“জি, স্যার।” দুজনে একসাথে জবাব দিলো।
“গুড৷” কথাটা বলেই মেইনগেটের দিকে পা বাড়ালো সে।
বন্ধ গেটটার সামনে আসতেই ছোটো গেটটা খুলে দিলো দারোয়ান। সম্ভবত ফুটো দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলো সে। তাকে দেখে নিঃশব্দে সালাম ঠুকলো ইয়াকুব। কিছু না বলে মাথা নীচু করে ঢুকে পড়লো ছফা। দরজাটা বন্ধ করেই বোবা দারোয়ান তাকে নিয়ে রওনা দিলো বাড়ির দিকে। চারপাশে চকিতে চোখ বুলালো। গতকালের মতোই সুনসান পুরো বাড়িটা। মূল বাড়ির সদর-দরজাটা খোলাই আছে। ভবনের ডানপাশে গাড়ি রাখার যে গ্যারাজটা আছে তার বাইরে পার্ক করে রাখা আছে একটি প্রাইভেটকার। ছফা বুঝতে পারলো, এটাই মুশকান জুবেরি ব্যবহার করে।
বোবাকে অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকে পড়লো সে। একটা মাঝারি গোছের হলওয়ে। দু-পাশে কতোগুলো দরজা, সবগুলোই বন্ধ। ভেতরটা মৃদু লালচে বাল্বের আলোয় কিছুটা আলোকিত। এই স্বল্প-আলো মনে করিয়ে দিচ্ছে বাড়িটার অতীত সময়কে।
হলওয়ের ডান দিকে একটা কাঠের সিঁড়ি। বোবা সেই সিঁড়ির সামনে এসে থেমে গেলো, হাত তুলে ইশারা করলো সোজা উপরে চলে যেতে। ছফা। কিছু বলতে গিয়েও বললো না। গভীর করে দম নিয়ে পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে।
কাঠের সিঁড়ি হলেও পুরোটাই কার্পেটে মোড়ানো। রেলিংটা চমৎকার নক্সা করা, কালচে বার্নিশ। সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে আরেকটা লালচে বাতি জ্বলছে। দোতলায় উঠতেই থমকে দাঁড়ালো সে। তার থেকে কয়েক গজ দুরে বুকের কাছে দু-হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে মুশকান জুবেরি। মহিলা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে মাথার উপরে একটা ছোটো ঝারবাতি জ্বলছে। খুবই মৃদু আলো আসছে সেটা থেকে। সেই আলোতে মুশকান জুবেরিকে অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে।
যথারীতি শাড়ি পরে আছে মহিলা। গায়ে একটা শাল, তবে গতরাতের মতো লাল নয়, ঘিয়েরঙ। শাড়িটাও জামদানি নয়, সাদারঙের সাধারণ সুতির। চোখে টানা করে কাজল দেয়া। চুলগুলো সুন্দর করে বেঁধে খোঁপা করে রেখেছে। কপালে লালটিপ। শালের সাথে ম্যাচ করে ঠোঁটে হালকা ঘিয়েরঙা লিপস্টিক। তার চোখের দৃষ্টি অন্তর্ভেদী, কিন্তু মোহনীয়। সত্যি বলতে দুর্দমনীয়!
ছফার ধারণা মহিলা তাকে প্রলুব্ধ করে বাগে আনার চেষ্টা করবে। মনে মনে মুচকি হাসলো সে। যদি ওরকম কিছু ভেবে থাকে তাহলে মিসেস জুবেরি বিরাট বড় ভুল করেছে। সব পুরুষমানুষ ঐ এমপি আর এসপির মতো নয়!
“আসুন,” বললো মুশকান।
সম্বিত ফিরে পেলো ছফা। এতোক্ষণ ধরে যে মহিলার দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতেই পারে নি।
মুশকান জুবেরি ঘুরে গেলো। তার পদক্ষেপ খুবই ছোটো; শান্ত; আর অভিজাত। ছফা তার পেছন পেছন গিয়ে ঢুকলো বড় একটা ঘরে। একেবারেই পুরনো আভিজাত্য নিয়ে সাজানো হয়েছে ঘরটা। কাঠের ফ্লোরটার বেশিরভাগ মোটা কার্পেটে মোড়ানো। উত্তর দিকের দেয়ালে দু দুটো বিশাল বুকশেলফ। সেই শেলফ দুটোর উপরে একটি হরিণ আর ভালুকের মাথা স্টাফ করা। পুরনো দিনের কলের গান গ্রামোফোন রয়েছে শেলফের পাশেই। ওটার পাশে ছোট্ট একটা র্যাকে প্রচুর লং-প্লে, যা আজকাল আর দেখা যায় না। একসেট পুরনো ধাঁচের সোফা রয়েছে ঘরে, আরো আছে মোড়া জাতীয় কিছু আসন। ঘরের এককোণে একটা ইজিচেয়ারও দেখতে পেলো। বড় আর আয়তক্ষেত্রের নীচু টেবিল, কিছু মাঝারিগোছের আসবাব, কফি টেবিল আর অসংখ্য অ্যান্টিকে সাজানো। ঘরটা দেখে ছফা বুঝতে পারলো এটা মুশকান জুবেরির স্টাডিরুম। এখানেই বাইরের মানুষজনের সাথে দেখা করে মহিলা, আবার বাকি সময়ে এটাই তার স্টাডিরুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
“বসুন,” একটা সিঙ্গেল সোফা দেখিয়ে বললো বাড়ির মালিক। নিজে বসলো একটু দূরে মোড়ার মতো আসনে।
ছফা ঘরটার চারপাশে আরেকবার তাকিয়ে বসে পড়লো। হাতাওয়ালা পুরনো দিনের সোফাটা বেশ আরামদায়ক।
“চা নাকি কফি, কোনটা নেবেন?” বেশ আন্তরিকভাবেই জানতে চাইলো মুশকান।
“কোনোটাই না,” মাথা দুলিয়ে বললো ছফা।
মুচকি হাসলো মিসেস জুবেরি। আমার বাসায় এসে কোনো কিছু খেতে ভয় পাচ্ছেন?”
“না,” জোর দিয়ে বললো ডিবির ইনভেস্টিগেটর। যদিও কথাটা একদিক থেকে সত্যি। অতি সতর্কতা তো এক ধরণের ভয়-ই! “আমি আসলে দরকারি কথা শোনার জন্য এসেছি।”
মুশকান স্থিরচোখে তাকিয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। “তার মানে, আপনার হাতে সময় খুব কম?”
“কার সময় কম সেটা সময় এলেই বোঝা যাবে।”
একটু ভেবে বললো মুশকান, “ঠিক আছে, তাহলে শুরু করুন।”
“এখানে আসার আমন্ত্রণটা কিন্তু আপনিই দিয়েছেন…আপনিই শুরু করুন।”
আবারো মুচকি হাসি দেখা গেলো মুশকানের ঠোঁটে। “আমি কিভাবে শুরু করবো? আমি তো জানিই না একজন পুলিশ কেন আমার পেছনে লেগেছে।”
ভুরু তুললো ছফা। “আপনি তাহলে জেনে গেছেন আমি পুলিশের লোক?”
“এটা জানা এমন আর কি।”
“কিন্তু আমার ফোন নাম্বারটা কিভাবে পেলেন?”
“এটা কি কঠিন কাজ?” মাথা দোলালো মিসেস জুবেরি। “ফোনের ব্যালান্স রিচার্জ করার জন্য এখানে খুব বেশি দোকান নেই।”
ভুরু কুচকে ফেললো ছফা। আতর আলী যেভাবে তার নাম্বার জোগাড় করেছিলো ঠিক একইভাবে মুশকান জুবেরিও হয়তো কাজের লোকজন কিংবা হোটেলের কর্মচারিদের দিয়ে তার নাম্বার বাগিয়ে নিয়েছে।
“আর আমি যে পুলিশ এটা নিশ্চয় এসপি কিংবা ওসি বলেছে? নাকি ঐ এমপি?”
