“আপনে?” ছফাকে দেখে বললো সেই লোক। “কারে খুঁজতে আইছেন?”
ছফা প্রথমে ভাবলো আতরের কথা বলবে, কিনতু সেটা বাতিল করে দিলো। “ফালুকে।” অবশেষে গোরখোদকের নামটাই বললো সে।
“ফালুরে খুঁজতাছেন?” অবাক হলো মাঝবয়সি লোকটা। “ওরে তো আমরাও খুঁজতাছি, কই যে গেছে কে জানে! কাইল রাইতে খুঁজতে আইলাম দেখি ফালু ঘরে নাই…আইজ সকালে আইসা যহন কইলাম, কয় সে নাকি ঘরেই আছিলো…এহন আবার লাপাত্তা। পোলাটার কী হইছে কে জানে।”
ছফা ভুরু কুচকে চেয়ে রইলো লোকটার দিকে।
“জানাযা পড়ন শ্যাষ.. মুরদা লইয়া বইসা আছি.ফালুর কুনো খবর নাই..কব্বরটা খুইদা আবার মাটি দিয়া ভইরা রাখছে…ক তো দেহি কী কারবার।”
কবর! সতর্ক হয়ে উঠলো ছফা। মাটি দিয়ে ভরাট করে রেখেছে। নড়েচড়ে উঠলো সে। “আতরকে দেখেছেন? আতর আলী..ইনফর্মার?”
লোকটা বেশ অবাক হলো। “আতর এইহানে কেন আইবো? আজব কথা কইলেন।”
“ও এখানে নেই?”
এবার বিরক্তই হলো মাঝবয়সি লোকটি। “পুরো! আমরা খুঁইজা মরতাছি। ফালুরে আর আপনে আইছেন…” বিরক্ত হয়ে লোকটা পা বাড়ালো একটু দুরে লাশকে ঘিরে থাকা লোকজনের দিকে। “কইথেকা এইসব মানুষ আইছে আল্লায়ই জানে…” বিড়বিড় করে বলতে বলতে চলে গেলো সে।
ছফার মাথা দ্রুত হিসেব করে চললো। আর এখানে এসেছে অথচ সে নেই। ফালুও নেই। কি হতে পারে? “ভাই, শোনেন?” চট করে পেছন থেকে ডেকে উঠলো সে।
লোকটা দ্বিগুন বিরক্তি নিয়ে ফিরে তাকালো। “আবার কি হইছে?”
“যে কবরটা ভরাট করে ফেলেছে সেটা কোথায়?”
লোকটা একটু রুষ্টই হলো প্রশ্নটা শুনে। “ঐ-দিকে৷” আঙুল তুলে কবরস্তানের একটি জায়গা দেখিয়ে দিলো সে।
ছফা কিছু না বলে পা বাড়ালো সেদিকে। কবরটার পাশে এখনও বেশ কিছু আলগা মাটির স্তূপ রয়ে গেছে। একটা কোদাল আর বেতের টুকরি পড়ে আছে সেই স্তূপের কাছে। কবরের সামনে এসে ভালো করে দেখলো। অর্ধেকেরও বেশি ভরাট করে ফেলা হয়েছে আলগা মাটি দিয়ে। কাজটা যে খুব তাড়াহুড়া করে করা হয়েছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। কবরের উপরে আলগা মাটির স্তূপের দিকে তাকালো। অনেকগুলো নগ্ন পায়ের ছাপ রয়েছে। নিশ্চয়ই গোরখোদকেরই হবে। কিন্তু এখানে এটাই একমাত্র পদচিহ্ন নয়। আরেকটা ছাপ চোখে পড়লো তার। স্যান্ডেলের ছাপ। তারপরই একটা জিনিস চোখে পড়লো।
কবরের ঠিক পাশেই আলগা মাটির মধ্যে সস্তা একটি মোবাইলফোন নরম মাটিতে দেবে আছে। দেখামাত্রই চিনতে পারলো সে।
আতর!
সঙ্গে সঙ্গে কবরে নেমে পড়লো সে। তাকে এটা করতে দেখে লাশের সঙ্গে আসা ক্ষুব্ধ মানুষগুলো বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলো কয়েক মুহূর্তের জন্য। উদভ্রান্তের মতো আলগা মাটিগুলো হাত দিয়ে সরাতে শুরু করলো ছফা।
“কি হইছে, ভাই?” লাশের সঙ্গে আসা এক লোক জিজ্ঞেস করলো, বিস্ফারিত চোখে ছফার কাজ দেখছে সে। তার পেছনে জড়ো হয়ে গেলো আরো পাঁচ-ছয়জন।
ছফা জবা দেবার আগেই আতরের একটা হাত বেরিয়ে এলো মাটি সরাতে। “ভাই! আমাকে একটু হেল্প করেন! জলদি!” চিৎকার করে বললো
এরইমধ্যে কবরের পাশে যে জটলা তৈরি হয়েছে সেখান থেকে দু-জন তরুণ নেমে পড়লো কবরে। তিনজনের প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যেই আতর আলীর নিথর দেহটা মাটির নীচ থেকে টেনে বের করতে পারলো।
লাশের খাটোলা ঘিরে যে জটলা ছিলো সেটা মুহূর্তে সরে গেলো কবরের দিকে। একাকী হয়ে গেলো গোর দিতে আনা শবটি! কবর থেকে আতরের নিথর দেহটা উপরে তুলে আনা হলো। ইনফর্মারের সারা গায়ে মাটি লেগে একাকার, তারপরও থেতলে যাওয়া মাথাটা যে রক্তে একাকার বোঝা গেলো। প্রথমেই আতরের পালস দেখতে চাইলে ছফা। ঘাড়ে, হাতে আঙুল রেখে বোঝার চেষ্টা করলো সে এখনও বেঁচে আছে কিনা। পালস খুঁজে পেতে একটু বেগ পেতে হলো। তার কাছে মনে হচ্ছে বড় দেরি হয়ে গেছে। হাল ছেড়ে দিয়ে অসহায়ের মতো আশেপাশে তাকালো সে। লোকটার এমন পরিণতির জন্য নিজেকেই দায়ি করলো।
“বাইচা আছে!” হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো একজন। “এহনও বাঁইচা আছে!”
.
অধ্যায় ৩২
বিকেলের মধ্যেই সুন্দরপুরে একটা কথা চাউড় হয়ে গেলো : গোরখোদক ফালু আতরকে খুন করে পালিয়েছে, তবে কেউ তাকে পালাতে দেখে নি! খুনোখুনির চেয়েও বেশি আলোচনা হচ্ছে কেন এবং কি কারণে এমনটা ঘটলো। এ প্রশ্নের জবাব কারো কাছে নেই। সবাই যার যার মতো করে ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করছে।
স্বস্তির ব্যাপার হলো আতর এখনও মরে নি। সদরের সরকারী হাসপাতালে আছে সে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছে তার মাথার আঘাত গুরুতর হলেও ভাগ্যক্রমে বিপদমুক্ত হয়ে গেছে। জ্ঞান ফিরে এসেছে ইনফর্মারের। তবে আবোল-তাবোল বকছে বলে ডাক্তার কড়া ডোজের প্যাথেড্রিন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে।
সন্ধ্যা পর্যন্ত ছফা হাসপাতালেই ছিলো, তারপর সোজা চলে আসে এসপির বাংলোতে। মনোয়ার হোসেন এতে খুশিই হয়েছে। ছফাকে কাছে। পেয়ে সম্পর্কটা একটু গাঢ় করা যাবে। যা হয়েছে তা ভুলিয়ে দেয়া যাবে। বাংলোতে এসপি সপরিবারে থাকে না, তার পরিবার থাকে ঢাকায়। ছফাও ভেবে দেখেছে, তার পরিচয় জানাজানি হবার পর হোটেলে থাকার কোনো মানেই হয় না। তাছাড়া সে আর বেশি দিন থাকছে না এখানে। এ কয়টা দিন সানমুনের মতো নিম্নমানের হোটেলে থাকাই যেতো, ওটার বাথরুমগুলোর দুর্গন্ধ নাক চেপে সহ্য করাও সমস্যা হতো না কিন্তু অন্য একটা কারণে সে এসপির বাংলোতে উঠেছে-ঢাকার সাথে অনায়াসে যোগাযোগ করা যাবে এখান থেকে। ফ্যাক্স মেশিন আর ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা আছে এসপির বাংলোতে।
