ফালু মুখ তুলে স্থিরচোখে চেয়ে রইলো কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে।
“এতোই যহন জানোস, তয় ক না…আইজ ক্যাঠায় মরবো?”
গোরখোদক কিছুই বললো না। গতরাতে এই বদমাশটা অন্য একজনকে সাথে নিয়ে তার কাজে বাগড়া দিয়েছিলো। হ্রট করে চলে এসেছিলো ওরা। সে ভাবেও নি এতো রাতে কবরস্তানে কেউ চলে আসতে পারে। রাগে ফালুর গা জ্বলে যাচ্ছে। অবশেষে রাগ দমাতে না পেরে বলে উঠলো, “তুই মরবি! আর আমি নিজ হাতে তোরে এইহানে গোর দিমু!”
কথাটা শুনে আতরের বুক ধরফর করে উঠলো। হারামজাদা এসব কী বলছে? ওর সাহস তো কম নয়। আবার তুই-তোকারিও করছে! রাগে কাঁপতে শুরু করলো সে। চেঁচিয়ে বললো, “ওই, হারামির বাচ্চা! মুখ সামলায়া কথা কইবি। তুই আমারে চিনোস না?”
“তোরে চিনুম না ক্যান…তুই হইলি বিবিসি…সব খবর থাকে তোর কাছে।”
“ঠিক কইছোস!” চেঁচিয়ে উঠলো আতর। “আমার কাছে সব খবর থাকে.. তুই তর ঘরের চৌকির নীচে কি রাখোস না রাখোস তাও আমি জানি।”
কথাটা শুনে ভুরু কুচকে চেয়ে রইলো গোরখোদক। সে দেখতে পেলো পেছন থেকে একটা হাত বের করে আনলো আতর, তার সেই হাতে মানুষের পায়ের সবচেয়ে বড় একটি হাঁড!
“তর ঘরের খাটের নীচে এইসব জিনিস রাইখা দিছস ক্যান? কাহিনী কি?”
ফালু রাগে ফুঁসতে লাগলো। এই বদমাশটা তার ঘরে ঢুকে কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা কঙ্কাল দেখে ফেলেছে! প্রমাণ হিসেবে সঙ্গে করে আবার একটা হাঁড়ও নিয়ে এসেছে!
“কী..জবান বন্ধ হইয়া গেলো নাকি? মনে করছোস, মুখ বন্ধ রাখলে। আমি কিছু বুঝবার পারুম না? দেখ না…তর কি হয়…সব বন্ধ হইয়া যাইবো। হোগার কাপড় মাথায় তুইলা দেীড়াইবি তুই
রাগে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো ফালু। কোদাল আর টুকরিটা নিয়ে কবর থেকে উঠে এলো, দাঁড়ালো আতরের মুখোমুখি। “তুই কি কইবার চাস?”
“তর অ্যাডভান্স কব্বর খুদার গোমড় ফাঁস হইয়া যাইবো রে, ফালু…খাটের নীচে কি রাখছোস সব এহন জাইনা গেছি! ঐ বেটির লগে তর কি কাম তাও গুপন থাকবো না।”
চোখমুখ কুচকে চেয়ে রইলো গোরখোদক।
“কাইল রাইতে ঐ ডাইনির বাড়িতে ক্যান গেছিলি? ওইহানে তর কি কাম, অ্যাঁ? ওই ছেদার মইদ্যে তুই কি করতে যাস?”
ফালু এবার বুঝতে পারলো কালরাতে যে লোকটাকে ধাওয়া দিয়েছিলো সে আর কেউ না, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই বদমাশ! “ওইহানে কি করতে যাই, জানতে চাস?” নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো সে।
অভিজ্ঞ ইনফর্মার খুব দ্রুত বুঝে গেলো গোরখোদকের আগ্রাসি মনোভাব ছেলেটা কিছু করার আগেই সে হাঁড়টা দিয়ে বাড়ি মারার চেষ্টা করলো কিন্তু তাকে একদম অপ্রসতুত করে দিয়ে হাঁড়টা ধরে ফেললো ফালু। অন্যহাতে খামচে ধরলো তার শার্টের কলার। একটা মোচড় মেরে হাঁড়টা তার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আতরের বাম-কানে আঘাত করে বসলো। টলে গেলো ইনফর্মার। তারপর দু-হাতে কলারটা ধরে এক হ্যাঁচকা টানে সদ্য খোরা কবরে ফেলে দিলো তাকে।
একটা আর্ত চিৎকার দিলো আতর। ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে সে। কবরের গর্তের মধ্যে পড়ে ব্যথায় ঝাঁকিয়ে উঠলো। মাথাটা ভো ভো করে ঘুরছে বলে ধাতস্থ হতে পারলো না। যে-ই না উঠে দাঁড়াবে অমনি ফালু তার মাথায় আরেকটা আঘাত করে বসলো। আতরের মনে হলো তার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়েছে। ঝাঁকিয়ে উঠলো সে। ঝাপসা হয়ে এলো দৃষ্টি। তারপরই টের পেলো তার উপরে চাক চাক মাটি এসে পড়ছে।
আমারে মাটিচাপা দিতাছে!
আতঙ্কের সাথেই ভাবনাটা পেয়ে বসলো তাকে। দুঃস্বপ্নের কথাটা মনে পড়ে যেতেই বুকে হাতুড়িপেটা শুরু হয়ে গেলো। “বাঁচাও বাঁচাও!” সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো সে। তার চোখেমুখে মাটির চাক এসে পড়াতে ঠিকমতো তাকাতে পারছে না। দু-হাতে চোখ ডলতে লাগলো। চোখের মধ্যে মাটির গুড়ো ঢুকে গেছে বলে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। “শুয়ারেরবাচ্চা!”
এতো দ্রুত মাটি এসে পড়ছে যে আতর আর কথা বলতে পারলো না। চোখে দেখতে না পেলেও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আবারো শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করা হলো মাথায়। চিৎ হয়ে পড়ে গেলো সে। মরার উপরে খাড়ার ঘায়ের মতো আরো কিছু বড় বড় মাটির চাকা এসে পড়তে লাগলো। তার উপরে। চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, দু-হাত দিয়ে মাথাটা শক্ত করে ধরে রাখলো। প্রচণ্ড ব্যথায় মরে যাচ্ছে সে। মাটির চাকাগুলো উপর থেকে দ্রুত গতিতে পড়ছে। আলগা মাটির স্তূপের নীচে তলিয়ে যাচ্ছে সে। ঠিক তখনই দূর থেকে একটা শব্দ তার কানে যেতেই হাত-পা অসাড় হয়ে এলো।
সমবেত কণ্ঠে একদল লোক কোনো সুরা পড়ছে।
তার জানাযা পড়ছে ওরা?!
সে নিশ্চিত হতে পারলো না। বহুকাল আগেই নামায-কালাম ছেড়েছে। কোন্ সুরা কখন পড়া হয় সে জানে না। পরক্ষণেই মনে হলো, মুরদার আত্মার মাগফেরাত কামনা করার জন্য লাশের চারপাশে থাকা লোকজন এরকম সুরা পড়ে!
আতর টের পেলো তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। জ্ঞান হারানোর আগে শুধু একটা কথাই বলতে পারলো :
“বাঁচাও! বাঁচাও!”
কিন্তু সে নিশ্চিত হতে পারলো না, শব্দটা আদৌ তার মুখ দিয়ে বের হয়েছে কিনা! আর কোনো শব্দ বের হবার আগেই সে তলিয়ে গেলো গভীর অন্ধকারে।
.
অধ্যায় ৩০
উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে ফালু।
তার কাঁধে বড় একটা ব্যাগ। পুরনো জিন্সপ্যান্ট আর রঙচটা টি-শার্ট পরে আছে এখন। প্যান্টটা হাটু পর্যন্ত গোটানো। অবশ্য এই বেশটা তার জন্য মোটেও নতুন নয়। এই তো গতসপ্তাহেই রাতের বেলায় এই পোশাকে গঞ্জে গেছিলো। ঢাকা শহরে গেলেও এই পোশাকে যায় সে। তবে ঐ মুশকান জুবেরি ছাড়া সুন্দরপুরে খুব কম লোকেই তাকে এই বেশে দেখেছে। ম্যাডাম আবার লুঙ্গি পরলে ভীষণ বিরক্ত হয়। তার বাড়িতে কাজ করতে গেলে লুঙ্গি পরে যায় না সে।
