তাহার পর ভিজা কাপড় ছাড়িয়া, রাজার যোগ্য জরির কাজ করা লাল বস্ত্র এবং মণিমুক্তাহীরা বসান নানাপ্রকার উজ্জ্বল অলঙ্কার পরিয়া, গলায় ফুলের মালা ও মাথায় মুক্তার অসংখ্য ঝালরে সজিত পাগড়ী দিয়া, শিবাজী নিজ ঢাল তলোয়ার তীর ও ধনুকের “অস্ত্রপূজন” করিলেন, এবং এই উপলক্ষে আবার ব্রাহ্মণদের চরণ বন্দনা (তথা দক্ষিণা দান) করিলেন।
সিংহাসন-গৃহের সজ্জা
অবশেষে তিনি সিংহাসন-গৃহে ঢুকিলেন। এই ঘরের সজ্জায় অগাধ ধনরত্ন ঢালিয়া দেওয়া হইয়াছিল। ছাদের নীচে জরির শামিয়ানা খাটান, তাহা হইতে লহরে লহরে মুক্তার মালা ঝুলিতেছিল। মেঝেতে মখমল বিছান: মধ্যস্থলে বহু পরিশ্রমে প্রস্তুত অশেষ কারুকার্যে শোভিত, “অমূল্য নবরত্নে খচিত” এক প্রকাণ্ড সোনার সিংহাসন। সিংহাসনের তলদেশ সোনার চাদর দিয়া মোড়া; আট কোণে আটটি স্তম্ভ, মণিবসান সোনার পাতে জড়ান। আর এই আটটি থামের মাথায় চমকে জরির চাঁদোয়া বাঁধা, তাহার স্থানে স্থানে মুক্তার গুচ্ছ হীরক পদ্মরাগ প্রভৃতি ঝুলিতেছে। রাজার বসিবার গদী ব্যাঘ্রচর্ম্মের উপর মখমল দিয়া ঢাকা। গদীর পশ্চাতে রাজছত্র।
সিংহাসনের দুই পাশে নানা প্রকার রাজচিহ্ন সোনার জল করা বল্লম হইতে ঝুলিতেছিল,—যেমন, ডানদিকে দুইটি প্রকাণ্ড মাছের মাথা (মুঘলদিগের মাহী মুরাতিব), বামে ঘোড়ার লেজের চামর (তুর্কীজাতীয় রাজচিহ্ন) এবং ওজনের মানদণ্ড (ইহা ন্যায়বিচারের চিহ্ন, প্রাচীন পারস্য-রাজ্য হইতে লওয়া)। রাজদ্বারের বাহিরে দুইদিকে পাতায় মুখ ঢাকা জলের ঘট সাজান, এবং তাহার পর দুটি হস্তিশাবক ও দুটি সুন্দর ঘোড়া; তাহাদের সাজ ও লাগাম সোনা ও মণি দিয়া কাজ করা।
শিবাজীর সিংহাসনে অধিবেশন ও ছত্রধাবণ
নির্দিষ্ট মুহূর্তে শিবাজী পূজ্যগণকে নমস্কার করিয়া সিংহাসনের সিঁড়ি বাহিয়া উঠিয়া গদীতে বসিলেন। অমনি মুঠা মুঠা রত্নখচিত সোনার পদ্ম ও অন্যান্য সোনা-রূপার ফুল সভাসদগণের মধ্যে ছড়াইয়া দেওয়া হইল। আবার ষোলজন সধবা ব্রাহ্মণী সু-বাস পরিয়া সোনার পঞ্চপ্রদীপ তাঁহার চারিদিকে ঘুরাইয়া অমঙ্গল দূর করিলেন। সমবেত ব্রাহ্মণগণ উচ্চৈঃস্বরে শ্লোক আওড়াইয়া রাজাকে আশীর্বাদ করিলেন, শিবাজী নতশিরে তাহার প্রত্যুত্তর দিলেন। জনসাধারণ আকাশ ফাটাইয়া চেঁচাইতে লাগিল—“জয়, শিবরাজের জয়। শিব ছত্রপতির জয়!” একসঙ্গে সমস্ত বাদ্যযন্ত্র বাজিয়া উঠিল; আর, বাহিরে মহারাষ্ট্র দেশের সব দুর্গ হইতে ঠিক সেই মুহুর্তে তোপের আওয়াজ করা হইল। দেশ জানিল যে নিজের রাজা পাইয়াছে।
প্রথমে অধ্বর্য্যু গাগা ভট্ট, তাহার পর অষ্টপ্রধান ও অন্যান্য ব্রাহ্মণগণ অগ্রসর হইয়া রাজাকে আশীর্বাদ করিলেন। শিবাজীর মাথার উপর রাজছত্র ধরা হইল। তিনি সকলকে গণনাতীত ধন দিলেন। “দানপদ্ধতিঅনুযায়ী ঘোড়শ মহাদান ইত্যাদি দানগুলি সম্পন্ন করিলেন।” সিংহাসনের আট কোণে অষ্টপ্রধান অর্থাৎ মন্ত্রিগণ দাঁড়াইয়া ছিলেন; তাদের পদের পারসিক ভাষার নাম বদলাইয়া সংস্কৃত নাম দেওয়া হইল,—যেমন পেশোয়ার বদলে “মুখ্যপ্রধান”। শিবাজীর উপাধি হইল—“ছত্রপতি”। সেইদিন হইতে “রাজ্যাভিষেক শক” নামে এক নূতন বৎসর গণনা শুরু করা হইল; ইহাই পরে সমস্ত মারাঠা সরকারী কাগজ পত্রে ব্যবহৃত হইত।
সিংহাসন অপেক্ষা কিছু নীচু তিনটি আসনে যুবরাজ শম্ভঙ্গী, গাগা ভট্ট ও পেশোয়া মোবেশ্বর ত্র্যম্বক পিঙ্গলে বসিনে। বাকী মন্ত্রীরা দুই লাইন করিয়া সিংহাসনের দুই পাশে দাঁড়াইয়া রহিলেন; তাহাদের পশ্চাতে কায়স্থ “লেখক” নীল প্রভু (পারসনিস) এবং বাবা অবজী। (চিটনিস) স্থান পাইলেন। অন্যান্য দরবারীরা যথাক্রমে আরও দূরে দাঁড়াইল।
এই সব কাজে বেলা আটটা হইয়া গেল। তখন ইংরাজ-দুত হেনরি স্মকসিগুেনকে নিয়াজী রাবজী (শিবাজার ন্যায়াধীশ) সিংহাসনের সামনে লইয়া গেলেন। দূত মাথা নত করিলেন, আর তাহার দোভাষী নারায়ণ শেনবী ইংরাজ কোম্পানীর উপহার একটি হীরার আংটি উচু করিয়া ধরিয়া শিবাজীকে দেখাইলেন। রাজা তাহাদের আরও কাছে ডাকিয়া খেলাৎ পরাইয়া বিদায় দিলেন।
রায়গড়ে শোভাযাত্রা
সর্বশেষে হাতীতে চড়িয়া শিবাজী সদলবলে রায়গড়ের রাস্তা বাহিয়া শোভাযাত্রা করিয়া চলিলেন। আগে দুই হাতীর উপর দুই রাজ পতাকা-“জরী পতাকা” (জরির) এবং “ভাগবে ঝাণ্ডা” (অর্থাৎ রামদাস সন্ন্যাসীর গেরুয়া বস্ত্রের খণ্ড)। শহরবাসীরা নিজ নিজ বাড়ী ও রাস্তা নানারূপে সাজাইয়া রাখিয়াছিল; সর্বত্রই ঘরে ঘরে সধবারা প্রদীপ ঘুরাইয়া রাজার আরতি করিল, তাঁহার মাথার উপর খই ও ফুল ও দুর্বা ছিটাইতে লাগিল। তাহার পর রায়গড় পাহাড়ের সব মন্দিরে গিয়া প্রত্যেক স্থানে পূজা দিয়া দান-ধ্যান করিয়া, শিবাজী অবশেষে বাড়ী ফিরিলেন। তখন বেলা দুপুর।
অভিষেকের ব্যয়
পরদিন ব্রাহ্মণদের দক্ষিণাদান এবং কাঙ্গালী-বিদায় আরম্ভ হইল। ইহা শেষ হইতে বারো দিন লাগিল, এবং সে পর্যন্ত সকলেই রাজার সিধা পাইতে থাকিল। সাধারণ ব্রাহ্মণদের দক্ষিণা তিন হইতে পাঁচ টাকা, ব্রাহ্মণী ও শিশুদের দুই এক টাকা বরাদ্দ ছিল। এই দানে সাড়ে সাত লক্ষ টাকা ব্যয় হইল।
অভিষেকের দুই দিন পরে বর্ষা নামিল, আর দশ-এগার দিন ধরিয়া সেই বৃষ্টি মুষলধারে চলিল। আগন্তুকেরা বিদায় লইয়া পলাইবার পথ পায় না। ১৮ই জুন বৃদ্ধা জীজা বাঈ পূর্ণ সুখ-সম্পদের মধ্যে জীবন শেষ করিলেন। তাঁহার ২৫ লক্ষ হোণের সম্পত্তি শিবাজী পাইলেন। এই অশৌচ শেষ হইলে শিবাজী দ্বিতীয়বার সিংহাসনে বসিলেন। কৃষ্ণাজী অনন্ত সভাসদ বাড়াইয়া বলিয়াছেন যে অভিষেকের ব্যয় সাত কোটি দশ লক্ষ টাকা হইয়াছিল। কিন্তু সর্ব্বসমেত পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ধরিলে বোধ হয় সত্য হয়।[২]
