আবার যুদ্ধ আরম্ভ হইল
অভিষেকের ধূমধামে শিবাজীর রাজভাণ্ডার প্রায় খালি হইয়া গিয়াছিল। তাই তাঁহাকে আবার লুঠ করিতে বাহির হইতে হইল। ইহার ঠিক এক মাস পবেই, অর্থাৎ জুলাই-এর মাঝামাঝি, একদল মারাঠা অশ্বারোহী দূরে একটি স্থান আক্রমণ করিবে এরূপ ভাব দেখানতে, মুঘল সুবাদার বাহাদুর খাঁ পেড়গাঁও-এ নিজ শিবির রাখিয়া সৈন্যসহ পঞ্চাশ মাইল দূরে উহাদের বাধা দিতে গেলেন। আর সেই অবসরে অপর একদল সাত হাজার মারাঠা-সৈন্য অন্যপথ দিয়া দ্রুত আসিয়া হঠাৎ আক্রমণ করিয়া, পেড়গাঁও-এর অরক্ষিত মুঘল-শিবির অবাধে লুঠ করিয়া এক কোটি টাকা এবং দুই শত ভাল ভাল বাদশাহী ঘোডা লইয়া শিবিরে আগুন ধরাইয়া দিয়া চম্পট দিল। শীতকাল আসিলে মারাঠারা কয়েক মাস ধরিয়া কোলী-দেশ, অরঙ্গাবাদ, বগলানা ও খাদেশ লুঠ করিয়া বেড়াইল; জানুয়ারি ১৬৭৫-এর শেষে কোলাপুর হইতে সাডে সাত হাজার টাকা আদায় করিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি মুঘলেরা কল্যাণ শহর পুড়াইয়া দিয়া চলিয়া গেল।
মুঘল, বিজাপুর ও শিবাজী
১৬৭৫ সালের মার্চ হইতে মে—এই কয়মাস ধরিয়া শিবাজী আবার মুঘল বাদশাহর বশ্যতা স্বীকার করিতে ইচ্ছুক এইরূপ ভাণ করিয়া সন্ধির আলোচনায় সুবাদার বাহাদুর খাকে ভুলাইয়া রাখিলেন, এবং সেই অবসরে কোলাপুর (মার্চ, এবং বিখ্যাত ফোণ্ডা দুর্গ (জুলাই মাসে) অধিকার করিলেন। তাহার পর কার্য্য সিদ্ধি হওয়ায় বাহাদুর খাঁর দুতকে অপমান করিয়া তাড়াইয়া দিলেন।
রাগে লজ্জায় বাহাদুর খাঁ শিবাজীকে জব্দ করিবার জন্য বিজাপুরের উজীর খাওয়াস খাঁর সহিত জোট করিলেন। কিন্তু ১১ই নভেম্বর বিজাপুরের আফঘান-দল খাওয়াস খাঁকে বন্দী করিয়া রাজ্যের কর্তৃত্ব কাড়িয়া লইল; বাহাদুরের ইচ্ছা বিফল হইল।
১৬৭৬ সালের প্রথমেই শিবাজী বিশেষ অসুস্থ হইয়া পড়েন। সাতারায় তিন মাস চিকিৎসার পর, মার্চের শেষে তিনি আরোগ্যলাভ করেন। এদিকে খাওয়াসের পতনের পর হইতেই বিজাপুরে আফঘান ও দক্ষিণী ওমরাদের মধ্যে ভীষণ গৃহ-বিবাদ বাধিল। বাহাদুর খাঁ নূতন উজীর আফঘান-নেতা বহলোল খাঁকে আক্রমণ করিবার জন্য রওনা হইলেন (৩১ মে ১৬৭৬)। অমনি বহলোল শিবাজীর সহিত সন্ধি করিলেন; তাহার শর্ত হইল যে, বিজাপুর-সরকার শিবাজীকে নগদ তিন লক্ষ টাকা এবং প্রতি বৎসর এক লক্ষ হোণ (অর্থাৎ পাঁচ লক্ষ টাকা) কর দিবে এবং তাহার জয় করা প্রদেশগুলিতে তাহার অধিকার মানিয়া লইবে; আর মুঘলেরা আক্রমণ করিলে শিবাজী নিজ সৈন্য দিয়া আদিলশাহী রাজ্য রক্ষা করিবেন। কিন্তু বিজাপুরে ঘরোয়া বিবাদ ও নিত্য পরিবর্ত্তনের মধ্যে এ সন্ধি বেশী দিন টিকিল না। তাহাতে শিবাজীর কোনই ক্ষতি হইল না। তিনি অন্যত্র এক বহু ধনশালী দেশ জয় করিতে চলিলেন; তাহার নাম পূর্ব্ব-কর্ণাটক, অর্থাৎ মাদ্রাজ অঞ্চল।
- মহাদেব্যা গোতমী বালশ্রী মাতুঃ রাজরাজস্য শ্রীশাতকর্ণেঃ গোতমীপুত্রস্ব-অবিপন্ন মাতৃশুশ্রূষাকবস্য-পৌবজন নির্বিশেষ সমসুখদুঃখস্য-শকযবন-পল্হব-নিসূদনস্য-দ্বিজাবর-কুটুম্ব-বিবর্দ্ধনস্য-খখবাত বংশ-নিরবশেষকাবস্য-বিনিবর্ত্তিত-চাতুর্বর্ণ সংকরস্য-অনেক সমরাবজীত শত্রু-সংঘন্য-সৎপুরুষাণাম্ আশরস্য-শ্রিয়া অধিষ্ঠানস্য—দক্ষিণাপথেশ্বরস্য•••••[Epigraphia India, iii, 60. নাসিক-গুহার শিলালিপির সংস্কৃত অনুবাদ}
- সভাসদ বলেন, সিংহাসনে ৩২ মণ শোনা (দাম ১৪ লক্ষ টাকা)এবং যাহা যাহা হীয়া ও মণিমুক্তা লাগিয়াছিল। প্রধানেরা প্রত্যেকে এক লক্ষ হোণ (অর্থাৎ পাঁচ লক্ষ টাকা) নগদ এবং হাতী ঘোড় বস্ত্র অলঙ্কার বখশীষ পাইয়াছিলেন। গাগা ভট্টকে “অপরিমিত দ্রব্য” দেওয়া হইল, ইত্যাদি।
০৯. দক্ষিণ-বিজয়
নবম অধ্যায় – দক্ষিণ-বিজয়
পূর্ব্ব-কর্ণাটকের রাজ্যগুলি এবং ঐশ্বর্য্য
এক সময়ে বিখ্যাত বিজয়নগর-সাম্রাজ্য কৃষ্ণা নদীর পরপারে সারা দাক্ষিণাত্য জুড়িয়া পূৰ্ব সমুদ্র হইতে পশ্চিম সাগর,—অর্থাৎ মাদ্রাজ হইতে গোয়া-পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু ১৫৬৫ খৃষ্টাব্দে দক্ষিণের মুসলমান সুলতানেরা একজোট হইয়া বিজয়নগরের সম্রাটকে যুদ্ধে নিহত করিয়া তাঁহার রাজধানী লুঠ করিলেন। তাঁহার উত্তরাধিকারিগণ রাজধানী একস্থান হইতে অপর স্থানে সরাইতে লাগিল, কিন্তু ঐ যুদ্ধের পর হইতে সাম্রাজ্যে ভাঙ্গন ধরিল; কতক প্রদেশ মুসলমানেরা কাড়িয়া লইল, আর কতক প্রদেশ স্বাধীন হইল। বিজয়নগরের শেষ সম্রাট (শ্রীরঙ্গ রায়ল) সর্ব্বস্ব হারাইয়া তাঁহার সামন্ত শ্রীরঙ্গপটনের রাজার দ্বারে আশ্রয় মাগিলেন (১৬৫৬)।
ইতিমধ্যে বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার সুলতানেরা বিজয়নগরের করদরাজাদিগের হাত হইতে বর্ত্তমান মহীশুর দেশ ও মাদ্রাজ উপকুলের প্রায় সমস্তটাই কাড়িয়া লইলেন। পূর্বের একচ্ছত্র সম্রাটের বল ও আশ্রয়, হারাইয়া, নিজ নিজ ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে পূর্ণ কর্তৃত্বের অভিমানে অন্ধ স্বার্থপর প্রাদেশিক হিন্দুরাজারা সঙ্ঘবদ্ধ হইতে পারিল না। প্রত্যেকে পৃথক পৃথক লড়িয়া সহজেই মুসলমানের কাছে রাজ্য হারাইল অথবা বশ মানিল। এইরূপে ১৬৩৭ হইতে ১৬৫৬ সালের মধ্যে কুতুব শাহ গোলকুণ্ডার দক্ষিণ-পূর্বে অগ্রসর হইয়া কাড়াপা এবং উত্তর-আর্কট জেলা (পালার নদীর উত্তরের অংশ) এবং মাদ্রাজের সমুদ্রকুল অঞ্চলে শিকাকোল হইতে সাদ্রাজ বন্দর (মাদ্রাজের প্রায় ৫০ মাইল দক্ষিণ) পর্যন্ত দখল করিলেন। ইহার নাম হইল “হায়দারবাদী কর্ণাটক”। ঠিক ইহার দক্ষিণে,—পালার হইতে কাবেরী নদী পর্যন্ত সমভূমি এবং প্রায় সমস্ত মহীশ্বর জুড়িয়া আদিল শাহ রাজ্য বিস্তার করিলেন। তাহার নাম হইল “বিজাপুরী কর্ণাটক”।
