কথাটা শুনে ফালুর বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছিলো। মানুষের হাডিড গুডিডও বিক্রি করার জিনিস?! কোন পাগলে এসব কিনবে?
হাসতে হাসতে সোমারাণী তাকে জানায়, দিন-দুনিয়ার কোনো খবরই সে রাখে না। এক একটা কঙ্কাল পাঁচ-ছয়হাজার টাকায় বেচা যায়। সুন্দরপুরের বড় কবরস্তানের একচ্ছত্র মালিক হয়ে মাটির নীচে লাখ-লাখ টাকা রেখে সে ফকিরি হালতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ঠিক আছে, কঙ্কাল না-হয় তুললো কবর থেকে কিন্তু বিক্রি করবে কার কাছে?
পানখাওয়া লালচে ঠোঁট বেঁকিয়ে এই সমস্যার সমাধানও দিয়ে দেয়। সোমারাণী। তার কাছে কতো লোকই তো আসে। নানান পেশার মানুষ তারা। এদের মধ্যে এমন একজনও আছে যে বড়-বড় মেডিকেল কলেজগুলোতে নরকঙ্কাল বিক্রি করে ভালোই টু-পাইস কামাচ্ছে।
শুরু হলো ফালুর কঙ্কাল ব্যবসা। টাকায় টান পড়লেই পুরনো কবর থেকে কঙ্কাল বের করে বিক্রি করে দিতে শুরু করলো। কিন্তু এমন নিরাপদ কাজেও ঝামেলা দেখা দিলে অচিরেই। এক পুরনো কবর থেকে হাড়ি-গুড়ি সরানোর পর পরই কাকতালীয়ভারে কঙ্কালের বড়ছেলে এসে হাজির কবরস্থানে! ঐদিনটি নাকি তার মরহূম পিতার মৃত্যুবার্ষিকী! দীর্ঘ দশবছর পর বিদেশ থেকে দেশে ফিরে পিতৃশোকে উতলা হয়ে ছুটে এসেছে। এখন মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বাবার কবরে আগরবাতি জ্বালাবে, ফাতেহা পাঠ করবে। কিন্তু একি অবস্থা তার পিতার কবরের?! এ তো মাটির গর্ত! ভেতরে কিছুই নেই!
ফালুর পক্ষে ঐ সময় যুতসই জবাব দেয়া সম্ভব ছিলো না, কিন্তু মরহুমের বড়ছেলের সঙ্গে আসা এক বয়স্ক আত্মীয় বাঁচিয়ে দেয় তাকে। পুরনো কবর, নিশ্চয় শেয়াল-খাটাশ গর্ত করে ঢুকে হাড়ি-গুড়ি নিয়ে সটকে পড়েছে।
এমন ব্যাখ্যায় প্রবাসী সন্তুষ্ট হয়েছিলো। হাডিড-গুডিডবিহীন মাটির গর্তের সামনে বসেই ফাতেহা পাঠ করে চুপচাপ বিদায় নেয় বেচারি। হাফ ছেড়ে বাঁচে ফালু। এই ঘটনার পর সে আর ঝুঁকি নেয় নি, আবার কঙ্কাল সরানোর মতো লাভজনক কাজ থেকেও বিরত রাখতে পারে নি নিজেকে। অনেক ভেবেচিন্তে চমৎকার একটি কৌশল বের করে। সরাসরি পুরনো কবর উন্মুক্ত করে কঙ্কাল সরানো বাদ দিয়ে দেয়, তার বদলে পাশে আরেকটি নতুন কবর খুরে সেই কবরের নীচ দিয়ে মাটি কেটে কঙ্কাল বের করে আনাটাই বরং নিরাপদ। এর ফলে কেউ বুঝতেই পারবে না পুরনো কবরের নীচে আদৌ কোনো হাডিউ-গুডিড অবশিষ্ট আছে কি নেই। কেউ তো আর কবর খুলে দেখে না, ভেতরে কঙ্কাল আছে কিনা।
কিন্তু এমন নিরাপদ কৌশল বিপদ ডেকে না আনলেও আপদ ঠিকই ডেকে আনলো তার জন্য। একদিন কঙ্কাল সরানোর জন্য পুরনো এক কবরের পাশে নতুন একটি কবর খুরছিলো সে, ঠিক সেই সময় নির্জন। গোরস্তানে এসে হাজির হয় গ্রামের এক লোক। তার ছোটোভাইটি অকালে মারা গেছে গত বছর। সেই ভায়ের কবর জিয়ারত করতে এসে দেখে ফালু নতুন কবর খুরছে। সঙ্গত কারণেই সে জানতে চায় তাদের গ্রামে কে মারা গেছে-কার জন্য কবর খুরছে?
মাটি কেটে পরিশ্রান্ত ফালু এমনিতেই ভড়কে গেছিলো লোকটার আগমনে, তার উপরে এমন বেমক্কা প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে যায়। জোর করে নিজের ভড়কে যাওয়াটা লুকাতে গিয়ে ঠাট্টাচ্ছলে বলে ফেলে, কেউ মারা যায় নি, তবে তার মন বলছে কেউ মরবে, তাই আগেভাগে একটা কবর খুরে রাখছে!
কথাটা শুনে ঐ লোক ভুরু কুচকে চোখমুখ বিকৃত করে চলে গেছিলো, ভেবেছিলো গোরখোদকের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু ঐদিন সন্ধ্যার পরই যখন তাদের গ্রামের এক বুড়ি সত্যি সত্যি মারা গেলো তখন লোকটা রটাতে শুরু করলো, ফালু এই মৃত্যুর খবর আগেভাগেই জেনে গেছিলো, সেজন্যে আগাম একটা কবর খুঁড়ে রেখেছিলো সে। পোলাটা নিশ্চয় কামেল কেউই হবে। কার ভেতরে কি আছে কে জানে? তাকে হেলাফেলা করা ঠিক হবে না।
কুসংস্কারগ্রস্ত গ্রামের সহজ-সরল মানুষ এটা লুফে নিলো। তারা তো এরকম কামেল লোকজনের আর্বিভাবের অপেক্ষায় মুখিয়েই থাকে সব সময়।
এরকম ঘটনা কাকতালীয়ভাবে আরো একবার হয়ে গেলে ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠিতই হয়ে গেলো সুন্দরপুরে। আর অবাক হয়ে ফালু আবিষ্কার করলো, গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ তাকে সমীহ করতে শুরু করেছে। কারো বাড়িতে কেউ অসুখে পড়লে তাকে দাওয়াত করে নিয়ে গিয়ে ভালোমন্দ খাওয়ায়। হাতে কিছু টাকা-পয়সাও খুঁজে দেয়-যেনো আজরাইলকে আপাতত তাদের বাড়ির দিকে যাত্রা করা থেকে বিরত রাখে সে!
খুব দ্রুতই সুন্দরপুরে চাউর হয়ে গেলো ফালুর অ্যাডভান্স কবর খোরার কাহিনীটি।
এখন গাছের নীচে বসে দূর থেকে সে দেখতে পাচ্ছে বড় কবরস্তানে মানুষজনের ছোটাছুটি। তার আর বুঝতে বাকি নেই সবাই এতোক্ষণে জেনে গেছে আতরকে খুন করে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে।
তার চেহারা এতোটাই পরিচিত যে ইচ্ছে করলেও এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারবে না। গভীর রাত না নামলে পালানোটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু এই গাছের নীচে বসে থেকে তো রাতের জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না।
কারো না কারোর চোখে ঠিকই পড়ে যাবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে নিরাপদ কোনো আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু সে-রকম জায়গা কোথায়?
ফালু চারপাশে তাকাতে শুরু করলো নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য।
৭. নুরে ছফা বুঝতে পারছে না
অধ্যায় ৩১
নুরে ছফা বুঝতে পারছে না আতর আলী গেলো কোথায়।
