হাসপাতালে যখন ছিলো তখন তার সহকারী ফোন করে জানিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পেরেছে সে। ছফা তাকে বলেছে মেইল না করে কিছুক্ষণ পর সুন্দরপুরের এসপির ফ্যাক্স-এ রিপোর্টটা পাঠিয়ে দিতে। তার সহকারী তাকে কিছুটা ধারণাও দিয়েছে তবে সেটা এসপির সাথে শেয়ার করে নি। আগাম সতর্কতা হিসেবে এসপিকে দিয়ে একটা কাজ করিয়েছে। মুশকান জুবেরির বাড়ির বাইরে সাদা পোশাকের দু-জন পুলিশ নিয়োজিত করা হয়েছে বিকেলের পর থেকে। ঐ মহিলা যেনো কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে যেতে না পারে। সেই সাথে ঐ দু-জনকে এটাও বলে দিয়েছে, কাজটা করতে হবে সতর্কতার সাথে, মহিলা যেনো কোনো কিছু আঁচ করতে না পারে। ছফা জানে এসপি মনোয়ার অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কাজটা করেছে। এ মুহূর্তে তাকে সহযোগীতা করা ছাড়া ভদ্রলোকের আর কোনো উপায় নেই।
এসপির বাংলোয় এসেই গোসল করে নিয়েছে। সারাদিনে এ কাজটি করার সুযোগ পায় নি। গোসল করার পর এক কাপ চা নিয়ে বসলো বাংলোর ড্রইংরুমে। এসপি মনোয়ার হোসেনও আছে তার সাথে, তবে ভদ্রলোক আগ বাড়িয়ে কিছু বলছে না।
ড্রইংরুমে রাখা ফ্যাক্স মেশিনটা বিপ্ করে উঠলে ছফা চেক করে দেখলো। এসপি মনোয়ার কিছু বলতে গিয়েও বললো না।
চায়ের কাপে দ্রুত কয়েকবার চুমুক দিয়ে চেয়ারে বসে পড়লো ছফা। তার সহকারী রিপোর্ট পাঠাতে শুরু করেছে। এরপর পাঁচ মিনিট ধরে ফ্যাক্স থেকে বের হয়ে এলে পুরো রিপোর্টটি। কাগজগুলো নিয়ে তার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে ঢুকে পড়লে এসপি কোনো প্রশ্ন না করে চুপচাপ চা খেতে লাগলো। বুঝতে পারছে ঢাকা থেকে মূল্যবান কিছু তথ্য এসেছে। মনে মনে সে এখনও মুশকান জুবেরির ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছে না। তার ধারণা তদন্তে আসল সত্য বের হয়ে এলে হয়তো দেখা যাবে মুশকান নয়, অন্য কোনো চক্র এসবের সাথে জড়িত, তাদের কারণেই মুশকানকে সন্দেহ করছে ছফা। তদন্তকাজে এরকম ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক নয়।
এমন সময় এসপি মনোয়ারের মোবাইলফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ডিসপ্লে দেখে কপাল কুচকালো সে। এটা আগেই আন্দাজ করেছিলো। লোকাল এমপি আসাদুল্লাহ ফোন দিয়েছে, সম্ভবত মুশকান জুবেরির ব্যাপারে কথা বলার জন্য। একটু ভেবে ফোনটার রিংটোন বন্ধ করে রেখে দিলো পাশের টেবিলে। এ মুহূর্তে কি না কি বলে ঐ নুরে ছফার রোষানলে পড়তে চাইছে না সে।
*
চারপাশে অন্ধকার নেমে এসেছে, যদিও রাত নামে নি এখনও। সময়ের হিসেবে সন্ধ্যা তবে ঘড়িতে এখনও ছয়টা বাজে নি। শীতকাল বলে দ্রুত সূর্য ডুবে গেছে।
জমিদার বাড়ির মেইনগেট থেকে একটু দূরে, বড় একটা গাছের নীচে দু-জন মানুষ দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুকে যাচ্ছে। বোবা দারোয়ান তাদের দেখতে পায় নি। বেশ সতর্কভাবেই দারোয়ানের দৃষ্টি এড়িয়ে চলছে তারা।
অলোকনাথ বসুর বিশাল বাড়িটি আর সব দিনের মতোই সুনসান। কোনো মানুষ বের হয় নি, ভেতরেও যায় নি কেউ। যে দু-জন লোক নজর রাখছে তারা নিজেদের মধ্যে খোশগল্প করেই সময় পার করে দিচ্ছে। মুশকান জুবেরির মতো একজন মহিলাকে কেন এভাবে নজরদারি করা হচ্ছে তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে রসালো আলাপ করছে তারা।
দেড়ঘণ্টা ধরে ডিউটিতে আছে, এখন পর্যন্ত কাউকে আসা-যাওয়া করতে দেখে নি। এই সময়ের মধ্যে একটা টু শব্দও শোনে নি তারা। যেনো মৃতপূরীর মতো বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। নীচুস্বরে নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় হঠাৎ দূর থেকে একটা চিৎকার ভেসে এলে দু-জনেই শুনতে পেলো সেটা।
একটা নারীকণ্ঠ!
একে অপরের দিকে তাকালো। এটা কি রিপোর্ট করার মতো কিছু? তারা একমত হতে পারলো না। তাদেরকে শুধু বলা হয়েছে ওই বাড়ি থেকে যেনো কেউ বাইরে বের হতে না পারে সেটা দেখতে। বাড়ির ভেতরে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেটা তাদের দেখার বিষয় নয়। তাছাড়া চিৎকারটা মাত্র দু-বার হতেই থেমে গেছে। আর কোনো সাড়াশব্দ হলো না বলে দু-জনে আবার ফিরে গেলো নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায়।
*
বোবা ইয়াকুব মেইনগেটের পেছনে বসে থাকলেও তার কোনো ধারণাই নেই বাইরে দু দু-জন লোক এই বাড়ির দিকে নজর রাখছে। বোবা বলে দোতলা থেকে যে নারীকন্ঠের চিৎকার ভেসে এসেছে সেটা শুনতে পায় নি। ছোট্ট একটা টুলের উপর বসে আসন্ন অভিসারের চিন্তায় মশগুল সে। বিকেলের আগে একটা কাজে রবীন্দ্রনাথে গেছিলো, ফেরার পথে এক প্যাকেট নিয়ে এসেছে। সাফিনা তাকে ইশারা দিয়েছে, আজ হবে। সেই হবে’র আশায়। ভেতরটা ছটফট করছে। তবে সে জানে, বেশি ছটফট করে লাভ নেই। রাত নামুক, গাঢ় হোক, সবাই ঘুমিয়ে পড়ুক, তারপর…
বাড়িটার দিকে তাকালো। দোতলার একটি রুমে আলো জ্বলছে। নীচতলার একটি রুমেও এইমাত্র আলো জ্বলে উঠলো। এখন জানালার সামনে এসে ইচ্ছে করে বার বার বুকের আঁচল ফেলে ঠিক করছে না, তাকে ক্ষেপিয়ে তুলছে না। মেয়েটা এভাবেই তাকে পাগল করে তোলে সব সময়। জংলি বানিয়ে দেয় তাকে। কিন্তু বোবা অবাক হয়ে দেখতে পেলো সাফিনা আজ জানালার সামনে আসছে না। অধীর আগ্রহে সে চেয়ে রইলো।
*
ওদিকে সাফিনা এখন দোতলায় ওঠার সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে। একটু আগে উপর থেকে অদভুত এক চিৎকার শুনতে পেয়েছে সে। নিজের ঘরের খাটে একটু চোখ বন্ধ করে আধোঘুমে চলে গেছিলো। হঠাৎ এই চিৎকারটাই তার কাঁচা ঘুম ভেঙে দিয়েছে। ঘরের বাতি জ্বালিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করলেও আর কোনো আওয়াজ শুনতে পায় নি।
