চিন্তিত মুখে রবীন্দ্রনাথের উল্টোদিকে রহমান মিয়ার দোকানে এসে বসলো সে। একটু আগে কেএস খানের সাথে কথা বলেই সে আতরকে ফোন দিয়ে বলেছিলো সে যেনো ফালুর অ্যাডভান্স কবর খোরার ব্যাপারে কিছু তথ্য জোগাড় করে দেয়। কিন্তু এখন তার ফোনটা বন্ধ পাচ্ছে। অথচ থানা থেকে এসপির অফিসে যাবার আগে সে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলো আতর যেনো তার ফোনটা চালু রাখে।
“চা খাইবেন?”
দোকানির প্রশ্নে মাথা নেড়ে সায় দিলো। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে দেখলো কোনো সিগারেট নেই। “একটা সিগারেটও দিয়েন।”
“একটা দিমু? নাকি এক প্যাকেট?”
উদাস হয়ে দোকানির দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে বললো, “এক প্যাকেটই দেন তাহলে।”
রহমান মিয়ার মুখে খুশির ঝলক দেখা গেলো। মাথার মধ্যে লাভের হিসেবটা আপনা-আপনি শুরু হয়ে গেলো আবার। ঝটপট সিগারেটের প্যাকেটটা কাস্টমারকে দিয়েই গুড়ের চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো সে।
“আচ্ছা, আতর আলীকে দেখেছেন?”
চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো লোকটি, “হেরে তো এটু আগে জোড়পুকুরের দিকে যাইতে দেখলাম।”
চায়ের কাপটা না ধরেই অবাক চোখে তাকালো সে।
“কখন?”
“এই তো, এটটু আগেই।”
সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো ছফা। আতর জোড়পুকুরে গেছে! অতিরিক্ত কৌতূহল দেখাতে গিয়ে আবার জমিদার বাড়িতে গেলে না তো? অজানা। আশংকা জেঁকে বসলো তার মধ্যে।
“আমার কতো হয়েছে?” তাড়াহূড়া করে জানতে চাইলো।
“চা খাইবেন না?”
“চা-সহ কতো হয়েছে, বলুন?”
“একশ ষাইট ট্যাকা…” অঙ্কটা তার একদম হিসেব করাই ছিলো।
ঝটপট টাকাটা দিয়ে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে গেলো নুরে ছফা, রিক্সার জন্য অপেক্ষা করলো না। এই কাঁচা রাস্তায় রিক্সা যতো দ্রুত যাবে তারচেয়ে পায়ে হেঁটে আরো বেশি গতিতে ছোটা সম্ভব।
মাটির রাস্তা দিয়ে দ্রুতপায়ে ছুটতে লাগলো সে। বুঝতে পারছে না, আতর কেন হ্রট করে জমিদার বাড়ির দিকে গেলো। তার মোবাইলফোনটাও বন্ধ! ইনফর্মারের কি খারাপ কিছু হয়েছে? মাথা ঝাঁকিয়ে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করলো। এসব ভাবতে ভাবতে জমিদার বাড়ির একেবারে কাছে চলে এলো সে। মেইনগেটের সামনে দিয়ে চলে যাবার সময় থমকে দাঁড়ালো।
শ্বেতশুভ্র চুলের এক বৃদ্ধ মেইনগেটের মধ্যে মানুষজনের ব্যবহারের জন্য যে ছোটো গেটটা আছে সেটা দিয়ে বের হয়ে আসছে।
রমাকান্তকামার!? বিস্মিত ছফা চেয়ে রইলো ভদ্রলোকের দিকে। মাস্টার এই বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। তার ধারণা ছিলো মুশকান জুবেরির সাথে মাস্টারের কোনো যোগাযোগ নেই।
বৃদ্ধমাস্টার ধীরপায়ে এগিয়ে আসতেই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছফাকে দেখতে পেয়ে কেমন বিব্রত হলেন।
“আপনি?” মাস্টার কাছে আসতেই বলে উঠলো ছফা।
মুখ তুলে তাকালেন বৃদ্ধ। “ঐদিন রাতে আপনিই তো আমার বাড়িতে গিয়েছিলেন, তাই না?”
“হ্যাঁ,” কাটাকাটাভাবে জবাব দিলো সে।
“তো এখন কি পাত্রির বাড়িতে যাচ্ছেন?”
মাস্টারের কথার খোঁচায় মুচকি হাসলো ছফা। “আমি কোথায় যাচ্ছি। সেটা সময় হলেই জানতে পারবেন, কিন্তু আপনি কেন এখানে এসেছেন। সেটাই বুঝতে পারছি না।”
– “ও..তাহলে আমার উপরেও নজর রাখছিলেন?” মাস্টারের চেহারা কঠিন হয়ে গেলো, “ওই টাউটটাকে দিয়ে?”
“কার কথা বলছেন?” ভুরু কুচকে ফেললো ছফা।
এবার মুচকি হাসলেন রমাকান্তকামার। “আতর…” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। “একটু আগে ও আমাকে দেখেছে এখানে ঢুকতে চাইলে আমি ওকে ধোঁকা দিতে পারতাম কিন্তু আমি সেটা কেন করবো? এ জীবনে আমি কখনও কাউকে ধোঁকা দেইনি।”
নড়েচড়ে উঠলো সে। “আতরকে দেখেছে? কখন? কোথায়?”
এবার মাস্টার অবাক হলেন। “এই যে, একটু আগে…আমি যখন বোসবাবুর বাড়িতে আসছিলাম।”
“আতর তাহলে কোথায় যাচ্ছিলো?”
ভুরু কোচকালেন রমাকান্তমাস্টার। “ঐ যে ওখানে,” একটু দূরে পুবদিকের বিস্তৃর্ণ ক্ষেতের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন।
“ওখানে?” চট করে সেদিকে তাকিয়ে বৃদ্ধের দিকে ফিরলো। “ওখানে কোথায়?”
“আমি কি জানি,” কথাটা বলেই আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো ছফা। ওই দিক দিয়ে আতর কোথায় গেছে? ভাবনাটা তার মাথায় আসতেই চমকে উঠলো।
কবরস্তান! গোরখোদক! ফালু!
সঙ্গে সঙ্গে বিসতৃর্ণ ক্ষেতের উপর দিয়ে দৌড়ে গেলো ছফা। রমাকান্ত মাস্টার ভড়কে গিয়ে চেয়ে রইলেন তার দিকে। ভদ্রলোকের চোখে রাজ্যের বিস্ময়। কিন্তু সেই অভিব্যক্তি দেখার ফুরসত নেই নুরে ছফার। প্রাণপণে দৌড়াতে দৌড়াতে একটা প্রার্থনাই করলো মনে মনে : আতরের যেনো খারাপ কিছু না-হয়।
চারপাশের ক্ষেতি জমি থেকে বেশ উঁচু কবরস্তানটির কাছে আসতেই ছফা দেখতে পেলো একগুচ্ছ সাদা-পিপড়ার মতো মানুষ জড়ো হয়ে আছে! ক্ষণিকের জন্যে থমকে দাঁড়ালো সে। চোখ কুচকে দেখার চেষ্টা করলো, তারপর আবারো পা বাড়ালো কবরস্তানের দিকে। এবার না দেীড়ে, জোরে জোরে হেঁটে।
একটা লাশ ঘিরে আছে জনাবিশেক মানুষ। বেশিরভাগেরই পরনে সাদা পাঞ্জাবি, পায়জামা নয়তো লুঙ্গি। সবার মাথায় টুপি। তাদেরই একজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো তার। মাঝবয়সি লোকটা অচেনা একজনকে কবরস্তানে ঢুকতে দেখে ভুরু কুচকালো। এরকম সময় প্যান্ট শার্ট, জ্যাকেট আর জুতো পরা কাউকে দেখে অবাক মনে হলো তাকে।
