বদমাশ আতরকে মেরে কবরে ফেলে মাটিচাপা দেবার সময় দেখতে পায় বহূ দূরে, কবরস্তানে আসা-যাওয়ার একমাত্র মেঠোপথটি দিয়ে লোকজন মুর্দা নিয়ে চলে আসছে। দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে যায় তার ঝুপড়ি ঘরে, ঝটপট জামা পাল্টে দরকারি কিছু জিনিসপত্র, কাপড়চোপড় আর খাটের নীচ থেকে ঐ কঙ্কালটা ব্যাগে ভরে কবরস্তানের উত্তর দিক দিয়ে পালিয়ে যায় সে। ওইদিকটা মানুষজন চলাচলের অনুপযোগী, ঝোপঝাঁড় আর জায়গায় জায়গায় ডোবা-নালায়পূর্ণ বিস্তীর্ণ একটি প্রান্তর।
অনেকটা পথ দৌড়ে থমকে দাঁড়ালো সে। ফিরে তাকালো পেছনে। তাকে কেউ দেখে নি। একটা বড় গাছের নীচে বসে পড়লো। কোথায় যাবে। বুঝতে পারছে না। গঞ্জে যে তার একজন রক্ষিতা আছে, সেই সোমারাণীর কাছে যাওয়া যাবে না। ঐ মেয়ে যখন জানতে পারবে সে খুন করে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে তখন তাকে দুর-দুর করে তাড়িয়ে দিতে একমুহূর্তও দেরি করবে না। ঐ নষ্টা মেয়েমানুষ মুখে যতো কথাই বলুক, যত আদর-সোহাগই করুক, নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না। প্রথমদিকে না বুঝলেও ফালু এখন বেশ বুঝতে পারে এটা। অথচ কতো বোকাই না ছিলো সে। মেয়েটাতে এমন মজে গেলো যে, তাকে ছাড়া আর কিছুই বুঝতো না। দু-বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত মেয়েটার ঘোরে আটকে ছিলো, তারপরই বুঝতে পারে, গঞ্জের মেয়েমানুষের প্রেম শুধু টাকার কাছেই বিক্রি হয়।
এই মেয়েটার জন্য কী-ই না করেছে সে! লুকিয়ে লুকিয়ে গঞ্জে গিয়ে মেয়েটার সাথে ওসব করাটা যখন নেশা হয়ে গেলো তখন বাস্তবিক কারণেই টাকায় টান পড়লো। একজন গোরখোদকের আর কতই বা আয়রোজগার, তার পক্ষে তো গঞ্জের মেয়েমানুষের নানান ধরণের বায়না মেটানো সহজ কথা নয়। প্রথম প্রথম সে টাকার টান পড়লেই মাটিকাটার কাজ করে বাড়তি আয় করার চেষ্টা করতো। এভাবেই তার সৎবোনের মাধ্যমে মুশকান ম্যাডামের জন্য কাজ করতে শুরু করে সে। কিন্তু তাতেও কুলাতে পারতো না। ঐ সোমারাণী তার ঘামের সব অর্জন এক লহমায় লুটে নিতো। এরপর শুরু করে সবচাইতে অভিনব আর ভয়ঙ্কর একটি কাজ। যেমন বিপজ্জনক তেমনি দুঃসাহসী। এই কাজটা করার বুদ্ধি তার মাথায় এসেছিলো অনেকটা হুট করেই। প্রকৃতিতে যেমন অনাবৃষ্টি তেমনি গোরখোদকের কাজেও মন্দাকাল রয়েছে। একসময় সেই মন্দা শুরু হলে ফালু বিপাকে পড়ে গেলো। সপ্তাহের পর সপ্তাহ পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সুন্দরপুরে কেউ মরার নাম নিচ্ছে না! আজরাইল যেনো ভুলে গেছে সুন্দরপুরেও তার পদধুলি দেয়া উচিত।
এরকম মন্দার সময়ে একরাতে গঞ্জে গিয়ে সোমরানীকে না পেয়ে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে আসছিলো ফালু। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছিলো তখন। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য বড় বড় পা ফেলে মোক্তার বাড়ির ভিটার পাশ দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ একটা আর্তনাদ শুনে এগিয়ে যায়, দেখতে পায় বাড়ি থেকে একটু দূরে পায়খানার সামনে আশি বছরের বুড়ো সুবহান মোক্তার পা পিছলে পড়ে আছে। মাঝরাতে পেট খারাপ হলে বুড়ো বাধ্য হয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেছিলো, বৃষ্টির কারণে পা পিছলে যায়। কোমর ভেঙে বুড়ো অসফুটস্বরে গোঙানি দিলেও বাড়ির ঘুমন্ত মানুষজনের ঘুম ভাঙনের পক্ষে যথেষ্ট ছিলো না সেটা। ফালু প্রথমে ধরাশায়ি বুড়োকে মাটি থেকে তুলতেই গেছিলো কিন্তু মুহূর্তেই তার সিদ্ধান্ত বদলে যায়। একটা লোক আশি বছর ধরে বেঁচে আছে পরিবার-পরিজনের কাছে বোঝা হয়ে, প্রায়ই অসুখে-বিসুখে পড়ে, সে নিজেও মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গুণছে কিন্তু সেইক্ষণ আর আসছে না। এরকম বুড়োরা মরে না বলেই তো ফালুর মতো গোরখোদকদের অনটনও ঘোচে না!
সুবহান মোক্তার অবিশ্বাসের সাথেই দেখতে পায় তাকে উদ্ধার করতে আসা ফেরেস্তাতুল্য যুবক নিমেষে আজরাইল বনে গেছে!
আশি বছরের বুড়োর টুটি চেপে ধরেই এক ঝটকায় ঘাড়টা ভেঙে ফেলে সে। তারপর ডানে-বামে কোথাও না তাকিয়ে সোজা হাটা দেয়। কবরস্তানের দিকে।
যথারীতি পরদিন সকালে নতুন গোর খোরার কাজ পেয়ে যায় ফালু, সেইসাথে কয়েক দিনের জন্য দূর হয়ে যায় তার অভাব। কিন্তু এরকম কাজ তো হরহোজ করা যায় না। রাতের পর রাত গ্রামের পথে ঘুরেও সুবহান মোক্তারের মতো শিকার আর খুঁজে পায় না। অচিরেই সোমারাণী বুঝতে পারলো ফালুর টাকা-পয়সায় টান পড়েছে আবার। একরাতে মুখে পান নিয়ে তার বুকে আঙুল চালাতে চালাতে আগ্লাদিসুরে জানতে চেয়েছিলো তার এমন হালত কেন। ওই সময় ফালুর পক্ষে কোনো কিছু লুকানো সম্ভব হয় নি। সে। যে সামান্য একজন গোরখোদক সেটা জানিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে এটাও জানায়, সুন্দরপুরের মতো এলাকায় ক-জনই বা মানুষ মরে, আর কতোই বা আয়রোজগার হতে পারে।
সব শুনে মুখের পান চিবোতে চিবোতে সোমারাণী বলেছিলো, সে কেন বাড়তি কামাইর চিন্তা করছে না। কথাটা শুনে অবাক হয়েছিলো ফালু। একজন গেড়ারখোদক কী করে বাড়তি কামাই করবে? সে কি সরকারী অফিসের কেরাণী যে, ফাইল আটকে ঘুষ নেবে?
সোমারাণী মুখ বেঁকিয়ে পানের পিক ফেলে বলেছিলো, তা কেন হবে। সে যে কাজ করে তাতেই বাড়তি কামাই করার রাস্তা বের করে নিতে পারে। ফালু কথাটা শুনে মাথামুণডু কিছুই বুঝতে পারে নি। ভেবেছিলো সোমারাণী যেরকম হেয়ালি কথাবার্তা বলে সবসময়, এটাও ওরকম কিছু। কিন্তু তাকে ভড়কে দিয়ে মেয়েটা বলে, সে কেন কবর থেকে কঙ্কাল তুলে বিক্রি করছে না? ওসবে তো বেশ আয়রোজগার হয় আজকাল।
