তবে এটা নিশ্চিত, উপরতলা থেকে চিৎকারটা এসেছে। আর সেটা কে দিয়েছে সে ভালো করেই জানে। সঙ্গে সঙ্গে দোতলায় ছুটে যাবার জন্য সিঁড়ির দিয়ে উঠতে লাগে, ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছাতেই মনে পড়ে যায়, পনেরো বিশ মিনিট আগে মুশকান ম্যাডাম তাকে বলেছিলো, খুব জরুরি কিছু কাজ করবে আজ, সে যেন উপরতলায় না আসে। যা-ই ঘটুক না কেন, উনি না। ডাকলে উপরতলায় যাওয়া যাবে না। সে-কারনে সাফিনা ল্যান্ডিংয়েই জমে গেলো। তার পা আর চললো না। ম্যাডামের কথার অবাধ্য হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি যখন বলেছেন, যা-ই ঘটুক না কেন তখন আর কোনো যুক্তিই খাটে না। দোতলায় যদি বোমাও ফাঁটে তাতেও কিছু করার নেই। বড়জোর সে ম্যাডামের কাছ থেকে ডাকের অপেক্ষায় থাকতে পারে। তাছাড়া এই ব্যাপারটা তো আর নতুন নয় যে সে উতলা হয়ে উঠবে। এর আগেও কয়েকবার দোতলা থেকে অদ্ভুত গোঙানি শুনতে পেয়েছিলো। খুব বেশি নয়। মৃদু। চাপা। এবং অল্প সময়ের জন্য। ওইসব ঘটনার আগেও ম্যাডাম তাকে বলতো, যা-ই ঘটুক না কেন। তখন অবশ্য ওর ঘর থেকেও বের হতে নিষেধ করতো। দরকার পড়লে উনি নিজেই ডাকবেন।
আজ দুপুরের পর থেকে ম্যাডামের আচরণ কেমনজানি মনে হচ্ছে তার কাছে। একটু অস্থিরতাও দেখেছে। ব্যাপারটা খুবই বিরল। এখানে আসার পর কোনোদিনই এক মুহূর্তের জন্যেও ম্যাডামকে অস্থির দেখে নি। যেনো অস্থির হবার দোষটা নিয়ে জন্মায়ই নি এই মহিলা। যা-ই ঘটুক, তিনি অটল, অবিচল। কোনো কিছুই তাকে ঘাবড়ে দিতে পারে না। দু-বছর আগে। একরাতে রবীন্দ্রনাথে আগুন লাগলো। ম্যানেজার আর ওখানে যারা থাকে তারা সবাই ছুটে এলো ম্যাডামের কাছে, উনি আগুনের কথা শুনে একটুও বিচলিত হলেন না। ঠাণ্ডা মাথায় বললেন, ফায়ার সার্ভিসে খবর দিলে অনেক সময় লাগবে। দূরের জেলাসদর থেকে আসতে আসতে রবীন্দ্রনাথ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে ততোক্ষণে। তারচেয়ে ভালো নিজেরাই আগুন নেভানোর চেষ্টা করা ভালো। গরু আর মুরগির খামার থেকে কিছু কর্মচারিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে পাঠিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথে। ওরা সবাই মিলে আগুন নেভাতে পারলেও বেশ ক্ষতি হয়ে গেছিলো, সেই ক্ষতির হিসেব যখন দিলো। ম্যানেজার, ম্যাডামের চোখে-মুখে কোনো বিকার ছিলো না। যেনো কিছুই হয় নি। সেই মুশকান ম্যাডাম আজ শুধু বিচলিতই নয়, একটু বিষণ্ণও বটে। বিকেলের পর থেকে তার মধ্যে একটু অস্থিরতা আর রাগও দেখেছে৷ এটাও বিরল ব্যাপার। এখন পর্যন্ত এই মহিলাকে কখনও রাগতে দেখে নি। এমনকি, ইয়াকুবের সাথে তার গোপন কাজ-কারবার দেখে ফেলার পরও রেগে যায়। নি। শুধুমাত্র সাবধান করে দিয়েছিলো কোনোভাবেই যেনো দুর্ঘটনা না ঘটে। এরপর থেকে সাফিনা সত্যি সত্যি সাবধানী হয়ে ওঠে। বোবাকে বাধ্য করে ওষুধের দোকানে যেতে। ওসব জিনিস ছাড়া কোনোভাবেই সে রাজি হয় না।
সাফিনা নেমে এলো সিঁড়ি দিয়ে। তার দৃষ্টি বেশ ঝাপসা হয়ে আসছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে, আর সেটাকে ছাপিয়ে গেলো অন্য একটি আশংকা। কেনজানি মনে হচ্ছে, আজকের রাতে তাদের অভিসারটি পণ্ড হয়ে যাবে।
.
অধ্যায় ৩৩
এসপি মনোয়ারের বাংলোয় নির্জন একটি ঘরে দরজা বন্ধ করে একঘণ্টা ধরে ফ্যাক্স করা রিপোর্টটি পড়ে গেলো ছফা। তার সহকারী জাওয়াদ নবীন হলেও দারুণ কাজ করেছে। ছেলেটার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে সে। এই ছেলে হাতেগোণা স্বল্প কিছু মানুষের মধ্যে পড়ে যাদেরকে যা বলা হবে। শুধু তা-ই করবে না, বরং যা বলতে ভুলে যাওয়া হয়েছে কিংবা যা বলা দরকার ছিলো তাও করবে। ছফাও কিছু কিছু বিষয় বলে নি, কিছু তার মনেও ছিলো না কিন্তু ছেলেটা সবই জোগাড় করেছে। তার রিপোর্টটাও বেশ গোছানো। ভাষা খুব সহজ আর স্পষ্ট। অনিশ্চয়তা তৈরি করে এমন কোনো শব্দ-বাক্য ব্যবহার করে নি।
রিপোর্টটা একবার নয় দুবার নয়, বেশ কয়েকবার পড়েছে সে। আর প্রতিবারই পড়েছে ধীরে ধীরে, সব কিছু বোধগম্য করার জন্য। পড়া শেষে কাগজগুলো বিছানার তোষকের নীচে রেখে দিলো। এই ঘরে কোনো ড্রয়ার নেই, ওয়াড্রবে যে ড্রয়ার আছে ওগুলোতে কোনো লক নেই।
দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখতে পেলো এসপি মনোয়ার ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখছে বিরসমুখে। ইফাঁকে দেখে মুখ তুলে তাকালো। ভদ্রলোক।
“এমপিসাহেব ফোন দিয়েছিলেন।”
“কখন?”
“আপনি ঘরে ঢোকার পর পরই।”
“কি বললেন?”
“আমি কলটা রিসিভ করি নি।”
“ও,” একটু থেমে আবার বললো, “মাত্র একবারই কল করেছিলেন?”
মাথা নেড়ে সায় দিলো এসপি।
“মনে হয় আর কল করবেন না।”
মনোয়ার হোসেন হিরচোখে চেয়ে রইলো।
ছফা ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন অনুভব করলো না। ঘরে ঢুকে রিপোর্টটা পড়ার আগেই সে ঢাকায় ফোন দিয়েছিলো এখানকার এমপিকে নিরস্ত করার অনুরোধ জানিয়ে। সম্ভবত সেটা করা হয়েছে। ওসি আর এসপি’কে যেভাবে মুখ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে ঠিক সেইমতো এমপিকেও মুখ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
“এরপর যদি আবার করে?” মনোয়ারসাহেব একটু ভেবে অবশেষে জানতে চাইলেন।
কাঁধ তুললো ছফা। “তাহলে আর কি, ধরবেন না। জাস্ট ইগনোর হিম ফর অ্যা হোয়াইল।” কথাটা বলেই পা বাড়ালো দরজার দিকে।
“আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
“হোটেলের রুম ছেড়ে দিয়ে লাগেজটা নিয়ে আসি৷” মনোয়ার সাহেব আর কিছু বললো না।
