খ্যাপা বাচ আরও ঢের ফন্দি জানত। সেও একটা ছোটখাটো চোরের দল গড়ে তুলেছিল। এবং তার কার্যপদ্ধতি ছিল এইরকম। বিশ-ত্রিশ জন শিশু-পকেটমার নিয়ে সে পথে বেরিয়ে পড়ত। নিজে যেত বাইসাইকেলে চড়ে। পথে কোনও বুড়ি বা দুর্বল লোক দেখলেই খ্যাপা বাচ তার গায়ে ইচ্ছা করে বাইসাইকেলের ধাক্কা লাগিয়ে দিত এবং তারপর গাড়ি থেকে নেমে পড়ে চেঁচিয়ে এমন গালাগালি শুরু করত যে, মস্ত ভিড় জমে যেত। কৌতূহলী লোকের যখন ব্যাপার কি জানবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠত, তখন খ্যাপা বাঁচের স্যাঙাতরা সকলের পকেটে সুপটু হাত চালিয়ে টপাটপ মাণিব্যাগ প্রভৃতি তুলে নিয়ে সরে পড়ত! বলা বাহুল্য, দলের প্রধান পান্ডা বলে লাভের অংশ বেশির ভাগই হত তার পাওনা।
তোমরা পকেটমারের ইস্কুলের নাম শুনেছ?…না? কিন্তু আমেরিকায় সত্যি সত্যিই এই ইস্কুল ছিল, আজও হয়তো আছে!
কোনও দাগি পুরোনো ও বয়স্ক গাঁটকাটা হয় এর মাস্টার। রাজ্যের খুদে বদমাইশরা হয় এর ছাত্র। ক্লাসে সাজানো থাকে নানান ভঙ্গিতে সারে-সারে সাজ-পোশাক পরানো মূর্তি। ছাত্রেরা সাবধানে সেইসব মূর্তির পকেট কেটে বা পকেটে হাত চালিয়ে জিনিস তুলে নিতে চেষ্টা করে। প্রায়ই এমন যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, পকেটের ভিতরে জামার কাপড়ে হাত লাগলেই টুং-টুং করে ঘণ্টা বেজে ওঠে। পকেট কাটতে গিয়ে ছাত্রদের এরকম কোনও ভুল হলেই মাস্টার চোর পাহারাওয়ালার পোশাক পরে এসে সপাসপ বেত মারতে থাকে!
ছোকরা-গুন্ডাদের দলে এক-একজন ভীষণ প্রকৃতির লোকও দেখা গেছে। যেমন, গোবর গণেশ লুই। নাম তার গোবর-গণেশ বটে, কিন্তু গোঁফ ওঠার আগেই সে মানুষ খুন করতে ওস্তাদ হয়ে উঠেছিল। খুব ভালো পোশাক পরে সর্বদাই সে ফিটফাট হয়ে থাকত বটে, কিন্তু তার মনের ভিতরটা ছিল নোংরা ও ভয়াবহ।
কিড টুইস্ট–আমেরিকার এক নামজাদা গুন্ডা-সর্দার। বয়সে, গায়ের জোরে ও সহায় সম্পদে সে লুইয়ের চেয়ে ঢের বড়। লুই কিন্তু এমনি ডানপিটে ছেলে যে, তাকেও গ্রাহ্য করত না। যে-টুইস্টের নাম শুনলে মহা ধড়িবাজ ইয়াঙ্কি-ডাকাতরা পর্যন্ত পালিয়ে যায়, লুই একদিন তার সঙ্গেই ঝগড়া করে বসল! অথচ সেদিন টুইস্টের সঙ্গে ছিল ঝোড়ো লুই নামে আর-একজন এমন ষণ্ডা-গুন্ডা, যে হাতের চাপে মানুষকে ভেঙে দুখানা করে ফেলতে পারত।
ঝগড়াটা বাধল এক হোটেলের দোতলায়। কিড টুইস্ট তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললে, ওহে ছোকরা, শুনেছি তুমি খুব চটপটে! আচ্ছা, এখনি ওই জানলা দিয়ে রাস্তায় লাফ মারো দেখি!
লুই বেচারা একলা মারামারি করতেও পারলে না, অত উঁচু থেকে তার লাফ মারবারও ভরসা হল না। সে ইতস্তত করতে লাগল।
কিড টুইস্ট চোখ রাঙিয়ে পকেট থেকে রিভলভার বার করতে উদ্যত হল। তখন লুই আর কী করে, বাধ্য হয়ে জানলা থেকে মারলে এক লাফ!
অল্প বয়স, হালকা দেহ, কাজেই দোতলা থেকে নীচে পড়েও তার খুব বেশি লাগল না। কিন্তু সে গুন্ডা-সর্দার টুইস্টের ওপরে মর্মান্তিক চটে গেল।
রাস্তায় দাঁড়িয়েই সে শুনতে পেলে, ওপরে বসে টুইস্ট হেঁড়ে গলায় অট্টহাস্য করছে। লুই মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করলে, এ অপমানের প্রতিশোধ না নিয়ে সে জলগ্রহণ করবে না!
তখনি সে ফোন করে দলের জন-ছয়েক লোককে আনিয়ে হোটেলের দরজার কাছে পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে রইল।
খানিক পরেই দেখা গেল, কিড টুইস্ট ও ঝোড়ো লুই সকলের সভয় সেলাম কুড়োতে কুড়োতে হোটেল থেকে বেরিয়ে আসছে!
গোবর-গণেশ লুই হেসে বললে, কিড, এইদিকে এসো!
কিড টুইস্ট মুখ তুলে তাকাতে-না-তাকাতেই লুই রিভলভারের দুই গুলিতে তার মাথা ও বুক ছাদা করে দিলে! পরমুহূর্তে তার মৃতদেহ পথের ওপরে পড়ে গেল।
ঝোড়ো লুই বেগতিক দেখে পালাতে চেষ্টা করলে, কিন্তু গোবর-গণেশের সাঙ্গোপাঙ্গরা তাকেও কুকুরের মতো গুলি করে মেরে ফেললে।
একজন পাহারাওয়ালা দৌড়ে এল, কিন্তু গোবর-গণেশের রিভলভার আবার গর্জন করতেই সে বুদ্ধিমানের মতো চটপট সরে পড়ল।
কিছুদিন পরে গোবর-গণেশ যেচে পুলিশের হাতে আত্মসমর্পণ করলে।
বিচারক তার নিতান্ত কাঁচা বয়স দেখে তাকে এগারো মাসের জন্যে সংশোধনী কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন।
গোবর-গণেশ লুই অবহেলা ভরে বললে, মোটে এগারো মাস? ওঃ, ভারি তো! আমি শূন্যে পা তুলে মাথার ওপর ভর দিয়েই এগারো মাস কাটিয়ে দিতে পারি।
.
আর-এক ছোকরা-গুন্ডার গল্প বলে আমরা এবারের পালা শেষ করব। তার নাম হচ্ছে, ওনি ম্যাডেন। কিন্তু লোকে তাকে ডাকে, খুনি ওনি বলে।
বিলাতে তার জন্ম। এগারো বছর বয়সে সে আসে আমেরিকায়। সতেরো বছর বয়সেই সে খুনি ওনি নাম অর্জন করে। তার মারাত্মক বীরত্ব দেখে বড়-বড় ইয়াঙ্কি-গুন্ডারা মুগ্ধ হয়ে তার দলে গিয়ে ভর্তি হয়। তারপর একে একে পাঁচটা নরহত্যা করে খুনি ওনি সর্বপ্রথম পুলিশের পাল্লায় পড়ে জেল খাটে।
খুনি ওনি যখন পথে বেরুত, তখন তার সঙ্গে থাকত অনেক রকম অস্ত্রশস্ত্র। প্রথমবার জেল খাটবার আগে সে কখনও শারীরিক পরিশ্রম করেনি। সারাদিন ঘুমিয়ে থাকত এবং সারারাত হোটেলে নেচে-গেয়ে ফুর্তি করে বেড়াত। টাকার দরকার হলেই রাহাজানি ও নরহত্যা করত–যাকে বলে, আদর্শ হিংস্র পশুর জীবন।
জেল থেকে বেরিয়ে সে আবার দুটি মানুষকে যমের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। পুলিশ আবার তার পিছনে লাগে। কিন্তু সাক্ষীর অভাবে তাকে ধরতে পারে না।
