“মনভোলানো?” স্মিতহাসি দিলো মুশকান। “আমি ধরে নিচ্ছি এটা। কম্প্রিমেন্ট…যদিও আপনি কী অর্থে ব্যবহার করেছেন ঠিক বুঝতে পারছি না।” নির্বিকার থাকার চেষ্টা করলো ছফা। “রাশেদ জুবেরি হাসপাতাল ছাড়ার পর খুব বেশিদিন বাঁচেন নি..সম্ভবত চার মাস?”
“পাঁচমাস সতেরো দিন,” শুধরে দিলো মিসেস জুবেরি। “আপনাদের বিয়েটা কবে হয়েছিলো?”
“এতোকিছু জানেন আর এটা জানতে পারেন নি?” কফির কাপটা পাশের কফি টেবিলে রেখে দিলো। “মনে হচ্ছে আপনার সোর্স অব ইনফর্মেশন ঐ হাসপাতালটাই।”
কথাটা সত্যি। ছফার সহকারী প্রায় সব তথ্যই ওখান থেকে জোগাড় করেছে। “রাশেদ জুবেরির সাথে আপনার বিয়ের খবরটা খুব কম মানুষই জানে।”
“ছুম। আমরা তো আর ঘটা করে বিয়ে করি নি.. আবার টিনএজারদের মতো পালিয়েও সেটা করা হয় নি।” একটু থেমে গভীর করে দম নিয়ে নিলো। সে। “বিয়ের আইডিয়াটা একদমই ওর নিজের ছিলো। আমি প্রথমে রাজি ছিলাম না। পরে ভেবে দেখলাম একজন মৃত্যুপথযাত্রি…যে কিনা অল্প কিছুদিন বাঁচবে, তার একটা ইচ্ছে পূরণ করে তাকে দু-দণ্ড শান্তি দিতে পারলে মন্দ কী।”
“আর তাই আপনি উনাকে দু-দণ্ড শান্তি দেবার জন্য বনলতা সেন হয়ে গেলেন?”
ছফার টিপ্পনীটা মুশকান শুধুমাত্র হালকা বাঁকাহাসি দিয়ে জবাব দিলো। “কী হয়েছিলাম জানি না…তবে কাগজে-কলমে মিসেস জুবেরি হয়ে গেলাম। মুশকান জুবেরি।”।
“তারপর উনার সমস্ত সম্পত্তি আপনি আপনার নামে লিখিয়ে নিলেন?
স্থিরচোখে চেয়ে রইলো ডাক্তার। “আপনি আপনার নামের মতো ব্যতিক্রমী চরিত্র নন, মি. ছফা। সাধারণ মানুষ যেভাবে ভাবে আপনিও ঠিক সেভাবেই ভাবেন।” একটু থেমে আবার বলতে লাগলো সে, “আজ বাদে কাল যে মারা যাবে তাকে কোনো মেয়ে বিয়ে করলে সেটা অবশ্যই সম্পত্তির লোভে করবে-খুবই সাধারণ মানের চিন্তা-ভাবনা। আপনার এমন চিন্তা ভাবনায় আমি কিছুটা হতাশ। শিক্ষিত লোকজনদের আরো একটু উদার মনমানসিকতা থাকা দরকার।”
নুরে ছফা কিছু বললো না।
এবার নিঃশব্দে হাসলো মুশকান। “বিয়ের আগে আমি জানতামই না ওর নামে বিরাট সম্পত্তি রয়েছে…ওগুলো বেদখল হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। যখন জানতে পারলাম তখন বিশ্বাসই করতে পারি নি সম্পত্তিগুলো কোনোদিন উদ্ধার করা যাবে। ও নিজেও এসব সম্পত্তির আশা ছেড়ে দিয়েছিলো।”
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো ছফা।
“বলছি, এতো অধৈর্য হবার দরকার নেই। আপনার সমস্ত প্রশ্নের জবাবই আমি দেবো।” গায়ের শালটা খুলে ঠিকঠাক করে আবারও শরীরে জড়িয়ে নিলো।
কয়েক মুহূর্তের জন্য ছফা মুগ্ধ হয়ে দেখলো তার সামনে বসা মহিলার দেহসৌষ্ঠব। যেকোনো তরুণীর চেয়েও দেহের গড়ন ভালো। নির্মেদ। রোগাও নয় আবার প্রয়োজনের তুলনায় বেশিও নেই কোনো কিছু। যেটা যেরকম থাকার কথা সেরকমই আছে। মহিলার বয়স আন্দাজ করতে পারলো না। কতো হবে? এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে কাজে মনোযোগ দিলো।
“২০০৭ সাল, এক-এগারো হিসেবে যেটা পরিচিত, সেই সময়টাতে ছুট করেই একটা দারুণ সুযোগ চলে এলো। রাশেদ তখন খুবই অসুস্থ। ওর এক ঘনিষ্ঠ বনধু ইকবাল ছিলো সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সেনাসমর্থিত ঐ সরকারে ইকবালের খুব প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিলো। ওর মাধ্যমেই বেদখল হওয়া সম্পত্তিগুলো রাতারাতি ফিরে পাই আমরা।”
এই তথ্যটা ছফা আতরের কাছ থেকে জেনেছিলো। ঐ সময়ে রাজনীতিবিদেরা ছিলো দৌড়ের উপরে, সেই সুযোগে বেদখল সম্পত্তিগুলো খুব দ্রুত ফিরে পাওয়াটা স্বাভাবিকই। তবে সে অবাক হচ্ছে, মহিলা অকপটে সত্যি কথা বলছে বলে।
“তবে দু-বছর পর নির্বাচন হলে.ইকবালরা চলে যায়, আসে নতুন সরকার…তখন আবার সম্পত্তিগুলো বেদখল হতে শুরু করে।”
“এখানকার স্থানীয় এমপি আসাদুলাহ?”
ছফার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিলো মুশকান। “ইকবাল থাকতেই জমির কাগজপত্রগুলো ঠিকঠাক করে নিয়েছিলাম কিন্তু ঢাকায়। বসে সুন্দরপুরের বিশাল সম্পত্তি দখলে রাখাটা কঠিনই ছিলো।”
“পরে এমপির সাথে একটা রফা করে নিলেন? ফিফটি-ফিফটি? নাকি ফরটি-সিক্সটি?”
মুচকি হাসলো মুশকান। “এরকম কিছু করা হয় নি। জুবেরি আমার নামে যে অংশগুলো লিখে দিয়েছিলো সেগুলোর সবটাই ফিরে পাই তবে বিনিময়ে একটা আপোষ করতে হয়েছিলো আমাকে।”
“কি রকম?”
“অলোকনাথ বসু তার সম্পত্তির প্রায় ষাটভাগ দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে দান করে গেছিলেন…ঐ সম্পত্তিগুলো এমপির পকেটে চলে যায়। আর এটা করতে আমি তাকে সাহায্য করেছি। বলতে পারেন, সাহায্য করতে বাধ্য হয়েছি।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা। “তারপর চলে এলেন এখানে?”
“কিন্তু আপনার চাকরি? ওটা ছাড়লেন কেন?”
মুশকান চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। “ভালো লাগছিলো না। আমি আসলে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিলাম। সেই সুযোগটা এসে যায় এই সম্পত্তিগুলো পাবার পর। তখন ঠিক করলাম, আর চাকরি নয়…সব ছেড়েছুঁড়ে বহু দূরে গিয়ে থাকবো। তাছাড়া মৃত্যুর আগে রাশেদ আমাকে একটা রেসটুরেন্ট করার জন্য অনুরোধ করেছিলো। সে বলেছিলো, আমার জাদুকরি রান্নার স্বাদ থেকে মানুষজনকে বঞ্চিত করা ঠিক হচ্ছে না।” মুচকি হাসলো মুশকান। “এমনকি মৃত্যুর আগেও আমার হাত ধরে এ কথাটা বলেছিলো। বলতে পারেন, তার কথা রাখার জন্যই রবীন্দ্রনাথ করেছি। অবশ্য, ও ভাবে নি আমি এই সুন্দরপুরে এসে এটা করবো।”
