খুনি ওনি বুঝলে, এখন দিন কয়েকের জন্য গা-ঢাকা দিয়ে ভালোমানুষ সাজা উচিত। সে তখন কয়েকজন সাঙাতকে নিয়ে ভদ্রপাড়ায় একখানা বাড়ি ভাড়া করলে–বাড়িওয়ালার নাম কিটিং। সে সাধু ও গৃহস্থ ব্যক্তি; ভাড়াটেরা কোন শ্রেণির লোক, ঘুণাক্ষরেও তা কল্পনা করতে পারেনি।
কিন্তু স্বভাব না যায় মলে! বিশেষ, বাঘ আর কতদিন শান্ত হয়ে থাকতে পারে? খুনি ওনি আর তার চ্যালা-চামুন্ডারা সারা রাত নেচে-কুঁদে হট্টগোল করে এত বেশি ফুর্তি করতে লাগল যে, পাড়ার ভদ্রলোকদের পক্ষে আশেপাশে তিষ্ঠানো দায় হয়ে উঠল।
একদিন সন্ধ্যায় তারা গানবাজনা আরম্ভ করেছে, এমন সময়ে বাড়িওয়ালা কিটিং এসে হাজির।
বিরক্তমুখে ভারিক্কে-চালে কিটিং বললে, পাড়ার লোকে রাগ করছে। আমার বাড়িতে এত গোলমাল করলে আমি তোমাদের উঠিয়ে দেব।
ভারি মিঠে হাসি হেসে ওনি বললে, বলেন কি মশাই, আমাকে আপনি উঠিয়ে দেবেন? বেশ, বেশ। আচ্ছা, আপনি কি ওনি ম্যাডেনের নাম শুনেছেন?
খুনি ওনি? তার নাম কে শোনেনি?
বেশ, বেশ। তাহলে আর-একটা নতুন খবর শুনে রাখুন। আমারই নাম খুনি ওনি।
কিটিং-বেচারা আর একটাও কথা কইলে না, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নীচে নেমে গেল। তারপর আর কোনও হট্টগোলই সে কানে তুললে না, পুলিশে খবর দিলে না। কারণ সে জানত, খুনি ওনিকে ধরিয়ে দিলে তার দলের লোকেরা এসে তাকে টিপে মেরে ফেলবে।
কিন্তু সে চুপ করে থাকলে কি হবে, পাড়াপড়শিদের আর সহ্য হল না! থানায় খবর গেল। একজন পাহারাওয়ালা তদারক করতে এল। কিন্তু সে এসেই যেই শুনলে ভাড়াটের নাম খুনি ওনি, অমনি চোখ কপালে তুলে সরে পড়ল।
তারপর পুলিশ এল সদলবলে, সশস্ত্র হয়ে। কিন্তু খুনি ওনি তো সহজ ছেলে নয়, সহজে ধরাও দিলে না। রীতিমতো একটা খণ্ডযুদ্ধের পরে তবে পুলিশ খুনি ওনি ও তার বন্ধুদের পাকড়াও করে মারতে মারতে থানায় নিয়ে যেতে পারলে।
পরদিনেই বিচার। জজসাহেব কিন্তু খুনি ওনিকে নাবালক দেখে তাকে সৎপথে থাকতে উপদেশ দিয়ে মুক্তি দিলেন।
গুন্ডাদের জগতে খুনি ওনির শত্রুও ছিল ঢের, কারণ অনেকে তাকে হিংসা করত।
একদিন এক নাচঘরে খুব নাচ-গান চলছে, শত-শত লোক আমোদ করছে, এমন সময়ে খুনি ওনি ধীরে ধীরে সেখানে প্রবেশ করলে। তাকে দেখেই সবাই ভয়ে তটস্থ, নাচ গেল থেমে এবং অনেকেই পালাবার উপক্রম করলে।
ওনি সবাইকে অভয় দিয়ে হেসে বললে, তোমরা যত খুশি নাচো–গাও–আমোদ করো! ভয় নেই, আজ আমি মারামারি করতে আসিনি। আবার নাচ শুরু হল, খুনি ওনি নিতান্ত নিরীহের মতন বসে নাচ দেখতে লাগল।
কিন্তু তখনি তার শত্রুমহলে খবর রটে গেল যে, খুনি ওনি আজ একলা পথে বেরিয়েছে!
এগারো জন শত্রু নাচঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে তার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। ওনি বাইরে আসতেই এগারোটা রিভলভার গুলিবৃষ্টি করলে। ছয়টা গুলি ওনির গায়ে ঢুকল–সে। রাজপথে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।
হাসপাতালে পুলিশ যখন জিগ্যেস করলে, কারা তোমাকে মেরেছে? ওনি তখন বললে, সে-কথায় তোমাদের দরকার কি? কারুর নাম আমি বলব না। আমার চ্যালারাই তাদের শাস্তি দেবে!
ওনি মিথ্যে জাঁক দেখায়নি। হপ্তাখানেকের মধ্যেই তার এগারো জন শত্রুর মধ্যে তিনজনকে পরলোকে প্রস্থান করতে হল। এবং ওদিকে ছয়-ছয়টা গুলি খেয়েও খুনি ওনি মরল না। কিছুদিন পরে সে আবার সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে এল! ইয়াঙ্কি-গুন্ডাদের গল্প তোমাদের হয়তো ভালোই লাগছে; তোমাদের মধ্যে যারা অ্যাডভেঞ্চার খোঁজো, তারা হয়তো ভাবছ, কী মজার ওদের জীবন। কিন্তু তোমরা হয়তো জানো না যে, গুন্ডারা প্রায় সকলেই জীবনে কখনও সুখী হতে পারে না। অধিকাংশ গুন্ডারই পঁচিশ-ত্রিশ বৎসর বয়সের ভিতরেই প্রাণদণ্ডের হুকুম হয়; অনেকে যাবজ্জীবন কারাবাস ভোগ করে; যারা পুলিশকে ফাঁকি দেয়, তারা অনেকেই দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা নিজেদের মধ্যেই মারামারি করে অল্পবয়সেই মারা পড়ে। দীর্ঘজীবী গুন্ডা জেলখানার বাইরে খুব কমই দেখা যায়। যে দু-চারজন বাঁচে, তারা প্রভুত্ব ও শক্তি হারিয়ে প্রায় ভিখারির মতো কষ্ট পায়, কারণ কোনও গুন্ডারই আধিপত্য বেশি দিন থাকে না। পরলোকের কথা কেউ জানে না। কিন্তু ইহলোকেই বেশির ভাগ গুন্ডার পরিণাম হয় ভয়ংকর। সুখে ও শান্তিতে জীবনযাপনের পক্ষে পৃথিবীতে একমাত্র শ্রেষ্ঠ পথ হচ্ছে, সৎপথ, এর চেয়ে বড় সত্য আর নেই।
এ-যুগের সবচেয়ে বড় ডাকাত
এক
আজ পর্যন্ত অনেক ডাকাত ও খুনির গল্প শোনা গেছে, কিন্তু, ফরাসি-ডাকাত বোনোটের ভয়ংকর দলের কাছে সেসব গল্প হচ্ছে খুব ঠান্ডা গল্প!
১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে ডিসেম্বরের সকালবেলায় ঝরঝর করে বৃষ্টি ঝরছে।
প্যারিসের এক বড় ব্যাঙ্ক সবে দরজা খুলেছে। কেবি ও পিম্যান নামে ব্যাঙ্কের দুই কর্মচারী কয়েক লক্ষ টাকা নিয়ে এখনি আসবে, কর্তৃপক্ষ তাদেরই জন্য অপেক্ষা করছেন।
ব্যাঙ্কের কাছেই রাস্তার ওপরে একখানা মোটরগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে তার জানলা-দরজা বন্ধ, কিন্তু মেশিন বন্ধ নয়।
কেবি ও পীম্যানকে দেখা গেল,–তারা গল্প করতে করতে ব্যাঙ্কের দিকে এগিয়ে আসছে।
তারা ব্যাঙ্কের দরজার কাছে এল। হঠাৎ বন্ধ মোটরগাড়ির দরজা খুলে দুজন লোক রাস্তার উপরে লাফিয়ে পড়ল–তাদের হাতে রিভলভার।
