপরে কী হল আর আমি জানি না।
অনেকক্ষণ পরে জ্ঞানলাভ করে দেখলুম, কুলিরা আমাকে নদীর ধারে এনে শুইয়ে দিয়েছে। আমার সর্বাঙ্গে রক্তপ্রবাহ ও অসহ যাতনা। একজন ঠান্ডা জল ঢেলে আমার ক্ষত ধুইয়ে দিচ্ছে।
কোনওরকমে অস্ফুট স্বরে আমি বললুম, আমার বন্ধু কোথায়?
তাকে ধরাধরি করে এখানে নিয়ে আসা হচ্ছে। তিনি বাঁচবেন না।
মহিষটা?
মরে গেছে।
কাছেই নদীতে আমাদের মোটরবোট ভাসছিল।
আমি বললুম, শিগগির! ওষুধের বাক্সটা নিয়ে এসো! আমার মুখের ভিতর থেকে তখন হু হু করে রক্ত বেরিয়ে আসছে! আর–আর, সে কী ভয়ানক যাতনা।
ওষুধের বাক্স এল। একজন কুলি আমার মুখের সামনে আরশি ধরলে। নিজের মুখ নিজে দেখেই আতঙ্কে আমি শিউরে উঠলুম।
আমার ডান গালে এত বড় একটা ছাদা হয়েছে যে তার ভিতরে অনায়াসেই হাতের মুঠো ঢুকে যায়! নীচেকার ঠোঁটখানা ছিঁড়ে কাঁপতে কাঁপতে ঝুলছে। তলাকার চোয়াল দুই জায়গায় ফেটে ও ভেঙে গেছে কান আর ঠোঁটের কাছে। একখানা লম্বা ভাঙা হাড়ও বেরিয়ে ঝুলে আছে, তার ওপরে রয়েছে তিনটে দাঁত! তলাকার চোয়ালের সমস্ত মাংস একেবারে হাড় থেকে খুলে এসেছে। আমার জিভখানাও টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। যতবার থুতু ফেলেছি, ছোট বড় হাড়ের আর ভাঙা দাঁতের টুকরো ঝরে ঝরে পড়ছে!
সেই অবস্থায় যতটা সম্ভব, নিজের হাতে সুচ দিয়ে গাল ও হাড়ের মাংস সেলাই করতে লাগলুম। আজও আমি ভেবে উঠতে পারি না যে, কী করে আমি সেই অসাধ্য সাধন করেছিলুম। যন্ত্রণার ওপরে তেমন যন্ত্রণা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব।
কোনও রকমে ব্যান্ডেজ বেঁধে ফিয়েরের কাছে গেলুম। তার অবস্থা একেবারেই মারাত্মক। তার দেহের তিন জায়গা শিঙের গুঁতোয় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। বাঁ-দিকের বুকের সমস্ত মাংসপেশি ছিঁড়ে ঝলঝল করে ঝুলছে! তাকে নিয়েও আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করলুম, কিন্তু সে বাঁচল না।
চার-পাঁচ দিন পরে অনেক দূর থেকে ডাক্তার আনা হল–এবং তারপরে আবার অস্ত্র চিকিৎসা–আবার নতুন নরকযন্ত্রণা! অনেকদিন ভুগে আমি বেঁচেছি বটে, কিন্তু আমার মুখ হয়েছে চিরকালের জন্যে ভীষণদর্শন!
আগেই যে মেজর ডবলিউ রবার্ট ফোরানের নাম করা হয়েছে, বন্যমহিষের ভীষণ বিক্রম সম্বন্ধে চিত্তোত্তেজক কাহিনি বলেছেন, এখানে সেটিও তুলে দিলুম। বলা বাহুল্য এটিও সত্য গল্প এবং এরও ঘটনাস্থল আফ্রিকা।
একদিন আমার কাফ্রি ভৃত্য হামিসির সঙ্গে আমি জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ খানিক তফাত থেকে উত্তেজিত সিংহ ও মহিষের প্রচণ্ড গর্জন ও চিৎকার শুনতে পেলুম! সঙ্গে সঙ্গে ঘন ঘন লম্ফঝম্পের আওয়াজ!
