ছফা অনেক কষ্টে কথা বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখলো। সে চাইছে, আগে মুশকান জুবেরি নিজের মুখে সব বলুক।
“তাকা আমার কাছে অসহ্য ঠেকছিলো…তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিয়ে যে রকম পরিকল্পনা আমার ছিলো সেটা ঢাকায় কিংবা আশেপাশে করা সম্ভব ছিলো না।”
“কেন?”
“ঢাকায় কোনো কিছু বিশুদ্ধ, কেমিক্যালফ্রি..ফরমালিনমুক্ত পাওয়া যায় না। ডাক্তার হিসেবে অন্য অনেকের চেয়ে এটা আমি ভালো করেই জানতাম। তরিতরকারি, ফলমূল থেকে শুরু করে মাছ-মাংস, কোনো কিছুই এসব থেকে মুক্ত নয়। এমনকি, দুধ পর্যন্ত বিষে ভরা। আমি চাই নি। রবীন্দ্রনাথে এসব জিনিস দিয়ে রান্না করা হোক। তাছাড়া ওসব ভেজাল জিনিস ব্যবহার করে আমার মনমতো রেসিপি তৈরি করাও সম্ভব ছিলো না। স্বাদের ব্যাপারটা খুবই সূক্ষম। সামান্য হেরফের হলেও বদলে যায়।”
“আচ্ছা,” আস্তে করে বললো নুরে ছফা।
“কিন্তু এখানে প্রচুর আবাদি জমি আছে…থাকার মতো সুন্দর একটি বাডিও আছে, আমি ইচ্ছে করলে সবকিছুই ফলাতে পারি, চাষবাস করতে পারি, তাই ঠিক করলাম এখানেই চলে আসবো।”
“আপনি কি কুমীরের মাংস দিয়েও রেসিপি করেন নাকি?”
মুচকি হেসে মাথা দোলালো মুশকান। “না। ওগুলো মাত্র তিন-চার মাস ধরে ব্রিডিং করছি। অনেকটা শখে। তবে ভবিষ্যতে বিদেশে রপ্তানী করার পরিকল্পনা আছে আমার।”
“আপনার এই শখটা কিন্তু সিকিউরিটি পারপাসও সার্ভ করছে দারুণ আইডিয়া।”
এবার চোখ দিয়ে হাসলো মুশকান জুবেরি। “গতকাল রাতের আগে অবশ্য এটা বুঝতে পারি নি। এখন মনে হচ্ছে আইডিয়াটা আসলেই দারুণ।”
ভুরু কুচকালো ছফা। “আর গতরাতে ফালুকে দিয়ে মাটি খুঁড়ে কি পুঁতে ফেললেন? সেটাও কি কোনো শখ?”
এবার বেশ কিছুটা সময় ধরে মুশকান জুবেরি হাসলো, তবে একদম নিঃশব্দে। “দেখে ভয় পেয়েছিলেন নাকি?”
প্রশ্নটা ছফার পৌরুষে লাগলেও হজম করলে চুপচাপ।
“আমি স্প্যানিশ কুইজিন খুব পছন্দ করি। ওদের কিছু ধরণ আমি দেশীয় খাবারের সাথে ব্লেন্ডিং করে রেসিপি বানিয়েছি। এটাকে এক ধরণের ফিউশন বলতে পারেন। খাবারগুলো লোকে পছন্দও করেছে। আপনিও সেগুলো খেয়েছেন। সম্ভবত পছন্দও করেছেন।”
“রেস্টুরেন্টেও কি আপনার চোখ সবকিছু লক্ষ্য করে?” শেষ পর্যন্ত না বলে পারলো না। “আই মিন, সার্ভিল্যান্স করেন?”
“হোটেল-রেসটুরেন্টে সার্ভিল্যান্স ক্যামেরা থাকাটা তো খুবই সাধারণ ব্যাপার, তাই না?” একটু থেমে আবার বললো, “নাকি সুন্দরপুরের মতো গ্রামীণ এলাকায় ওসব থাকাটা বেমানান?”
এবার ছফা বুঝতে পারলো মুশকান জুবেরি কেন তার দিকে ওভাবে তাকিয়েছিলো। আগেভাগে কিছু টের পাওয়াটা আসলে কোনো রহস্যময় ব্যাপার নয়, এটা নিছকই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বাড়তি সুবিধা। রবীন্দ্রনাথের প্রাইভেট রুমে বসে কাস্টমারদের মনিটর করার সুবিধা রয়েছে। আর সেই সুবিধা ব্যবহার করেই মুশকান জুবেরি দেখেছে তার গতিবিধি, চাহনি। অন্যসব কাস্টমার থেকে খুব সহজেই তাকে আলাদা করতে পেরেছে।
“গতরাতে গর্ত করে কি মাটিচাপা দিলেন, সেটা কিন্তু বললেন না?” প্রসঙ্গে ফিরে এলো নুরে ছফা।
“বলছি। স্প্যানিশ কুইজিন…ওসবে প্রচর রেডওয়াইন ব্যবহার করা হয়…বলতে পারেন পানির বদলে রেডওয়াইন দেয় ওরা। ওখানে রেডওয়াইন খুবই অ্যাভেলেবেইল। সস্তাও বটে। বিশেষ করে খাবারে ব্যবহার করা হয়। যেগুলো।”
রেডওয়াইন! ছফার মাথায় নানান হিসেব জট পাকাতে লাগলো।
“এখানে…এই দেশে রেডওয়াইন খুব কমই পাওয়া যায়…ঢাকা থেকে আপনি কয়েক বোতল আনতে পারবেন কিন্তু দাম পড়বে অনেক..আর জিসিটা পুরোপুরি লিগ্যালও হবে না।” একটু থেমে আবার বললো, “ওভাবে রেডওয়াইন এনে রান্না করলে খাবারের দাম হবে আকাশছোঁয়া…তাছাড়া, সব সময় ওয়াইনের সরবরাহও থাকবে না।”
“তাই আপনি নিজেই রেডওয়াইন বানাতে শুরু করলেন?”
“হুম। এটা বানানো এমন কোনো কঠিন কাজ নয়। খুব সহজ।” তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “লাল আঙ্গুরের রস গেজানোর জন্য মাটির নীচে রাখার দরকার পড়ে…বুঝতে পেরেছেন?”
হতাশ এবং অসহায় বোধ করলো ছফা। মাটির নীচে তাহলে ওয়াইন রাখা হচ্ছিলো।
“বিশ্বাস না-হলে গতরাতে যেখানে ওয়াইনগুলো রেখেছি সেটা খুঁড়ে দেখতে পারেন।”
নিজের অভিব্যক্তি লুকানোর চেষ্টা করলো সে। বোঝাই যাচ্ছে তার সামনে যে বসে আছে সে থট-রিডিং করতে পারে। “আপনি নিশ্চয়ই সার্ভিল্যান্স ক্যামেরায় দেখেছিলেন আমি আপনার বাড়িতে ঢুকেছি?” আবারো প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলো।
“অবশ্যই।”
“তারপরও আমাকে ধরলেন না কেন? মানে, ধরার কোনো চেষ্টাই করেন নি…কেন?”
“আপনার জায়গায় সত্যিকারের কোনো চোর ঢুকলেও আমি ধরার চেষ্টা করতাম না…ওসব করে লাভ কি? আমি তো এখানে এমন কিছু করি না যে, খুব তটস্থ থাকতে হবে। কিংবা এমন কিছু রাখি না চুরির ভয়ে রাতে ঘুম হবে না।” একটু থেমে আবার বললো, “এর আগেও এরকমভাবে অনেকে এই বাড়িতে ঢুকেছে…তাদের কেউ কেউ চোর ছিলো…সবাই না। অনেকে আগ্রহ আর কৌতূহল থেকেও টু মেরেছে৷ একজন মহিলা শহর থেকে এসে এখানে থাকে…আগ্রহ হওয়াটাই স্বাভাবিক।”
“তাহলে ওদেরকে আপনি এমনি এমনি ছেড়ে দিয়েছেন? কিছুই করেন। নি?”
কপালের উপর থেকে একগাছি চুল সরিয়ে দিলো মুশকান। “একেবারে এমনি এমনি ছেড়ে দেই নি। একটু ভয় পাইয়ে দিয়েছি, যাতে এই বাড়ির ত্রি সীমানার মধ্যে কেউ না আসতে পারে।”
