রাত্রে তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া সেরে নিয়ে ক্যাম্পখাটে শুয়ে পড়লুম এবং ঘুম আসতে বিলম্ব হল না। জীবনের অধিকাংশই আমার কেটে গিয়েছে পথে-বিপথে, তাই যেখানে সেখানে খুশি আমি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারতুম।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলুম জানি না, কিন্তু এতটুকু মনে আছে, কী যেন একটা সুখস্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল!
ঘুমের ঘোর ভালো করে কাটতে না কাটতে শুনলুম, তাবুর বাইরে বিষম একটা হট্টগোল ও হুটোপুটির শব্দ!
ঘুমের ঘোর যখন একেবারে কাটল, সমস্ত গোলমাল তখন থেমে গেছে। তাঁবুর ভিতর ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। বসে-বসে ভাবতে লাগলুম, গোলমালটা শুনলুম কি স্বপ্নে?
কিন্তু তারপর যা হল সেটা স্বপ্ন নয় নিশ্চয়ই! আমার ডানদিক থেকে খুব জোরে ভেঁস করে একটা আওয়াজ হল!
তাড়াতাড়ি টর্চটা তুলে নিয়ে জ্বেলেই দেখি, তাবুর কাপড়ের দেওয়াল দুলছে!
ঠিক সেই সময়ে আমার বাঁ-দিক থেকেও তেমনি ভেঁস করে একটা বেজায় শব্দ উঠল– সঙ্গে সঙ্গে সেদিকেও তাবুর গা দুলতে লাগল।
ব্যাপার কী? এ কীসের শব্দ? তবু এমন দোলে কেন?
হতভম্ব হয়ে ভাবছি, এমন সময়ে দুই দিক থেকেই আবার দুই-তিন বার তেমনি শব্দ হল ও তাঁবু ঘন ঘন কাঁপতে লাগল।
তখনই রাইফেলটা তুলে নিলুম। বাইরে ও কারা এসেছে? এমন শব্দ করে কেন? কী চায় ওরা?
পরমুহূর্তে কী যে হল কিছুই বুঝতে পারলুম না–আচম্বিতে যেন ভূমিকম্প উপস্থিত, মাথার ওপরে যেন পাহাড় ভেঙে পড়ল! প্রচণ্ড এক ধাক্কায় আমি হাতকয় দূরে মাটির ওপরে ছিটকে পড়ে গেলুম।
অন্য কেউ হলে তখনই হয়তো ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেত। কিন্তু বহুকাল আগে থেকেই বিপদের সঙ্গে আমার চেনাশোনা, বহুবারই সামনে দেখেছি সাক্ষাৎ মৃত্যুকে, তাই আহত ও আচ্ছন্ন অবস্থাতেই মাটির ওপরে পড়েই আবার সিধে হয়ে উঠে বসলুম।
অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় অবাক হয়ে দেখলুম, দুরে সাদা মতো প্রকাণ্ড কী একটা দুম দুম করে চলে যাচ্ছে অনেকগুলো পায়ের ভারে পৃথিবী কাঁপয়ে এবং কোথাও আমার তাঁবুর চিহ্নমাত্র নেই!
ফ্যালফ্যাল করে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চারদিকে তাকাতে লাগলুম, কিন্তু এপাশে-ওপাশে, সামনে-পিছনে–আমার তাঁবু নেই কোথাও!
অনেক কষ্টে উঠে খোঁড়াতে-খোঁড়াতে কয়েক পা এগিয়ে দেখি, এক জায়গায় কতকগুলো ভাঙা কাঠ ও ছেঁড়া ন্যাকড়া পড়ে রয়েছে এবং পরীক্ষা করে বোঝা গেল, সেগুলো হচ্ছে আমারই ক্যাম্প খাটের ধ্বংসাবশেষ!
আমার সঙ্গে ছিল ত্রিশজন কুলি ও চাকরবাকর, কিন্তু তারাও যেন কোনও যাদুমন্ত্রে হাওয়ার সঙ্গে হাওয়া হয়ে মিলে গিয়েছে!
দূরে আবার অনেকগুলো ভারী-ভারী পায়ের শব্দ শুনলাম। ফিরে দেখি একদল বড় বড় জীব আমার দিকেই এগিয়ে আসছে!
ভাগ্যে কাছেই একটা প্রকাণ্ড গাছ ছিল, চটপট তার ওপরে উঠে বসলুম।
জীবগুলো আর কিছু নয়–একদল হিপো। তারা গদাইলশকরি চালে চলতে-চলতে যেখানে আমার তবু ছিল সেইখানে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে, তারপরে প্রত্যেকেই দুই একবার সেই ক্যাম্প খাটের ভগ্নাবশেষকে ভেঁস ভেঁস শব্দে শুঁকে পরীক্ষা করে, এদিকে ওদিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায় এবং তারপর নদীর দিকে চলে যায়।
এতক্ষণে ব্যাপারটা স্পষ্ট হল।
বন্য পশুদের জলপান করতে যাবার জন্য এক একটা নির্দিষ্ট রাস্তা থাকে–প্রত্যহই তারা সেই চেনাপথ ব্যবহার করে। এটা হচ্ছে হিপোদের জলপান করতে যাবার রাস্তা।
অন্ধকারে ও তাড়াতাড়িতে না দেখে আমরা আস্তানা গেড়েছিলুম হিপোদের এই নিজস্ব রাস্তার উপরেই!
হিপোদের গায়ের জোর ও গোঁয়ারতুমি যেমন বেশি, বুদ্ধিশুদ্ধি তেমনি কম। দুটো হিপো আগে এই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ পথের ওপরে তাঁবু দেখে বিস্মিত হয়ে দাঁড়ায় এবং তাদের দেখে পালায় আমার লোকজনরা। তখন তারা দুজনে দুদিক থেকে ভেঁস ভোঁস শব্দে আমার তবু শুঁকে হিপো-বুদ্ধিতে স্থির করে–এটা নিশ্চয়ই কোনও বিপজ্জনক বস্তু বা জন্তু, নইলে কাল এখানে ছিল না, আর আজ কোথা থেকে উড়ে এসে নদীর পথ জুড়ে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে কেন? অতএব মারো ওটাকে জোরসে এক টু!
কিন্তু ঢুঁ মারার সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত তাঁবুটা যেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে তাদের সর্বাঙ্গে জড়িয়ে ধরলে, অমনি সমস্ত বীরত্ব ভুলে নাদাপেটা হাঁদারামরা তাঁবু ঘাড়ে করেই অন্ধের মতো দৌড়ে পলায়ন করেছে।
বনের ভিতরে আনাচেকানাচে এমনিধারা কত যে ধারণাতীত বিপদ সর্বদাই অপেক্ষা করে, তা বলবার কথা নয়! একবারমাত্র অসাবধান হলেই জীবনে আর কখনও সাবধান হবার সময় পাওয়া যাবে না।
পল গ্রেটেজ নামে একজন জার্মান সৈনিক আফ্রিকার মহিষ শিকার করতে গিয়ে কী ভয়াবহ বিপদে পড়েছিলেন, এখানে সে গল্প বললে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। মহিষ শিকারের কথা শুনে কেউ যেন অগ্রাহ্যের হাসি না হাসেন। কারণ বন্যমহিষ বড় সহজ জীব নয়, অনেক শিকারির মতে সিংহ ব্যাঘ্রের চেয়েও তারা হচ্ছে বেশি সাংঘাতিক! ঘটনাটি মেজর ডবলিউ রবার্ট ফোরানের Kill : Or Be Killed নামে শিকারের প্রসিদ্ধ পুস্তকে প্রকাশিত হয়েছে। এই সত্য গল্পটি গ্রেটেজ সাহেবের মুখেই শ্রবণ করুন, শিকারের এমন ভয়ানক কাহিনি দুর্লভঃ
আমি তখন রোডেশিয়ার বাংউয়েলো হ্রদে স্টিমারে করে যাচ্ছিলুম। আমার দলে ছিল ফরাসি আলোকশিল্পী অক্টেভ ফিয়ের, কাফ্রি পাঁচক জেমস ও আর চারজন দেশি চাকর।
