মাথা দোলালো মুশকান। “ওরা কেউ আমাকে বলে নি আপনি পুলিশ। ইনফ্যাক্ট, ওরা হঠাৎ করে আমার ফোনই ধরছে না। বলতে পারেন, সে কারণেই আমি ধরে নিয়েছি আপনি পুলিশই হবেন।”
“বাহ্, প্রশংসা না করে পারছি না।”
“কিসের?”
কথাটা বলার সময় মুশকান জুবেরির চাহনিটা ছফাকে মুগ্ধ করলো। “আপনার লজিক-সেন্সের।”
“ও।” একটু থেমে আবার বললো, “এখন বলুন, আমার বিরুদ্ধে আপনার অভিযোগটা কি? এটা জানার অধিকার নিশ্চয় আমার রয়েছে?”
“অবশ্যই,” বললো ছফা। “তবে তার আগে আমাকে বলুন আপনি কে, কোত্থেকে এসেছেন।”
এবার মুশকান ভুরু কুচকালো, তবে সামান্য সময়ের জন্য। “আমার সম্পর্কে কিছু না জেনেই এখানে চলে এসেছেন?”
“কিছু জানি না তা তো বলি নি…অনেক কিছুই জানি।”
“তাই?” মুচকি হাসলো মহিলা।
“শুনি তো, কি জানেন।”
ছফা গভীর করে দম নিয়ে নিলো। তার সহকারী যে তথ্য পাঠিয়েছে সেগুলো বলতে গেলে অকাট্য। “আমাকে পরীক্ষা করবেন না, ডাক্তার মুশকান সোহেলী!”
স্থিরচোখে চেয়ে রইলো মিসেস জুবেরি। তার চোখেমুখে কপট মুগ্ধতা।
“রাশেদ জুবেরিকে বিয়ে করার আগে তা-ই ছিলেন,” ছফা আয়েশ করে হেলান দিলো সোফায়। “সপরিবারে আমেরিকায় ছিলেন দীর্ঘদিন। তারপর হুট করেই দেশে চলে এলেন। ঢাকার অরিয়েন্ট হাসপাতালে যোগ দিলেন এক সময়।”
মুশকান কিছু বললো না। তার অভিব্যক্তি দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই সে কি ভাবছে।
“সেখানে রোগি হিসেবে পেয়ে গেলেন রাশেদ জুবেরিকে। উনি প্রোস্টেট ক্যান্সারে ভুগছিলেন। একেবারে টার্মিনাল স্টেজে ছিলেন। আপনাদের হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েছে ভদ্রলোক। অবিবাহিত বলে তাকে দেখাশোনা করার কেউ ছিলো না। বাবা-মা একাত্তরে মারা গেছে। বাবার দিক থেকে কিছু আত্মীয়-স্বজন থাকলেও মায়ের দিকে নিকট কোনো নিকটাত্মীয় বলতে গেলে এখন আর নেই।” একটু থামলো মহিলার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য, কিন্তু হতাশ হলো। মুখটা যেনো তৈলচিত্রের মতো স্থির হয়ে চেয়ে আছে তার দিকে। পলক প্রায় ফেলছেই না।
“রাশেদ জুবেরি প্রায় তিনমাস ছিলেন অরিয়েন্ট হাসপাতালে…তখনই আপনার সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক তৈরি হয় কিন্তু সেটা ডাক্তার-রোগির সম্পর্কের বাইরে কিছু ছিলো না…যতোটা আমি জেনেছি।” আবারো থামলো তবে এবার কথা গুছিয়ে নেবার জন্য। “রাশেদ জুবেরি বুঝে গেছিলেন উনি আর বেশি দিন বাঁচবেন না। কয়েক মাসের ব্যাপার। বেশ খাদ্যরসিক ছিলেন ভদ্রলোক, এটা-ওটা খেতে চাইতেন। কিন্তু তার সেই আব্দার পূরণ করার মতো কেউ ছিলো না…আপনি ছাড়া।”
মুশকনি এবার আলুতো করে হেসে বুকের কাছে দু-হাত ভাঁজ করলো।
“আপনি নিজের হাতে রান্না করে উনাকে খাওয়াতে শুরু করলেন। উনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন। সম্ভবত আপনার অসাধারণ রান্নায় সম্মোহিত হয়ে গেলেন পুরোপুরি। এজন্যে আমি ভদ্রলোককে অবশ্য দোষও দেই না। আপনার রান্না সতিই অতুলনীয়।”।
মুচকি হেসে ভুরু তুললো মুশকান জুবেরি। “এটা কি আপনার নিজস্ব মতামত?”
“বলতে পারেন..কারণ আমিও রবীন্দ্রনাথে খেয়েছি, অসাধারণ না বলে উপায় নেই।”
“ধন্যবাদ।”
“একটি প্রবাদ আছে…কারোর মন জয় করতে চাইলে আগে তার পাকস্থলী জয় করো। সেভাবেই আপনি রাশেদ জুবেরির মন জয় করতে সক্ষম হলেন…খুব দ্রুত।”
“আপনি কি শিওর, চা-কফি কিছু নেবেন না?” অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলে উঠলো মিসেস জুবেরি।
“নো থ্যাঙ্কস।”
“আমি যদি একটু কফি নেই তাহলে কিছু মনে করবেন? শীতকালে আমার ঘন ঘন চা-কফির তেষ্টা পায়…ওসব না-হলে মাথা ধরে আসে।”
“এটা আপনারই বাড়ি..জিজ্ঞেস করার কোনো দরকার নেই,” মুচকি হেসে বললো ছফা।
“থ্যাঙ্কস,” বলেই উঠে দাঁড়ালো মুশকান। বইয়ের শেলফের পাশে বাক্সের মতোন আসবাবের ভেতর থেকে একটা ফ্লাস্ক বের করে আনলো, সেইসাথে একটা কাপ। ফ্লাস্ক থেকে কফি ঢেলে নিলো। “একটু বেশি করেই বানিয়েছিলাম…ভেবেছিলাম আপনি হয়তো খাবেন…কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এ বাড়িতে কিছু খাবেন না বলে আগে থেকেই ঠিক করে এসেছেন।”
ছফা কিছু বললো না।
“কোমরে পিস্তল, বাইরে দু-জন পুলিশ, তারপরও কোনো পুরুষ মানুষ একজন নিরস্ত্র মহিলাকে ভয় পেলে অবাক হতেই হয়।” ফ্লাস্কটা রেখে চলে এলো আগের জায়গায়।
ছফা খুবই অবাক হলো কথাটা শুনে। পুলিশ হিসেবে তার কাছে পিস্তল থাকাটা স্বাভাবিক, এটা কাণ্ডজ্ঞান বলে ধরে নেয়া যায়, কিন্তু বাইরে যে দু-জন আছে সেটা কিভাবে জানতে পারলো এই মহিলা। “মনে হচ্ছে আপনার চোখ সবদিকেই থাকে,” আস্তে করে বললো সে। “অনেক কিছুই দেখতে পান?”
কফিতে চুমুক দিয়ে মাথা দোলালো মুশকান। “ব্যাপারটা অতো রহস্যময় নয়, যেমনটা আপনি আমার সবকিছুর বেলায় ভাবছেন,” একটু থেমে ইজিচেয়ারের পাশে একটা আবাবের দিকে ইশারা করলো। “ওখানে। একটা মনিটর আছে…তিন-চারটা সাভিল্যান্স ক্যামেরার ফিড দেখা যায়।”
তথ্যটা ছফাকে চমকে দিলো, সেইসাথে পেয়ে গেলো অনেকগুলো প্রশ্নের জবাব।
“কি হলো, বলুন?” কফির কাপটা ঠোঁটের কাছে এনে অভেদী দৃষ্টি হেনে বললো মুশকান জুবেরি।
“তারপর রাশেদ জুবেরি হাসপাতাল ছেড়ে বনানীতে নিজের বাড়িতে উঠলেন. আপনিও তার সঙ্গি হলেন।”
কফির কাপে নিঃশব্দে চুমুক দিলো মুশকান।
“উনার সার্বক্ষণিক দেখভালের দায়িত্ব নিলেন। ভদ্রলোক যতোদিন বেঁচে ছিলেন আপনি তার পাশেই ছিলেন। ধরে নিচ্ছি, রোজ রোজ উনাকে মনভোলানো খাবার রান্না করে খাওয়াতেন।”
